ভূমিকা:
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে কয়েকটি ঘটনা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে এক নতুন দিশা ও অভূতপূর্ব তীব্রতা প্রদান করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো 'সাইমন কমিশন' (Simon Commission) বা 'ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিউটরি কমিশন' গঠন এবং এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা দেশব্যাপী স্বতঃস্ফূর্ত গণ-বিক্ষোভ। ১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে সাময়িক শূন্যতা ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছিল, সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন সেই স্থবিরতা ভেঙে ভারতীয়দের মনে পুনরায় স্বাধীনতার আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছিল।
একটি ব্লগের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে নিচে সাইমন কমিশনের পটভূমি, গঠন, উদ্দেশ্য, ভারতীয়দের তীব্র ক্ষোভের কারণ, দেশব্যাপী আন্দোলনের বিবরণ এবং এর ঐতিহাসিক ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ঐতিহাসিক পটভূমি:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতীয়দের রাজনৈতিক দাবিদাওয়া মেটানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে "মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার" (Montagu-Chelmsford Reforms) বা ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের একটি অন্যতম শর্ত বা ধারা ছিল যে, আইনটি কতটা কার্যকর হয়েছে এবং ভারতীয়দের আরও শাসনতান্ত্রিক অধিকার দেওয়া যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্য ঠিক দশ বছর পর (অর্থাৎ ১৯২৯ সালে) একটি রয়্যাল কমিশন বা পর্যবেক্ষক দল ভারতে পাঠানো হবে।
কিন্তু ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে ভারতের জাতীয় আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ব্রিটিশদের 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতির ফলে হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের আন্দোলন ক্রমশ সাম্প্রদায়িক দিকে মোড় নিতে থাকে। শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য স্বরাজ্য দল (চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে) এবং সাধারণ ভারতবাসীর ক্রমবর্ধমান দাবি ব্রিটিশ সরকারকে বিচলিত করে তোলে।
এর পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক কারণও ছিল। ব্রিটেনে তখন ক্ষমতাসীন ছিল রক্ষণশীল দল (Conservative Party)। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, আসন্ন ১৯২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারা শ্রমিক দলের (Labour Party) কাছে পরাজিত হতে পারে। ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশের শাসনতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব বামঘেঁষা শ্রমিক দলের হাতে ছেড়ে দিতে তারা নারাজ ছিল। তাই সরকার ১০ বছরের মেয়াদ শেষ হবার আগেই তড়িঘড়ি করে কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
২. সাইমন কমিশন গঠন (Formation of the Simon Commission):
ইংরেজ সরকার ভীত হয়ে এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ই নভেম্বর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৭ জন সদস্যকে নিয়ে একটি সংবিধিবদ্ধ কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের সরকারি নাম ছিল 'ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিউটরি কমিশন' (Indian Statutory Commission)।
খ্যাতনামা ব্রিটিশ আইনজীবী ও উদারপন্থী দলের (Liberal Party) সাংসদ স্যার জন সাইমন (Sir John Simon) এই কমিশনের সভাপতি বা নেতা হিসেবে নিযুক্ত হওয়ায়, এটি সাধারণ মানুষের কাছে "সাইমন কমিশন” নামেই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে।
এই কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন:
রক্ষণশীল দলের (Conservative Party) চারজন সদস্য: লর্ড স্ট্র্যাথকোনা, লর্ড বার্নহাম, কর্নেল স্টিফেন ওয়ালশ এবং জর্জ লেন ফক্স।
শ্রমিক দলের (Labour Party) দুজন সদস্য: মেজর ক্লিমেন্ট অ্যাটলি (যিনি পরবর্তীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন এবং যাঁর আমলে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে) এবং ভার্নন হার্টশর্ন।
এইভাবে যে কমিশন ভারতের কোটি কোটি মানুষের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের জন্য গঠন করা হলো, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাতে একজনও ভারতীয় সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো না। কমিশনটি কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয়। ব্রিটিশ সরকারের তৎকালীন ভারত সচিব (Secretary of State for India) লর্ড বার্কেনহেড এর যৌক্তিকতা হিসেবে অহংকারভরে বলেন যে, এটি একটি ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি কমিশন এবং ভারতীয়রা যেহেতু সর্বসম্মত কোনো সংবিধান রচনায় অক্ষম, তাই এই কমিশনে ভারতীয় সদস্য নেওয়ার কোনো আইনি বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই।
৩. সাইমন কমিশনের উদ্দেশ্য (Objectives of the Commission):
ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সাইমন কমিশনকে ভারতে পাঠানোর পেছনে মূলত নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যগুলি ধার্য করা হয়েছিল:
১৯১৯ সালের আইনের মূল্যায়ন: মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার (১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ) আইনের কার্যকারিতা বিচার করা এবং প্রদেশগুলিতে প্রবর্তিত 'দ্বৈত শাসন' (Dyarchy) ব্যবস্থা কতটা সফল হয়েছে তা খতিয়ে দেখা।
ভারতীয়দের প্রশাসনিক যোগ্যতার পরীক্ষা: ভারতীয়রা নিজেদের শাসনভার নিজেরা গ্রহণ করার জন্য বা দায়িত্বশীল সরকার গঠনের জন্য কতটা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে যোগ্য হয়ে উঠেছে, তার মূল্যায়ন করা।
ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের রূপরেখা: ভারতের জন্য ভবিষ্যতে আর কতটুকু শাসনতান্ত্রিক সংস্কার প্রয়োজন এবং শিক্ষার প্রসার ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির উন্নতি কীভাবে করা যায়, তা নির্ধারণ করা।
৪. ভারতীয়দের ক্ষোভের কারণ: "জাতীয় অপমান" (Causes of Indian Resentment):
সাইমন কমিশন ঘোষণার সাথে সাথেই সমগ্র ভারতবর্ষে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এর প্রধান কারণগুলি ছিল:
শ্বেতাঙ্গ কমিশন ও বর্ণবৈষম্য: ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনা এবং ভারতীয়রা সরকার গঠনের উপযুক্ত কিনা তা বিচার করার জন্য গঠিত কমিশনের সাতজন সদস্যের মধ্যে একজনও ভারতীয় ছিলেন না। ব্রিটিশদের এই চরম বর্ণবিদ্বেষী সিদ্ধান্তকে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা এবং বামপন্থী সহ সমস্ত রাজনৈতিক দল ভারতের "জাতীয় অপমান” (National Insult) হিসেবে গ্রহণ করে।
সার্বভৌমত্বে আঘাত: ভারতীয়দের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, ভারতের সংবিধান রচনার অধিকার কেবল ভারতীয়দেরই থাকা উচিত। কিন্তু ভারতীয় জনমতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শুধুমাত্র বিদেশি শ্বেতাঙ্গ সদস্যদের দ্বারা গঠিত কমিশনকে ভারতের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়াকে ভারতীয়রা মেনে নিতে পারেনি।
লর্ড বার্কেনহেডের দাম্ভিকতা: ভারত সচিব লর্ড বার্কেনহেড প্রকাশ্যে ভারতীয় নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে কটাক্ষ করেন এবং চ্যালেঞ্জ ছোঁড়েন যে ভারতীয়রা নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোনো সংবিধান রচনা করতে পারবে না। এই দম্ভ ভারতীয়দের আত্মসম্মানে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।
৫. সাইমন কমিশন বর্জন ও দেশব্যাপী গণ-আন্দোলন (Nationwide Boycott and Protests):
সাইমন কমিশন গঠন ভারতীয় রাজনীতিতে এক জাদুকরী ঐক্যের সৃষ্টি করে। বিক্ষিপ্ত রাজনৈতিক দলগুলো এক ছাতার তলায় এসে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়।
ক) কমিশনকে বর্জনের শপথ:
১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে মাদ্রাজে ড. এম. এ. আনসারির সভাপতিত্বে জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, "সর্বাবস্থায় এবং সর্বতোভাবে" (at every stage and in every form) সাইমন কমিশনকে বর্জন করা হবে। এমনকি মহম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ এবং তেজবাহাদুর সাপ্রুর নেতৃত্বাধীন লিবারেল ফেডারেশনও এই কমিশনকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
খ) বোম্বাইতে ঐতিহাসিক বিক্ষোভ:
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩রা ফেব্রুয়ারি স্যার জন সাইমন তাঁর দলবল নিয়ে বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) বন্দরে পদার্পণ করেন। ওই দিন সারা ভারতে সর্বাত্মক 'হরতাল' পালিত হয়। দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, বাজার সব বন্ধ থাকে। মানুষের হাতে হাতে ঘোরে কালো পতাকা এবং আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয় একটিমাত্র স্লোগান— "সাইমন ফিরে যাও" (Go back Simon)।
গ) শ্রমিক ও যুবসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ:
তৎকালীন বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক মন্দার (Great Depression) ফলে ভারতেও ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই, বেকারত্ব, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন হ্রাস এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করে। শুধুমাত্র বোম্বাই শহরেই প্রায় ৫০,০০০ বস্ত্রকল শ্রমিক এই আন্দোলনে মিলিত হয়েছিল। জওহরলাল নেহেরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তরুণ নেতাদের উদ্যোগে দেশের ছাত্র ও যুব সমাজ এই আন্দোলনে এক বিশিষ্ট ও অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে।
ঘ) যুক্তপ্রদেশ ও বাংলায় পুলিশের নির্যাতন:
যুক্তপ্রদেশে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) লখনউ শহরে সাইমন বিরোধী বিশাল শোভাযাত্রা পরিচালনা করতে গিয়ে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, গোবিন্দ বল্লভ পন্থ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জের শিকার হন। পুলিশের প্রহারে গোবিন্দ বল্লভ পন্থ চিরতরে শারীরিক অক্ষমতার শিকার হন। অন্যদিকে, কলকাতায় সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক "অরন্ধন" ও "ধর্মঘট" পালিত হয়।
ঙ) লালা লাজপত রায়ের আত্মদান:
সাইমন বিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটে পাঞ্জাবের লাহোরে। ১৯২৮ সালের ৩০শে অক্টোবর সাইমন কমিশন লাহোরে পৌঁছালে, পাঞ্জাব কেশরী "লালা লাজপত রায়"-এর নেতৃত্বে এক বিশাল কালো পতাকার মিছিল স্টেশন ঘেরাও করে। পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট স্কট এবং সন্ডার্সের নির্দেশে পুলিশ এই শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর বর্বরোচিত লাঠিচার্জ করে।
মিছিলের পুরোভাগে থাকা বৃদ্ধ জননেতা লাজপত রায়ের মাথায় ও বুকে পুলিশের লাঠির নির্মম আঘাত লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, "আমার শরীরে পড়া পুলিশের প্রতিটি লাঠির আঘাত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে প্রমাণিত হবে।" আহত হওয়ার কয়েকদিন পর ১৭ই নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু গোটা দেশকে ক্রোধে উন্মত্ত করে তোলে এবং পরবর্তীতে ভগত সিং ও তাঁর সঙ্গীরা সন্ডার্সকে হত্যা করে এই মৃত্যুর প্রতিশোধ নেন।
৬. সাইমন রিপোর্ট পেশ ও সুপারিশসমূহ (Submission of the Simon Report):
দেশজুড়ে প্রায় দু'বছর ধরে চলা তীব্র গণ-আন্দোলন, কালো পতাকা এবং বয়কটের ঘেরাটোপের মধ্যেই কমিশন দুইবার ভারত সফর করে। অবশেষে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে কমিশন তাদের দুই খণ্ডের সুবৃহৎ রিপোর্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করে। এই রিপোর্টের প্রধান সুপারিশগুলো ছিল:
১. প্রদেশগুলোতে ১৯১৯ সালের 'দ্বৈত শাসন' ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে 'প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন' (Provincial Autonomy) প্রবর্তন করা।
২. ভারতের জন্য একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো (Federal Structure) গঠনের রূপরেখা তৈরি করা।
৩. কেন্দ্রে এখনই কোনো দায়িত্বশীল সরকার বা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা গঠন না করা।
৪. মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা (Separate Electorates) বহাল রাখা।
৭. সাইমন কমিশনের ফলাফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব (Results and Historical Impact):
কমিশনের রিপোর্ট ভারতীয়দের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হলেও, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই কমিশনের পরোক্ষ প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:
১) নেহেরু রিপোর্ট (১৯২৮): ব্রিটিশ সরকার ও লর্ড বার্কেনহেড ভারতীয়দের সংবিধান রচনার যোগ্যতা নিয়ে যে কটাক্ষ করেছিল, জাতীয় কংগ্রেস অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় কমিটি ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের একটি খসড়া প্রস্তুত করে, যা ইতিহাসে "নেহেরু রিপোর্ট" নামে খ্যাত। এটি ছিল ভারতীয়দের দ্বারা প্রথম সংবিধান রচনার ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা।
২) পূর্ণ স্বরাজের দাবি: সাইমন কমিশনের অবজ্ঞা এবং নেহেরু রিপোর্ট ব্রিটিশরা না মানায়, কংগ্রেসের মধ্যে চরমপন্থীদের (নেহেরু-সুভাষ) প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এর ফলশ্রুতিতেই ১৯২৯ সালে লাহোর কংগ্রেসে ঐতিহাসিক 'পূর্ণ স্বরাজ' (Complete Independence)-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়।
৩) আইন অমান্য আন্দোলনের সূত্রপাত: সাইমন কমিশনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে ব্রিটিশ বিরোধী প্রবল গণ-আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল, তা সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। এই উত্তপ্ত পটভূমির ওপর ভিত্তি করেই ১৯৩০ সালে গান্ধীজীর নেতৃত্বে ডান্ডি অভিযানের মাধ্যমে ঐতিহাসিক 'আইন অমান্য আন্দোলন' (Civil Disobedience Movement) শুরু হয়।
৪) ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন: সাইমন কমিশনের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই লন্ডনে তিনটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং পরিশেষে এর সুপারিশগুলোর ওপর সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে সুবিখ্যাত "ভারত শাসন আইন" (Government of India Act 1935) প্রণয়ন করা হয়।
উপসংহার:
পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক আকাশে যখন হতাশার কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছিল, ঠিক সেই জাতীয় অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনে সাইমন কমিশন গঠন এবং এর বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন এক নতুন আলোর দিশা নিয়ে আসে। সাইমন কমিশন মূলত ভারতীয়দের শাসনতান্ত্রিক অধিকার দেওয়ার নাম করে চরম বৈষম্যের জাল বুনেছিল। কিন্তু এর ফলাফল হয়েছিল ঠিক বিপরীত। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, হিন্দু-মুসলমান, ধনী-নির্ধন, শ্রমিক-কৃষক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সমগ্র ভারতবাসী যেভাবে একজোট হয়ে সাইমন বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তা জাতীয়তাবাদের ভাবধারাকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যায়। সাইমন কমিশন শুধু একটি শ্বেতাঙ্গ কমিশনই ছিল না, এটি ছিল সেই স্ফুলিঙ্গ যা ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবির বারুদে অগ্নিসংযোগ করেছিল।


0 মন্তব্যসমূহ