বালেশ্বর সংগ্রাম বা বুড়িবালামের যুদ্ধ: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বীরত্বগাথা


ভূমিকা:

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাসে ওড়িশার বালেশ্বর জেলার 'বুড়িবালামের যুদ্ধ' (Battle of Buribalam) এক অনন্য, অবিস্মরণীয় এবং শিহরণ জাগানো অধ্যায়। ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সংঘটিত এই লড়াইতে মাত্র পাঁচজন বাঙালি তরুণ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সামনে যে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য এটি কেবল একটি খণ্ডযুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল একটি পরাধীন জাতির আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষার এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।

বাংলার বৈপ্লবিক আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে, অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়, বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানি করে সমগ্র ভারতজুড়ে একযোগে সশস্ত্র বিপ্লবের যে সুবৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, তার মূল কাণ্ডারি ছিলেন যুগান্তর দলের সর্বাধিনায়ক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (যিনি 'বাঘা যতীন' নামে পরিচিত)। তাঁর সুযোগ্য সহযোগী ছিলেন নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় বা এম. এন. রায়), ডা. যদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, রাসবিহারী বসু প্রমুখ। নিচে বুড়িবালামের যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি, ইন্দো-জার্মান ষড়যন্ত্র, বিপ্লবীদের আত্মগোপন এবং সেই ভয়ংকর যুদ্ধের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো।


১. ঐতিহাসিক পটভূমি (সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্ন ও যুগান্তর দল):

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে চরমপন্থী ও সশস্ত্র বিপ্লবী ধারার সূত্রপাত ঘটে। অরবিন্দ ঘোষের অনুপ্রেরণায় এবং ভগিনী নিবেদিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার তরুণেরা গুপ্তসমিতি গড়ে তুলতে শুরু করে। এর মধ্যে 'অনুশীলন সমিতি' এবং পরবর্তীতে 'যুগান্তর দল' সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বাঘা যতীন উপলব্ধি করেছিলেন যে, ব্রিটিশদের মতো একটি বিশাল ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে কেবল ছোটখাটো গুপ্তহত্যা, দু-একটি বোমা নিক্ষেপ বা আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে দেশ থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের মতো একটি সুসংগঠিত, সর্বভারতীয় এবং ব্যাপক সশস্ত্র গণ-অভ্যুত্থান। আর এই অভ্যুত্থানের জন্য প্রয়োজন প্রচুর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং একটি শক্তিশালী সামরিক পরিকল্পনা।


২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ইন্দো-জার্মান ষড়যন্ত্র (The Zimmermann Plan):

১৯১৪ সালে ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বেজে উঠলে বাঘা যতীন একে ভারতের স্বাধীনতার জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন। "শত্রুর শত্রু আমাদের বন্ধু"—এই নীতির ওপর ভিত্তি করে বিপ্লবীরা ব্রিটিশদের প্রধান শত্রু জার্মানির সাথে হাত মেলান।


জার্মানির সাথে চুক্তি ও 'ম্যাভেরিক' জাহাজ:

জার্মানিতে অবস্থানরত প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং চম্পক রামন পিল্লাইয়ের মাধ্যমে বার্লিনের জার্মান পররাষ্ট্র দপ্তরের সাথে বাংলার বিপ্লবীদের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক হয় যে, জার্মানি থেকে 'ম্যাভেরিক' (SS Maverick), 'অ্যানি লারসেন' এবং 'হেনরি এস' নামক তিনটি জাহাজে করে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং অর্থ ভারতীয় উপকূলে পাঠানো হবে।

বাঘা যতীনের নির্দেশে তাঁর প্রধান সহযোগী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য 'সি. এ. মার্টিন' ছদ্মনাম ধারণ করে ডাচ অধ্যুষিত জাভায় (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার বাটাভিয়া) যান এবং সেখানে জার্মান দূতাবাসের সাথে অস্ত্র ও অর্থের চূড়ান্ত সমন্বয় করেন।


অস্ত্র খালাসের ত্রিফলা পরিকল্পনা:

জার্মান অস্ত্র এলে তা তিনটি নির্দিষ্ট স্থানে নামানোর কথা ছিল-

১. সুন্দরবনের রায়মঙ্গল (ডা. যদুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের দায়িত্বে)।

২. ওড়িশার বালেশ্বর উপকূল (স্বয়ং বাঘা যতীনের দায়িত্বে)।

৩. নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ (বর্তমান বাংলাদেশে)।


সর্বভারতীয় অভ্যুত্থানের ছক:

পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। এই তিন জায়গা থেকে অস্ত্র খালাস করে ভারতের পূর্ব ও উত্তর অংশে একযোগে ব্রিটিশ সেনানিবাসগুলোতে আক্রমণ চালানো হবে। রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে উত্তর ভারতে সেনাবিদ্রোহ শুরু হবে। এদিকে বাংলার বিপ্লবীরা ফোর্ট উইলিয়াম দখল করবে, কলকাতা থেকে সমস্ত রেললাইন উপড়ে ফেলবে এবং টেলিগ্রামের তার কেটে দিয়ে কলকাতাকে ব্রিটিশ প্রশাসন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেবে। মাদ্রাজ থেকে আসা ট্রেনগুলো যাতে বাংলায় ঢুকতে না পারে, তার জন্য বালেশ্বরের কাছে রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া হবে।


৩. রডা কোম্পানির অস্ত্র লুণ্ঠন (যুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি):

জার্মান অস্ত্র আসার আগেই বিপ্লবীদের হাতে কিছু অস্ত্রের প্রয়োজন ছিল। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ১৯১৪ সালের ২৬শে আগস্ট কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত 'রডা অ্যান্ড কোম্পানি'র অস্ত্র লুটের এক দুঃসাহসিক অভিযান চালানো হয়। এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন অনুকূল মুখার্জী ও বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি।

রডা কোম্পানির কর্মচারী এবং বিপ্লবীদের সহযোগী হাবিলদার শ্রীশচন্দ্র মিত্র (হাবু মিত্র) এই লুণ্ঠনে সরাসরি সাহায্য করেন। তিনি কাস্টমস থেকে অস্ত্র খালাস করে সাতটি গরুর গাড়ির মধ্যে একটি পুরো গাড়ি (যাতে ৯টি বাক্স ছিল) বিপ্লবীদের গোপন আস্তানায় সরিয়ে ফেলেন। এই লুণ্ঠনে বিপ্লবীরা ৫০টি অত্যাধুনিক 'মাউজার পিস্তল' (Mauser Pistols) এবং ৪৬,০০০ রাউন্ড গুলি হস্তগত করেন। মাউজার পিস্তলের বিশেষত্ব ছিল যে, এর সাথে একটি কাঠের খাপ যুক্ত করে একে দূরপাল্লার রাইফেলের মতো ব্যবহার করা যেত। লুণ্ঠিত এই মাউজার পিস্তলগুলোই পরবর্তীতে বাঘা যতীনের হাতে পৌঁছায়, যা দিয়ে তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা বুড়িবালামের তীরে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ সম্মুখ যুদ্ধ করেছিলেন।


৪. বিশ্বাসঘাতকতা এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের তৎপরতা:

বিপ্লবীদের এই সর্বভারতীয় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের বিশাল পরিকল্পনাটি সফল হলে ভারতের ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আন্তর্জাতিক স্তরে ব্রিটিশ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল।

তথ্য ফাঁস: চেকোস্লোভাকিয়ার কিছু গুপ্তচর এবং আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা এই জার্মান অস্ত্র আমদানির খবর আগেভাগেই জেনে যায়। ডাচ ও ব্রিটিশ নৌবাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে এবং 'ম্যাভেরিক' জাহাজটিকে সমুদ্রের মাঝপথেই জব্দ করা হয়। ফলে অস্ত্রের সেই বিশাল চালান আর ভারতের উপকূলে পৌঁছাতে পারেনি।

কলকাতায় তল্লাশি: অস্ত্রের জাহাজ আটকের পাশাপাশি কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস অগাস্টাস টেগার্ট (Charles Tegart) শহরজুড়ে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করেন। কলকাতায় 'হ্যারি অ্যান্ড সন্স' (Harry & Sons) এবং 'ইউনিভার্সাল এম্পোরিয়াম' নামক যে ছদ্মবেশী কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বিপ্লবীরা জার্মান টাকা ও অস্ত্রের হিসাব রাখতেন, ব্রিটিশ পুলিশ সেখানে হানা দেয়। সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু কাগজপত্র এবং চিরকুটের সূত্র ধরে পুলিশ ওড়িশার বালেশ্বরে বিপ্লবীদের গোপন ঘাঁটির সন্ধান পেয়ে যায়।


৫. কাপ্তিপাদার জঙ্গল এবং বিপ্লবীদের আত্মগোপন:

জার্মান অস্ত্র রিসিভ করার জন্য বাঘা যতীন তাঁর চার ঘনিষ্ঠ তরুণ সহযোদ্ধাকে নিয়ে ওড়িশার বালেশ্বর জেলার ময়ূরভঞ্জ সংলগ্ন কাপ্তিপাদা (মহুলডিহা) গ্রামের এক গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন করে ছিলেন। এই চার তরুণ সহযোদ্ধা হলেন—চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, জ্যোতিষচন্দ্র পাল, নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এবং মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত।

কাপ্তিপাদায় বাঘা যতীন 'রামানন্দ স্বামী' ছদ্মনামে এক সাধুর বেশে থাকতেন এবং তাঁর সঙ্গীরা তাঁর শিষ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় মানুষজন এই বলিষ্ঠ ও পরোপকারী সাধুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে খবর পৌঁছানোর পর চার্লস টেগার্ট এবং বালেশ্বরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলবির (Kilby) নেতৃত্বে বিশাল এক পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী বালেশ্বরে পৌঁছে যায় এবং বিপ্লবীদের ঘাঁটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার প্রস্তুতি নেয়।


৬. দুর্গম পথ পাড়ি (জঙ্গল, ক্ষুধা এবং বিভ্রান্ত গ্রামবাসী):

১৯১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ব্রিটিশ পুলিশের অভিযানের আগাম খবর পেয়ে বিপদ বুঝে বাঘা যতীন তাঁর চার সঙ্গীকে নিয়ে কাপ্তিপাদার জঙ্গল ছেড়ে পায়ে হেঁটে পালাতে শুরু করেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল বালেশ্বর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানো অথবা দুর্গম ডুভিগর পর্বতশ্রেণি পার হয়ে কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া।

বাঘা যতীন এবং তাঁর চার সঙ্গী টানা কয়েক দিন না খেয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং কর্দমাক্ত জঙ্গল পার হয়ে নিজেদের যাত্রা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নেয়। তারা স্থানীয় গ্রামবাসীদের মধ্যে ঢোল পিটিয়ে খবর রটিয়ে দেয় যে, জঙ্গল দিয়ে একদল "কুখ্যাত সশস্ত্র বাঙালি ডাকাত" পালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন আরও ঘোষণা করে যে, এই ডাকাতদের ধরিয়ে দিতে পারলে বা তাদের খবর দিতে পারলে গ্রামবাসীদের বিশাল অঙ্কের নগদ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।

পুরস্কারের লোভ ও ডাকাতদের ভয়ে কিছু বিভ্রান্ত গ্রামবাসী পুলিশের কাছে বিপ্লবীদের অবস্থান ও চলাচলের খবর পাচার করে দেয়। এমনকি বেশ কয়েক জায়গায় গ্রামবাসীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বিপ্লবীদের পথ আটকানোরও চেষ্টা করে। বাঘা যতীন চাইলেই তাঁর হাতের মাউজার পিস্তল দিয়ে গ্রামবাসীদের গুলি করে রাস্তা পরিষ্কার করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল— "দেশের সাধারণ নিরীহ মানুষের গায়ে আমরা কিছুতেই হাত তুলব না, আমাদের গুলি কেবল ব্রিটিশদের জন্যই বরাদ্দ।"


বুড়িবালামের যুদ্ধে বাঘাযতীন ও ইংরেজরা

৭. ঐতিহাসিক বুড়িবালামের যুদ্ধ (সেই রক্তস্নাত ৭৫ মিনিট):

দিনটি ছিল ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫। দিনভর টানা হাঁটার পর ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এবং পরিশ্রান্ত পাঁচ বিপ্লবী ওড়িশার বালেশ্বর শহরের উপকণ্ঠে চষাকণ্ড (Chashakhand) নামক একটি গ্রামে এসে পৌঁছান। তাঁদের সামনে ছিল খরস্রোতা বুড়িবালাম (বা বুড়িবালাং) নদী। সাঁতার কেটে তাঁরা কোনোমতে নদী পার হন। কিন্তু ওপারে গিয়েই তাঁরা বুঝতে পারেন যে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

চার্লস টেগার্ট, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলবি এবং মিলিটারি লেফটেন্যান্ট রাদারফোর্ডের নেতৃত্বে কয়েকশো আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ সেনা এবং পুলিশ চারপাশ থেকে তাঁদের ঘিরে ফেলেছে। পালানোর আর কোনো রাস্তা নেই।

সব পথ বন্ধ দেখে বাঘা যতীন কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ না করে, বুক চিতিয়ে বীরের মতো মুখোমুখি লড়াই করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তাঁর তরুণ সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে সেই কালজয়ী কথাটি বললেন, "আর পালানো নয়। যুদ্ধ করে যদি আমরা মরি, তবে আমাদের রক্ত বৃথা যাবে না। আমরা মরব, আর দেশ জাগবে।"

কৌশলগত অবস্থান ও বাঙ্কার যুদ্ধ (Trench Warfare): যুদ্ধে সেনাপতির মতো বাঘা যতীন তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন। নদীর তীরের একটি উঁচু উইপোকার ঢিবিকে (Termite mound) তাঁরা প্রাকৃতিক বাঙ্কার বা পরিখা (Trench) হিসেবে ব্যবহার করেন। বাঙ্কার তৈরি করে লড়াই করার আধুনিক সামরিক কৌশল ব্যবহার করে বাঘা যতীন তাঁর পাঁচজনের ক্ষুদ্র বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন।

অসম লড়াইয়ের সূচনা: এটি ছিল আধুনিক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম অসম যুদ্ধ। একদিকে বিপ্লবীদের সম্বল বলতে ছিল অসীম মনোবল এবং রডা কোম্পানি থেকে লুট করা গুটিকয়েক মাউজার পিস্তল। অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ছিল আধুনিক ট্রিপল-নট-থ্রি (.303) রাইফেল, যা দিয়ে অনেক দূর থেকে নিখুঁত নিশানায় গুলি করা যেত।

দুপুরের দিকে মূল যুদ্ধ শুরু হয়। ব্রিটিশ বাহিনী দূর থেকে বিপ্লবীদের পরিখা লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। বাঘা যতীন নির্দেশ দেন, একটিও গুলি যেন নষ্ট না হয়। বিপ্লবীরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, নিখুঁত নিশানায় মাউজার পিস্তল থেকে পাল্টা ফায়ার করতে থাকেন। তাঁদের নির্ভুল নিশানায় বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সেনা ও পুলিশ লুটিয়ে পড়ে। মাত্র পাঁচজন তরুণের এই তীব্র ও ভয়ংকর প্রতিরোধ দেখে ব্রিটিশ কমান্ডাররা স্তব্ধ ও আতঙ্কিত হয়ে গিয়েছিলেন। প্রায় পঁচাত্তর (৭৫) মিনিট ধরে চলে এই রোমাঞ্চকর বন্দুকযুদ্ধ। বুড়িবালামের তীর বারুদের গন্ধে এবং গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে।


৮. যুদ্ধের করুণ ও গৌরবময় পরিণতি:

অল্প কয়েকটি মাউজার পিস্তল এবং সীমিত গোলাবারুদ দিয়ে একটি বিশাল ও আধুনিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব ছিল। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে বিপ্লবীদের এক করুণ অথচ গৌরবময় পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়:

  চিত্তপ্রিয়ের আত্মদান: লড়াই চলাকালীন ব্রিটিশদের একটি বুলেট এসে তরুণ বিপ্লবী চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীর মাথায় বিদ্ধ হয়। বাঘা যতীনের চোখের সামনেই এই বীর বিপ্লবী মাতৃভূমির জন্য রণাঙ্গনেই প্রাণ বিসর্জন দেন।

  বাঘা যতীনের পতন: সম্মুখ সমরে সেনাপতির মতো লড়তে লড়তে বাঘা যতীন শরীরে একাধিক গুলি পেয়ে গুরুতর আহত হন। তাঁর পেটে এবং ডান হাতে মারাত্মকভাবে গুলি লাগে। তাঁর শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিল এবং এক পর্যায়ে তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

  গুলি ফুরিয়ে যাওয়া: এক সময় বিপ্লবী মনোরঞ্জন, নীরেন এবং জ্যোতিষের হাতে থাকা মাউজার পিস্তলের সমস্ত কার্তুজ ও গুলি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়।

  বন্দিত্ব বরণ: বন্দুকের গুলি শেষ হয়ে গেলে, রক্তে লুণ্ঠিত ও অচেতন বাঘা যতীন এবং তাঁর বাকি তিন তরুণ সহযোদ্ধাকে ব্রিটিশ বাহিনী বন্দি করে।


৯. বালেশ্বর হাসপাতালে মহাপ্রয়াণ এবং বিচার:

মারাত্মক আহত এবং অচেতন অবস্থায় বাঘা যতীনকে বালেশ্বর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ব্রিটিশরা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখে চিকিৎসা করতে চেয়েছিল, যাতে তাঁর কাছ থেকে অন্যান্য বিপ্লবীদের গোপন তথ্য এবং জার্মান অস্ত্রের পুরো ছক আদায় করা যায়। কিন্তু বাঘা যতীন তা হতে দেননি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি নিজের হাতে নিজের ক্ষতের সেলাই ও ব্যান্ডেজ ছিঁড়ে ফেলেন, যাতে দ্রুত মৃত্যু ঘটে এবং ব্রিটিশদের হাতে কোনো তথ্য না যায়।

মৃত্যুর আগে বাঘা যতীন সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং তাঁর তরুণ সহযোদ্ধাদের নির্দোষ বলে দাবি করেন, যাতে ব্রিটিশরা তাঁদের ওপর কোনো অমানুষিক অত্যাচার না করে বা ফাঁসি না দেয়। তিনি ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছিলেন, "যা করার আমি করেছি, ওই অল্পবয়সী ছেলেগুলো নির্দোষ, ওদের ছেড়ে দিন।"

পরের দিন, অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ সালে, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বালেশ্বর হাসপাতালে হাসিমুখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অমর সেনাপতি।

বাকি বিপ্লবীদের পরিণতি:

বাঘা যতীনের অনুরোধ ব্রিটিশরা রাখেনি। স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে প্রহসন শুরু হয়। মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত ও নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এই দুই বীর তরুণকে ব্রিটিশ আদালত ফাঁসির সাজা শোনায়। ২২ নভেম্বর ১৯১৫ তারিখে বালেশ্বর জেলেই হাসিমুখে তাঁরা ফাঁসির দড়ি গলায় পরেন। গুরুতর আহত জ্যোতিষচন্দ্র পালকে যাবজ্জীবন বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেলে এবং পরে বহরমপুর জেলে পাঠানো হয়। ব্রিটিশদের অমানুষিক অত্যাচারে তিনি জেলের ভেতরেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং পরে কারারুদ্ধ অবস্থাতেই ১৯২৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।


ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও উপসংহার:

বালেশ্বর সংগ্রাম বা বুড়িবালামের যুদ্ধে বাঘা যতীন এবং তাঁর সঙ্গীরা সামরিকভাবে জয়লাভ করতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু তাঁরা পরাধীন ভারতের বুকে এমন এক বীরত্বের আখ্যান লিখে গিয়েছিলেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের বিপ্লবীদের জন্য এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

টেগার্টের স্বীকারোক্তি: বিপ্লবীদের অসীম সাহসিকতা স্বয়ং ব্রিটিশদেরও স্তম্ভিত করেছিল। যুদ্ধের পর বাঘা যতীনের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কলকাতার কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার চার্লস অগাস্টাস টেগার্ট স্যালুট জানিয়েছিলেন এবং তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন—

 "বাঘা যতীন যদি ইউরোপীয় হতেন, তবে তাঁর বীরত্বের সম্মানে আল্পস পর্বতে অথবা লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে তাঁর ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হতো। আমি আমার জীবনে এমন অকুতোভয় বীর আর দেখিনি।"

পরবর্তী প্রজন্মের ওপর প্রভাব: বাঘা যতীনের সেই অমর বাণী—"আমরা মরব, জগৎ জাগবে"—অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। বুড়িবালামের এই অসম ও আত্মঘাতী যুদ্ধ ভারতের যুবসমাজের শিরায় শিরায় বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ভগত সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, মাস্টারদা সূর্য সেন থেকে শুরু করে স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মহানায়কদের মনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়ার চূড়ান্ত অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল এই বালেশ্বর সংগ্রাম। মাউজার পিস্তল হাতে উইপোকার ঢিবির পেছনে শুয়ে থাকা সেই পাঁচ তরুণের রক্তই ছিল আগামী দিনের স্বাধীন ভারতের উজ্জ্বল ভোরের প্রথম সূর্যোদয়। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ভারতের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ