ভূমিকা:
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস কেবল পুঁথিপত্র, তাম্রশাসন বা সাহিত্যিক উপাদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লিখিত ইতিহাসের বাইরেও অতীতকে জানার সবচেয়ে অকাট্য, বস্তুনিষ্ঠ এবং দৃশ্যমান প্রমাণ হলো প্রাচীন ভারতের স্থাপত্য (Architecture) ও ভাস্কর্য (Sculpture)। স্থাপত্য কেবল ইট, পাথর বা খড়কূটোর স্তূপ নয়; এটি একটি জাতির রুচি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থার আয়না। অন্যদিকে, ভাস্কর্য হলো পাথরের বুকে খোদিত মানুষের আবেগ, ধর্মবিশ্বাস এবং দর্শনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
যে যুগে মানুষের হাতে আধুনিক কোনো প্রযুক্তি বা যন্ত্র ছিল না, সেই যুগে পাহাড় কেটে মন্দির বানানো বা নিখুঁত অনুপাতে ব্রোঞ্জের মূর্তি ঢালাই করার যে অভূতপূর্ব নিদর্শন প্রাচীন ভারতের মানুষ রেখে গেছেন, তা আজও আধুনিক বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। সিন্ধু সভ্যতার পোড়া ইটের নগরী থেকে শুরু করে মৌর্য যুগের চকচকে পাথরের স্তম্ভ, গুপ্ত যুগের প্রশান্ত বুদ্ধমূর্তি থেকে চোল যুগের গতিশীল নটরাজ—সবকিছুই যেন এক একটি 'টাইম ক্যাপসুল'। আসুন, এই সুদীর্ঘ ও তথ্যবহুল মেগা আর্টিকেলে আমরা প্রাচীন ভারতের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের উদ্ভব, বিকাশ এবং এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করি।
পর্ব ১: প্রাচীন ভারতের স্থাপত্য (Architecture):
স্থাপত্য শিল্প বলতে মূলত ইমারত, মন্দির, রাজপ্রাসাদ, স্তূপ বা নগর নির্মাণের কলাকৌশলকে বোঝায়। প্রাচীন ভারতে স্থাপত্যের বিকাশকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কালানুক্রমিক ধাপে ভাগ করা যায়:
১. সিন্ধু সভ্যতা: বিশ্বের প্রথম সুপরিকল্পিত নগরী (খ্রি.পূ. ৩৩০০ - খ্রি.পূ. ১৩০০):
প্রাচীন ভারতের স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে আছে আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, লোথাল এবং ধোলাভিরা শহরের নগর পরিকল্পনায়। সমসাময়িক মিশর বা মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা যেখানে রাজাদের জন্য বিশাল রাজপ্রাসাদ বা পিরামিড বানাতে ব্যস্ত ছিল, সিন্ধু সভ্যতার মানুষ সেখানে সাধারণ নাগরিকদের জন্য এক স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পরিকল্পিত নগরী তৈরি করেছিল।
গ্রিড সিস্টেম (Grid System): সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলো গ্রিড বা দাবার ছকের মতো নিখুঁত জ্যামিতিক মাপে গঠিত ছিল। প্রধান রাস্তাগুলো সোজা উত্তর-দক্ষিণে এবং পূর্ব-পশ্চিমে গিয়ে একে অপরকে সমকোণে (90 degree) ছেদ করত।
উন্নত জলনিকাশী ব্যবস্থা (Drainage System): এই সভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের ভূগর্ভস্থ নর্দমা বা ড্রেনেজ সিস্টেম। প্রতিটি বাড়ির দূষিত জল ছোট নর্দমার মাধ্যমে রাস্তার মূল ঢাকা নর্দমার সাথে যুক্ত হতো। নর্দমাগুলো পরিষ্কার করার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে ম্যানহোল (Manhole)-এর ব্যবস্থাও ছিল, যা তাদের উন্নত নাগরিক স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রমাণ।
পোড়া ইটের ব্যবহার: বেশিরভাগ বাড়ি এবং ইমারত রোদে শুকানো বা আগুনে পোড়া ইট দিয়ে তৈরি হয়েছিল। ইটের মাপ (৪:২:১ অনুপাত) ছিল নির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক।
মহাস্নানাগার (The Great Bath): মহেঞ্জোদাড়োতে আবিষ্কৃত বিশাল 'মহাস্নানাগার' সম্ভবত ধর্মীয় স্নানের কাজে ব্যবহৃত হতো। এই স্নানাগারের জল যাতে চুঁইয়ে বাইরে না যায়, তার জন্য দেয়ালগুলোতে বিটুমিন বা পিচের প্রলেপ (Waterproofing) দেওয়া হয়েছিল, যা প্রাচীন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অনন্য নিদর্শন।
লোথালের ডকইয়ার্ড (Dockyard): গুজরাটের লোথালে প্রাপ্ত বিশাল ইটের তৈরি ডকইয়ার্ড বা পোতাশ্রয় প্রমাণ করে যে তারা জোয়ার-ভাটার বিজ্ঞান জানত এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে অত্যন্ত উন্নত ছিল।
২. মৌর্য স্থাপত্য: পাথর ও শিল্পের রাজকীয় মেলবন্ধন (খ্রি.পূ. ৩২২ - খ্রি.পূ. ১৮৫):
মৌর্য যুগে, বিশেষ করে সম্রাট অশোকের শাসনকালে, ভারতীয় স্থাপত্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। কাঠ বা রোদে শুকানো ইটের বদলে এই প্রথম ব্যাপকভাবে স্থায়ী পাথরের ব্যবহার শুরু হয়।
রাজপ্রাসাদ: গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস পাটলিপুত্রে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বিশাল কাঠের রাজপ্রাসাদের বর্ণনা দিয়েছেন, যা তাঁর মতে পারস্যের সুসা বা একবাটানার প্রাসাদের চেয়েও জাঁকজমকপূর্ণ ছিল।
অশোক স্তম্ভ (Ashokan Pillars): সম্রাট অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে, ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে বড় বড় পাথরের স্তম্ভ নির্মাণ করেন। এই স্তম্ভগুলো এক টুকরো অখণ্ড বেলেপাথর (Monolithic) কেটে তৈরি করা হতো। এর গায়ে এক বিশেষ ধরনের মসৃণ পলিশ (Mauryan polish) লাগানো হতো, যার ফলে হাজার হাজার বছর বৃষ্টির জলে ভেজার পরও সেগুলো আজও আয়নার মতো চকচক করে।
সাঁচী স্তূপ (Sanchi Stupa): বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনার স্থান হিসেবে স্তূপ নির্মিত হতো, যেখানে বুদ্ধ বা তাঁর শিষ্যদের চিতাভস্ম রাখা হতো। মধ্যপ্রদেশের সাঁচী স্তূপ (যা অশোকের সময় ইটের তৈরি ছিল এবং শুঙ্গ যুগে পাথরে মোড়া হয়)-এর বিশাল অর্ধগোলাকার গম্বুজ এবং এর চারদিকের প্রবেশদ্বার (তোরণ)-এ খোদাই করা কারুকাজ আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
৩. গুহা স্থাপত্য (Rock-cut Architecture): পাহাড়ের গহ্বরে শিল্পের বিকাশ:
প্রাচীন ভারতের শিল্পীরা ছেনি ও হাতুড়ির সাহায্যে আস্ত পাহাড় কেটে গুহা-মন্দির তৈরি করার যে কৌশল দেখিয়েছিলেন, তা বিশ্ব স্থাপত্যের ইতিহাসে বিরল। বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন সন্ন্যাসীরা বর্ষাকালে বসবাসের জন্য (বিহার) এবং প্রার্থনার জন্য (চৈত্য) এই গুহাগুলো ব্যবহার করতেন।
অজন্তা গুহা (Ajanta Caves): মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে অবস্থিত অজন্তার ২৯টি গুহা মূলত বৌদ্ধ বিহার ও চৈত্য। পাহাড়ের গায়ে তৈরি এই গুহাগুলোর ভেতরের নকশা, পাথরের স্তম্ভ এবং ছাদের গঠন অত্যন্ত চমৎকার।
ইলোরা গুহা (Ellora Caves): অজন্তার কাছেই অবস্থিত ইলোরার ৩৪টি গুহায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন—এই তিন ধর্মের স্থাপত্যের এক অপূর্ব সহাবস্থান দেখা যায়।
কৈলাসনাথ মন্দির (Kailasanatha Temple): ইলোরার ১৬ নম্বর গুহায় অবস্থিত রাষ্ট্রকূট রাজা প্রথম কৃষ্ণ নির্মিত কৈলাসনাথ মন্দির প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের চূড়ান্ত বিস্ময়। শিল্পীরা একটি বিশাল পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে পাথর কাটা শুরু করে নিচের দিকে নেমেছিলেন এবং একটানা অখণ্ড পাথরে খোদাই করে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ একশিলা (Monolithic) মন্দির তৈরি করেছিলেন।
৪. মন্দিরের নকশা ও বিবর্তন: গুপ্ত যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত:
প্রাচীনকালের শুরুর দিকে দেবদেবীর পূজার জন্য কোনো স্থায়ী ইমারত বা নির্দিষ্ট মন্দির ছিল না। গুপ্ত যুগে (খ্রিষ্টীয় ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ শতক) ভারতে প্রথম স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ছাদযুক্ত মন্দির নির্মাণের প্রথা শুরু হয় (যেমন—সাঁচীর ১৭ নম্বর মন্দির বা দেওগড়ের দশাবতার মন্দির)। পরবর্তীকালে ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ভারতের মন্দির স্থাপত্য তিনটি প্রধান রীতি বা শৈলীতে (Styles) বিভক্ত হয়ে যায়:
ক) নাগর রীতি (Nagara Style - উত্তর ভারত):
হিমালয় থেকে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত উত্তর ভারতে এই রীতি গড়ে ওঠে।
বৈশিষ্ট্য: এই রীতির মন্দিরগুলোতে দেবমূর্তি রাখার মূল প্রকোষ্ঠ বা 'গর্ভগৃহ' একটি উঁচু বেদির ওপর তৈরি করা হতো। গর্ভগৃহের ঠিক ওপরের ছাদটি মৌচাকের মতো ক্রমশ সরু হয়ে চূড়ার দিকে উঠে যেত, যাকে 'শিখর' (Shikhara) বলা হয়। শিখরের মাথায় খাঁজকাটা চাকতির মতো 'আমলক' এবং তার ওপর 'কলস' বসানো থাকত।
উদাহরণ: ওড়িশার ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দির, কোনারকের বিশ্বখ্যাত সূর্য মন্দির (যা একটি বিশাল রথের আকৃতিতে তৈরি) এবং মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহোর মন্দিরগুলো এই রীতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
খ) দ্রাবিড় রীতি (Dravida Style - দক্ষিণ ভারত):
কৃষ্ণা নদী থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতে এই রীতির বিকাশ ঘটে।
বৈশিষ্ট্য: এই মন্দিরগুলো একটি বিশাল সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা থাকত। মন্দিরের গর্ভগৃহের ওপরের চূড়াটি নাগর রীতির মতো বক্রাকার না হয়ে পিরামিডের মতো ধাপে ধাপে সোজা ওপরের দিকে উঠে যেত, যাকে বলা হতো 'বিমান' (Vimana)। এছাড়া মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বারে অত্যন্ত সুউচ্চ এবং অলংকৃত ফটক থাকত, যাকে 'গোপুরম' (Gopuram) বলা হয়।
উদাহরণ: তাঞ্জাভুরে চোল রাজাদের তৈরি বৃহদেশ্বর মন্দির এবং মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দির দ্রাবিড় স্থাপত্যের মাস্টারপিস।
গ) বেসর রীতি (Vesara Style - মধ্য ভারত):
বিন্ধ্য পর্বত থেকে কৃষ্ণা নদী পর্যন্ত মধ্য ভারত ও দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে নাগর ও দ্রাবিড় রীতির মিশ্রণে এই শৈলী গড়ে ওঠে। চালুক্য এবং রাষ্ট্রকূট রাজারা এই রীতির পৃষ্ঠপোষণ করেছিলেন।
উদাহরণ: কর্ণাটকের আইহোল, বাদামি এবং পাট্টাদাকালের মন্দিরসমূহ।
পর্ব ২: প্রাচীন ভারতের ভাস্কর্য (Sculpture):
ভাস্কর্য হলো পাথর, মাটি, কাঠ বা ধাতুর ওপর মানুষের তৈরি ত্রি-মাত্রিক শিল্প। প্রাচীন ভারতের শিল্পীরা ভাস্কর্যের মাধ্যমে কেবল দেবদেবীর রূপই দেননি, বরং সমসাময়িক সমাজ, ধর্ম, দর্শন এবং মানুষের ভেতরের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকেও পাথরের বুকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
১. সিন্ধু সভ্যতা: ভাস্কর্য শিল্পের আদিমতম ও বিস্ময়কর সূচনা:
সিন্ধু সভ্যতায় বিশাল আকৃতির কোনো মূর্তির প্রমাণ পাওয়া না গেলেও, তাদের তৈরি ছোট আকারের ভাস্কর্যগুলো কারিগরি ও শৈল্পিক দিক থেকে অত্যন্ত উন্নত ছিল। তারা মূলত তিনটি পদ্ধতিতে ভাস্কর্য তৈরি করত:
ধাতব ভাস্কর্য (Bronze Casting): সিন্ধু সভ্যতার মানুষ 'লস্ট-ওয়াক্স' (Lost-wax বা Cire Perdue) নামক এক জটিল পদ্ধতি ব্যবহার করে মোম গলিয়ে ব্রোঞ্জের মূর্তি ঢালাই করতে জানত। মহেঞ্জোদাড়ো থেকে পাওয়া বিখ্যাত 'নর্তকী' (Dancing Girl) মূর্তি এর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। মাত্র ১০.৮ সেন্টিমিটার লম্বা এই মূর্তিতে এক আদিবাসী কিশোরীর পেশিবহুল দেহ, এক হাতে কনুই পর্যন্ত চুড়ি এবং অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
পাথরের ভাস্কর্য: মহেঞ্জোদাড়ো থেকে প্রাপ্ত স্টিয়াটাইট পাথরের তৈরি 'পুরোহিত রাজা' (Priest King) মূর্তিটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ধ্যানমগ্ন এই পুরুষের গায়ে ত্রিদলের (Trefoil) নকশা করা চাদর জড়ানো রয়েছে। অন্যদিকে হরপ্পা থেকে পাওয়া লাল বেলেপাথরের একটি পুরুষ দেহের ধড় (Male Torso) প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্যের মতো নিখুঁত শারীরিক গঠনের স্মৃতি জাগায়।
পোড়ামাটির শিল্প (Terracotta): সিন্ধু সভ্যতার সাধারণ মানুষের লোকশিল্পের প্রধান মাধ্যম ছিল পোড়ামাটি। পোড়ামাটির তৈরি অসংখ্য খেলনা (ষাঁড়, গরুর গাড়ি, বাঁদর) এবং 'মাতৃকা মূর্তি' (Mother Goddess) আবিষ্কৃত হয়েছে, যা উর্বরতার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হতো। এছাড়া স্টিয়াটাইট পাথরে খোদাই করা পশুপতি শিবের সিলমোহর তাদের সূক্ষ্ম খোদাই কাজের অনবদ্য প্রমাণ।
২. মৌর্য, শুঙ্গ ও সাতবাহন যুগের ভাস্কর্য (খ্রি.পূ. ৪র্থ - ১ম শতক):
ক) মৌর্য শিল্প (Mauryan Art):
সম্রাট অশোকের শাসনকালে ভাস্কর্য শিল্প রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।
রাজকীয় শিল্প: অশোক স্তম্ভের শীর্ষে প্রাণীর ভাস্কর্য বসানো হতো। সারনাথের স্তম্ভে পেছন ফিরে বসে থাকা চারটি গর্জনরত সিংহমূর্তি (যা আজ ভারতের জাতীয় প্রতীক) এবং রামপুরবার ষাঁড়ের মূর্তি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
লোকশিল্প: রাজদরবারের বাইরে সাধারণ মানুষ যক্ষ ও যক্ষিণীর মূর্তি তৈরি করত। বিহারের দিদারগঞ্জে পাওয়া 'যক্ষিণী মূর্তি' (Didarganj Yakshini) একটি অনবদ্য নিদর্শন। চুনার বেলেপাথর কেটে তৈরি এই মূর্তিতে নারীদেহের সৌন্দর্য এবং কাপড়ের সূক্ষ্ম ভাঁজ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
খ) শুঙ্গ ও সাতবাহন যুগের শিল্প (Shunga and Satavahana art):
মৌর্যদের পতনের পর বৌদ্ধ স্তূপগুলোকে কেন্দ্র করে ভাস্কর্য শিল্পের বিকাশ ঘটে। এই যুগে শিল্পীরা বুদ্ধের কোনো মানব মূর্তি তৈরি করতেন না। বুদ্ধের উপস্থিতি বোঝাতে তাঁরা পদ্মফুল, পাদুকা, বোধিবৃক্ষ, বা ধর্মচক্রের মতো প্রতীক ব্যবহার করতেন। ভরহুত এবং সাঁচীর প্রবেশদ্বারে (তোরণে) বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনী অর্থাৎ 'জাতক'-এর গল্প পাথরে খোদাই করা হয়েছিল, যা দেখলে মনে হয় যেন পাথরের বুকে আস্ত একটি গল্পের বই লেখা আছে।
৩. কুশান যুগের ভাস্কর্য: তিনটি প্রধান শৈলী (খ্রিষ্টীয় ১ম - ৩য় শতক):
কুশান রাজাদের, বিশেষত সম্রাট কণিষ্কের শাসনকালে, ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে। এই সময়েই প্রথম মানবাকৃতিতে গৌতম বুদ্ধের মূর্তি তৈরি শুরু হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে কুশান যুগে তিনটি ভিন্ন ভাস্কর্য ঘরানা বা স্কুল গড়ে ওঠে:
ক) গান্ধার শিল্পরীতি (Gandhara School):
বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ার এবং আফগানিস্তান অঞ্চলে এই রীতি গড়ে ওঠে। আলেকজান্ডারের আক্রমণের ফলে গ্রিক ও রোমান শিল্পের সাথে ভারতীয় শিল্পের মিশ্রণ ঘটে, যাকে 'গ্রীকো-বৌদ্ধ শিল্প' বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য: এখানে নীলচে-ধূসর শ্লেট পাথর (Schist stone) ব্যবহার করা হতো। বুদ্ধের মুখাবয়ব অনেকটা গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর মতো তৈরি হতো। কুঁচকানো চুল, মজবুত পেশিবহুল দেহ, আধবোজা চোখ এবং রোমান টোগা (Toga) জাতীয় পোশাকের গভীর ও স্পষ্ট ভাঁজ এই রীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
খ) মথুরা শিল্পরীতি (Mathura School):
সম্পূর্ণ ভারতীয় বা দেশীয় আদর্শে উত্তরপ্রদেশের মথুরাকে কেন্দ্র করে এই রীতি গড়ে ওঠে।
বৈশিষ্ট্য: মথুরার শিল্পীরা লাল বেলেপাথর (Red sandstone) ব্যবহার করতেন। এখানকার মূর্তিতে বুদ্ধের গায়ে ভারী কাপড়ের বদলে পাতলা সুতির কাপড় পরানো হতো। মূর্তির বুক চওড়া, মুখমণ্ডল গোলাকার এবং ঠোঁটে একটি শান্ত ও প্রশান্ত হাসির রেখা থাকত।
গ) অমরাবতী শিল্পরীতি (Amaravati School):
সাতবাহন রাজাদের পৃষ্ঠপোষণায় দক্ষিণ ভারতের কৃষ্ণা নদীর অববাহিকায় এই ঘরানা গড়ে ওঠে।
বৈশিষ্ট্য: এখানকার ভাস্কর্যের মূল উপাদান ছিল চকচকে শ্বেতপাথর বা সাদা মার্বেল। অমরাবতীতে একক মূর্তির বদলে 'ন্যারেটিভ আর্ট' (গল্প বলার শিল্প)-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। রাজদরবারের উৎসব, হাতিদের স্নান বা জাতকের গল্প অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও গতিশীলভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো।
৪. গুপ্ত যুগ: শিল্পের সুবর্ণ যুগ ও আধ্যাত্মিকতার চরম শিখর (খ্রিষ্টীয় ৪র্থ - ৬ষ্ঠ শতক):
গুপ্ত যুগকে নির্দ্বিধায় ভারতীয় ভাস্কর্যের 'সুবর্ণ যুগ' (Golden Age) বলা হয়। কুশান যুগের ভাস্কর্য যেখানে মাংসপেশী ও শারীরিক সৌন্দর্যের ওপর বেশি জোর দিত, গুপ্ত যুগের ভাস্কর্য সেখানে আধ্যাত্মিক ভাব, গভীর ধ্যান এবং মানসিক প্রশান্তিকে মূর্তির চেহারায় ফুটিয়ে তুলেছিল।
বৈশিষ্ট্য: গুপ্ত যুগের ভাস্কর্যে নিখুঁত শারীরিক ভারসাম্য (Proportion) লক্ষ্য করা যায়। মূর্তির চোখগুলো আধবোজা (পদ্মপলাশ লোচন), যা গভীর ধ্যানের ইঙ্গিত দেয়। মাথার পেছনে অত্যন্ত সুসজ্জিত ও সূক্ষ্ম কারুকাজ করা প্রভামণ্ডল (Halo) যুক্ত করা হতো। পোশাকের ভাঁজগুলো এত সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ (Wet drapery effect) করা হতো যে তা শরীরের সাথে মিশে যেত।
শ্রেষ্ঠ নিদর্শন: সারনাথে পাওয়া 'উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি' (ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রা) এবং বিহারের সুলতানগঞ্জ থেকে পাওয়া সাড়ে সাত ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি গুপ্ত যুগের অনবদ্য সৃষ্টি। এছাড়া দেওগড়ের দশাবতার মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা ‘বিষ্ণু অনন্তশয়ন’ ভাস্কর্য হিন্দু পৌরাণিক শিল্পের এক মাস্টারপিস।
৫. দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের ভাস্কর্য: পাথর ও ব্রোঞ্জের মহাকাব্য (৭ম‑১৩শ শতক):
উত্তর ভারতে ভাস্কর্য শিল্পের গতি যখন কিছুটা ধীর হয়ে আসছিল, দক্ষিণ ভারতে পল্লব, রাষ্ট্রকূট ও চোল রাজাদের পৃষ্ঠপোষণায় তা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
রাষ্ট্রকূটদের এলিফ্যান্টা গুহা: মুম্বাইয়ের কাছে আরব সাগরের বুকে এলিফ্যান্টা গুহায় প্রাপ্ত বিশাল 'ত্রিমূর্তি' বা মহেশমূর্তি (সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের রূপ) ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ ভাস্কর্য। প্রায় ২০ ফুট উঁচু এই মূর্তির তিনটি মুখ তিনটি ভিন্ন দর্শন প্রকাশ করে—একটি শান্ত, একটি ভয়ংকর এবং অপরটি নারীসুলভ প্রশান্তির।
পল্লবদের মহাবলীপুরম: তামিলনাড়ুর মহাবলীপুরমে আস্ত পাহাড় কেটে তৈরি করা 'গঙ্গাবতরণ' (Descent of the Ganges) বা 'অর্জুনের তপস্যা' হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওপেন-এয়ার রিলিফ (Open-air relief) ভাস্কর্য। একটি বিশাল গ্রানাইট পাথরের গায়ে দেবদেবী, ঋষি, নাগ, হাতি এবং অন্যান্য প্রাণীর মূর্তি অত্যন্ত জীবন্তভাবে খোদাই করা হয়েছে।
চোল যুগের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য: দশম ও একাদশ শতকে চোল রাজাদের শাসনে ব্রোঞ্জ ঢালাইয়ের কাজ চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। চোল যুগে তৈরি শিবের 'নটরাজ' (প্রলয় নৃত্যরত শিব) মূর্তি বিশ্বজুড়ে ভারতীয় শিল্পের এক আইকনিক প্রতীক। নটরাজের এক হাতে ধ্বংসের আগুন, অন্য হাতে সৃষ্টির প্রতীক ডমরু, এক হাতে অভয় মুদ্রা এবং তাঁর পায়ের নিচে অজ্ঞতার প্রতীক 'অপস্মার পুরুষ' দলিত হচ্ছে। এটি কেবল একটি ভাস্কর্য নয়, এটি সৃষ্টি ও ধ্বংসের এক অসামান্য দার্শনিক মহাকাব্য।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, প্রাচীন ভারতের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য কেবল রাজাদের অহংকার বা শিল্পীদের হাতযশের প্রমাণ নয়, এগুলো হলো প্রাচীন ভারতের আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় এবং প্রযুক্তিগত ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল। যখন কোনো লিখিত ভাষার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় না (যেমন সিন্ধু সভ্যতা), তখন এই নীরব ইমারত এবং মাটির মূর্তিগুলোই আমাদের সামনে কথা বলে ওঠে।
সিন্ধু সভ্যতার নিকাশি ব্যবস্থা আমাদের শেখায় প্রাচীন ভারতীয়দের স্বাস্থ্যসচেতনতা, ইলোরার কৈলাসনাথ মন্দির প্রমাণ করে তাদের অকল্পনীয় জ্যামিতিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান, আর খাজুরাহো বা তাঞ্জাভুরের মন্দিরগুলো তুলে ধরে সে যুগের বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চিত্র। অন্যদিকে, সারনাথের বুদ্ধমূর্তির প্রশান্তি বা নটরাজের মহাজাগতিক নৃত্য আমাদের প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের গভীরতার সাথে পরিচয় করায়। তাই, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নির্মাণে এবং আমাদের গৌরবময় শিকড়ের সন্ধানে এই স্থাপত্য ও ভাস্কর্যগুলোর অবদান প্রশ্নাতীত এবং চিরন্তন।




0 মন্তব্যসমূহ