ওয়াভেল পরিকল্পনা (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ)



ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা খুব জটিল ছিল। ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো' (Quit India) আন্দোলনের পরে কংগ্রেসের প্রথম সারির বেশিরভাগ নেতা জেলে গিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার এবং ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো অচলাবস্থায় পড়েছিল। যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। মিত্রশক্তি, বিশেষ করে আমেরিকা ও চীন, ব্রিটিশদের ওপর বেশি চাপ দিচ্ছিল যাতে তারা ভারতের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করে।

১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসে লর্ড লিনলিথগোর পরে লর্ড আর্কিবল্ড ওয়াভেল (Lord Archibald Wavell) ভারতে নতুন ভাইসরয় হন। লর্ড আর্কিবল্ড ওয়াভেল রাজনৈতিক অচল কাটাতে এবং ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা দিতে একটি অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে চান। এজন্য লর্ড আর্কিবল্ড ওয়াভেল ১৯৪৫ সালের মার্চে লন্ডনে যান। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে, লর্ড আর্কিবল্ড ওয়াভেল ১৯৪৫ সালের ১৪ জুন ভারতে ফিরে এসে একটি সম্প্রচারিত ভাষণে প্রস্তাব দেন। ঐ প্রস্তাবকে ইতিহাসে "ওয়াভেল পরিকল্পনা” (Wavell Plan) বলা হয়।


ওয়াভেল পরিকল্পনার প্রধান প্রস্তাবনা (Key Proposals):

এই পরিকল্পনা ভারতের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তন করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করে: 

 কার্যনির্বাহী পরিষদের পুনর্গঠন: ভাইসরয় কার্যনির্বাহী পরিষদকে (Executive Council) সম্পূর্ণ নতুনভাবে গঠন করবে। কার্যনির্বাহী পরিষদ অস্থায়ী জাতীয় সরকারের মতো কাজ করবে।

ভারতীয়দের নিরঙ্কুশ আধিপত্য: ভাইসরয় এবং সেনাপ্রধান (Commander-in-Chief) বাদে নতুন পরিষদের সব সদস্য ভারতীয় হবে।

সমতাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব: নতুন শাসন পরিষদে হিন্দু ও মুসলমানের ভারসাম্য বজায় রাখতে, প্রস্তাব করে বর্ণহিন্দু (Caste Hindus) এবং মুসলমানের সমান সংখ্যক (Equal Representation) প্রতিনিধি রাখা হবে।

সংখ্যালঘুদের স্থান: হিন্দু ও মুসলমানের পাশাপাশি তপশিলি জাতি (Depressed Classes), শিখ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদেরও কাউন্সিলে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব পাবে।

 পররাষ্ট্র দপ্তর হস্তান্তর: ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর (External Affairs), যা আগে ব্রিটিশদের হাতে ছিল, প্রথমবারের মতো একজন ভারতীয় সদস্যের হাতে দেবে।

ভাইসরয়ের ভেটো ক্ষমতা: ভাইসরয়ের হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও, তিনি অযৌক্তিকভাবে বা দৈনন্দিন কাজে ভেটো ব্যবহার করবেন না।

 ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনা: ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনা একটি সাময়িক ব্যবস্থা ছিল। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতারা একসাথে নতুন ও স্থায়ী সংবিধান রচনা করবেন।


সিমলা সম্মেলন (The Simla Conference - ১৯৪৫):

লর্ড ওয়াভেল ওয়াভেল পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে ভারতের ২১ জন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে একত্রিত করে সম্মেলন ডাকে। ১৯৪৫ সালের ২৫ জুন হিমাচল প্রদেশের সিমলায় সম্মেলন শুরু করে। সম্মেলন সিমলা সম্মেলন নামে পরিচিত।

সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধী ছিলেন, কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সরাসরি আলোচনায় অংশ নেননি। তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মহম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন।


সিমলা সম্মেলন ও ওয়াভেল পরিকল্পনার ব্যর্থতার মূল কারণগুলো:

সম্মেলনটি ভালোভাবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে চরম মতবিরোধের ফলে ভেঙে পড়ল। সম্মেলনের প্রধান কারণগুলো ছিল:

 জিন্নাহর একগুঁয়ে দাবি: মহম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ভারতের সব মুসলমানের একমাত্র প্রতিনিধি হল 'মুসলিম লীগ'। তাই ভাইসরয়ের কাউন্সিলে মুসলমানের জন্য বরাদ্দ সব আসনে সদস্য মনোনয়নের একমাত্র অধিকার মুসলিম লীগই থাকবে। অন্য কোনো দল মুসলমান সদস্য পাঠাতে পারবে না।

 কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান: জাতীয় কংগ্রেস জিন্নাহর দাবি কঠোরভাবে নাকচ করে। কংগ্রেস নিজে কোনো ধর্মের দল বলে না; কংগ্রেস সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে বলে দাবি করে। কংগ্রেসের মতে, কংগ্রেসের কোটা থেকে তারা চাইলে যেকোনো ধর্মের, এমনকি মুসলিমের, নেতা কাউন্সিলে পাঠাতে পারে। (উল্লেখ্য, কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি মৌলানা আজাদ, যিনি মুসলিম ছিলেন)

 পাঞ্জাবের ইউনিয়নিস্ট পার্টির দাবি: পাঞ্জাবের আঞ্চলিক দল ইউনিয়নিস্ট পার্টি চায় যে, দল থেকে অন্তত একজন মুসলিম প্রতিনিধি কাউন্সিলে থাকবে। জিন্নাহ এই চাহিদা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

 লর্ড ওয়াভেলের নতিস্বীকার: কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব সমাধান করতে লর্ড ওয়াভেল ব্যর্থ হন। লর্ড ওয়াভেল জিন্নাহর দাবির সামনে স্বীকার করে ১৯৪৫ সালের ১৪ জুলাই জানিয়ে দেন যে সিমলা সম্মেলন ব্যর্থ হয়েছে।


ঐতিহাসিক গুরুত্ব (Historical Significance):

ওয়াভেল পরিকল্পনা ব্যর্থ হল, তবু ভারতের ইতিহাসে বড় প্রভাব ফেলেছে। ব্যর্থতা মহম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক মর্যাদা অনেক বাড়িয়েছে। ওয়াভেল পরিকল্পনা ব্যর্থতা দেখায় মুসলিম লীগের সম্মতি ছাড়া ভারতে কোনো রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক পরিবর্তন ঘটতে পারে না। শেষমেশ, ওয়াভেল পরিকল্পনা ব্যর্থতা ভারতের বিভাজন (Partition of India) এবং পাকিস্তান গঠনের পথকে সহজ ও অনিবার্য করেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ