হিটলার ও সুভাষচন্দ্র বসু: ঐতিহাসিক বিতর্কিত অধ্যায়

হিটলার ও সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ

পটভূমি:-

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝড় উঠলে সুভাষচন্দ্র বসু বুঝলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতা ব্যবহার করে ভারতের স্বাধীনতা নেওয়া এখনই সুযোগ। একই সময়ে ভারতের রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি আর সুভাষচন্দ্র বসুর ধারণার মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ দেখা দিল। ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরেও গান্ধীর অনুসারীদের অসহযোগিতার কারণে সুভাষচন্দ্র বসু পদত্যাগ করলেন এবং ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করলেন। ব্রিটিশ সরকার সুভাষচন্দ্রকে গৃহবন্দি করে রাখে। সুভাষচন্দ্র মনে করতেন, স্বাধীনতা শুধু শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা আপস দিয়ে আসবে না। তাই ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ সরকারের নজরবন্দি এড়িয়ে নেতাজি ছদ্মবেশে কলকাতা থেকে পালিয়ে যান। আফগানিস্তান ও রাশিয়া হয়ে তিনি ১৯৪১ সালের এপ্রিলে বার্লিনে (জার্মানি) পৌঁছান। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল—"শত্রুর শত্রু আমাদের বন্ধু" এই নীতিকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে অক্ষশক্তির (জার্মানি, ইতালি, জাপান) সাহায্য নেওয়া।

জার্মান সহযোগে ফ্রী ইন্ডিয়া সেন্টার গঠন

জার্মানি যাত্রা ও সামরিক প্রস্তুতি:-

১৯৪১ সালের ১৭ই জানুয়ারি রাত গভীর হলে সুভাষচন্দ্র কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ি ছেড়ে পুলিশের নজর এড়িয়ে পলায়ন করেন। ইতিহাসে এই পলায়নকে ‘মহানিষ্ক্রমণ (The Great Escape)’ বলা হয়। প্রথমে সুভাষচন্দ্র মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন নামে মুসলিম বিমা এজেন্টের ছদ্মনাম ব্যবহার করে কলকাতা থেকে গোমো, পেশোয়ার হয়ে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পৌঁছান। কাবুলে পৌঁছে তিনি কিছুদিন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আশ্রয় নেন। সেখানে ইতালীয় দূতাবাসের সাহায্যে তিনি নিজেকে 'অরল্যান্ডো মাজোত্তা' (Orlando Mazzotta) নামধারী এক ইতালীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন এবং ইউরোপ যাওয়ার জন্য একটি ভুয়ো পাসপোর্ট জোগাড় করেন। কাবুল থেকে ইতালীয় ও জার্মানদের সাহায্যে হিন্দুকুশ পর্বতমালা এবং আফগান-সোভিয়েত সীমান্তের আমু দরিয়া (Amu Darya) নদী পার হয়ে তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান উজবেকিস্তান) সমরখন্দে পৌঁছান। সমরখন্দ থেকে ট্রেনে করে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) রাজধানী মস্কোয় পৌঁছান। মস্কো থেকে ১৯৪১ সালের এপ্রিলে অবশেষে সুভাষচন্দ্র জার্মানির রাজধানী বার্লিনে পৌঁছান। জার্মানিতে পৌঁছানোর পর তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য জার্মান সরকারের সরাসরি সমর্থন ও স্পষ্ট ঘোষণার আশায় চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেন।

হিটলারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বললেন নেতাজি

ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ:

এক বছরের বেশি অপেক্ষার পর, ১৯৪২ সালের ২৯ মে পূর্ব প্রুশিয়ার উলফস লেয়ার (Wolf's Lair)-এ জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের সদর দপ্তরে সুভাষচন্দ্র বসু হিটলারের সঙ্গে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ করেন। সুভাষচন্দ্র বসু এবং হিটলারের বৈঠক সুভাষচন্দ্র বসুর প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। হিটলার ভারতের স্বাধীনতার জন্য কোনো স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন না, সরাসরি সামরিক সাহায্যও করলেন না। বৈঠকে সুভাষচন্দ্র সাহসের সঙ্গে হিটলারের আত্মজীবনী ‘মেইন কাম্ফ’‑এ ভারতীয়দের সম্পর্কে অবমাননাকর ও বর্ণবাদী মন্তব্যের কঠোর প্রতিবাদ করলন। সুভাষচন্দ্র চোখে চোখ রেখে বললেন, এই অবমাননাকর ও বর্ণবাদী মন্তব্য ভারতীয়দের মধ্যে বিরূপ অনুভূতি তৈরি করে এবং ব্রিটিশরা তা ব্যবহার করে অপপ্রচার ছড়ায়। হিটলার অপ্রত্যাশিত প্রতিবাদে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন এবং হিটলার পরবর্তী সংস্করণে বইটি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিলেন।

হিটলার স্পষ্টভাবে বলেন, জার্মানি সরাসরি ভারতকে সাহায্য করতে পারে না। হিটলার মানচিত্র দেখিয়ে সুভাষচন্দ্রকে বুঝিয়ে দেন, জার্মান সেনাবাহিনী তখন ককেশাসে ছিল, যা ভারতের সীমান্ত থেকে অনেক দূরে। হিটলার জার্মান সেনার সরাসরি হস্তক্ষেপ সম্ভব নয় বলে জানান। তবে হিটলারের সরকার কিছুটা সাহায্য দিল, সুভাষচন্দ্র বার্লিনে 'ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার' (Free India Centre) গড়ে তুললেন। উত্তর আফ্রিকায় রোমেল বন্দি করা ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে সুভাষচন্দ্র প্রায় তিন হাজার লোকের একটি দক্ষ বাহিনী গড়ে তুললেন। এই বাহিনীর নাম 'ফ্রি ইন্ডিয়া লিজিয়ন' (Free India Legion) অথবা 'টাইগার লিজিয়ন'। এছাড়াও, সুভাষচন্দ্র জার্মানি থেকে 'আজাদ হিন্দ রেডিও' চালু করলেন এবং ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বকে প্রথমবার বেতার তরঙ্গে। বজ্রকণ্ঠ শোনায় - “আমি সুভাষ বলছি..."। হিটলার সুভাষচন্দ্রকে পরামর্শ দেন, পূর্ব এশিয়ায় গিয়ে জাপান থেকে সাহায্য নিতে। হিটলার সুভাষচন্দ্রকে নিরাপদে পৌঁছাতে জার্মান সাবমেরিন (U-boat) পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

জার্মানিতে আজাদ হিন্দ রেডিওতে প্রথম কথা বললেন নেতাজি

জার্মানির বাহিনী কেন ভারতে আসতে পারল না ?

নেতাজি জার্মানিতে যে সেনা দল গঠন করেছিলেন, তার নাম ছিল 'ফ্রি ইন্ডিয়া লিজিয়ন' (Free India Legion)। এতে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ ভারতীয় সৈন্য ছিলেন। কিন্তু জার্মানির সেনাবাহিনী জার্মানিতেই থেকে গিয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় কারণ-

যাতায়াতের সুদীর্ঘ দূরত্ব: জার্মানি থেকে জাপান বা ভারতের দূরত্ব হাজার হাজার মাইল। ১৯৪৩ সালের দিকে সমুদ্র এবং আকাশপথ—দুটোই মিত্রশক্তির (আমেরিকা ও ব্রিটেন) কড়া পাহারায় ছিল। এত বড় একটা সেনাবাহিনীকে লুকিয়ে জাহাজ বা বিমানে করে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় নিয়ে আসা সামরিকভাবে একেবারেই অসম্ভব ছিল।

নেতাজির নিজের যাত্রাই ছিল বিপজ্জনক: নেতাজি যখন জার্মানি থেকে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তিনি কোনো সাধারণ জাহাজে আসতে পারেননি। তাঁকে অত্যন্ত গোপনে একটি জার্মান সাবমেরিনে (U-Boat) চড়তে হয়েছিল। আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে ওলন্দাজ উপকূলের কাছে মাঝসমুদ্রে তিনি জার্মান সাবমেরিন থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি জাপানি সাবমেরিনে স্থানান্তরিত হন। একটি সাবমেরিনে বড়জোর কয়েকজন মানুষ ধরে, আস্ত সেনাবাহিনী আনা অসম্ভব।

জার্মান বাহিনীর পরিণতি: নেতাজি চলে আসার পর সেই ভারতীয় সৈন্যরা জার্মানিতেই থেকে যান। পরবর্তীতে জার্মানির পতনের পর ব্রিটিশ বাহিনী তাঁদের বন্দী করে ভারতে নিয়ে আসে।

জার্মানিদের সঙ্গে আলোচনা নেতাজির

প্রতিক্রিয়া:-

১) সুভাষচন্দ্রের প্রতিক্রিয়া:- হিটলারের সঙ্গে বৈঠকের পর সুভাষচন্দ্র বুঝলেন জার্মানি সরাসরি ভারতকে সামরিক সাহায্য দিতে পারবে না, আর হিটলারের বর্ণবাদী মনোভাবের কারণে ভারতীয়দের প্রতি সত্যিকারের কোন সহানুভূতি নেই। তবু সুভাষচন্দ্র হাল ছাড়লেন না। হিটলারের প্রস্তাবিত সাবমেরিন ব্যবহার করে জাপানে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি জার্মানিতে যে 'ফ্রি ইন্ডিয়া লিজিয়ান' গঠন করেছিলেন সেই বাহিনী নিয়ে ভারতে আসতে পারলেন না। জার্মানি থেকে সুভাষচন্দ্র যে বড় শিক্ষা নিলেন—দেশের স্বাধীনতা নিজের রক্তে অর্জন করতে হবে, বিদেশি শক্তির উপর নির্ভর করে নয়।

২) হিটলার ও জার্মানির দৃষ্টিভঙ্গি:- হিটলার ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে ও সুযোগ-সুবিধা দিতে রাজি ছিলেন, তবে ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে অস্বীকার করলেন। হিটলার মূলত ভারতীয় লিজিয়নকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপের হাতিয়ার (Propaganda tool) হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। হিটলার কৌশল ইউরোপীয় ও রুশ যুদ্ধক্ষেত্রকে ভারতের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেন।

৩) ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া:- সুভাষচন্দ্র এবং হিটলারের চুক্তি, এবং জার্মানিতে ভারতীয় সেনাদল গঠনের খবর, ব্রিটিশ সরকারকে ভয় দেখায়। সরকার বিবিসি (BBC) ও অন্যান্য মিডিয়া ব্যবহার করে সুভাষচন্দ্রকে 'ফ্যাসিস্টদের দালাল', 'বিশ্বাসঘাতক' বলে প্রচার করে। এরপর সরকার ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন, পীড়ন এবং নজরদারি বাড়িয়ে দেয়।

৪) জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া:- মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু এবং মৌলানা আজাদ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা সুভাষচন্দ্রের পদক্ষেপকে তীব্রভাবে সমালোচনা করে। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা ফ্যাসিবাদী ও নাৎসি শক্তির সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতা আনার কোনো চেষ্টার বিরোধ করে। জওহরলাল নেহেরু এত রেগে ছিলেন যে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, সুভাষচন্দ্র যদি বিদেশি ফ্যাসিস্ট সেনা নিয়ে ভারতে আসে, তবে তিনি তলোয়ার হাতে তাঁর বিরোধিতা করবেন।

৫) সাধারণ ভারতবাসীর প্রতিক্রিয়া:- কংগ্রেস নেতারা সমালোচনা করলেও, আজাদ হিন্দ রেডিওতে সুভাষচন্দ্রের ভাষণ অন্ধকারে এক ঝলক আলো দিল। ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন ব্রিটিশদের নির্মম অত্যাচারে প্রায় থেমে গিয়েছিল, তখন জার্মানি থেকে আসা সুভাষচন্দ্রের কণ্ঠ যুবসমাজের হৃদয়ে নতুন বিপ্লবের আগুন জ্বালালো।

আংশিক হিটলার সমর্থন পেলেন নেতাজি

মন্তব্য:-

সুভাষচন্দ্র বসু ও হিটলারের সাক্ষাৎ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি বিতর্কিত, তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিছু মানুষ সুভাষচন্দ্রকে ফ্যাসিস্ট দলের সহযোগী বলে দাবি করেন, কিন্তু ইতিহাস বলে সুভাষচন্দ্র কখনোই নাজি মতবাদকে সমর্থন করেননি। সুভাষচন্দ্রের জন্য হিটলারের সঙ্গে দেখা করা কেবল রাজনৈতিক দরকার এবং দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে কঠিন চেষ্টা ছিল। যেমন জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকাকে স্বাধীন করতে ফরাসি সাহায্য নিয়েছিলেন, তেমনি সুভাষচন্দ্রও মাতৃভূমির মুক্তির জন্য নিজের আদর্শগত ব্যক্তি পদত্যাগ করে বাস্তববাদী কূটনীতি বেছে নিয়েছেন। জার্মানির অভিজ্ঞতা সুভাষচন্দ্রকে পূর্ব এশিয়ায় নিয়ে গেল, আজাদ হিন্দ ফৌজের কঠিন নেতৃত্ব নিতে এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু করতে পথ খুলে দিল। এরপর সুভাষচন্দ্র বুঝলেন ভারত স্বাধীন করতে সরাসরি জার্মানির সাহায্য করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে এশিয়ায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একের পর এক জয়লাভ করছিল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। এমনকি হিটলার যার কাছে সাহায্য চাইতে বলেছিল সেই রাষ্ট্র হল জাপান। ১৯৪০ এর দশকের শুরুতে জাপানের সামরিক শক্তি এতটাই অপ্রতিরোধ্য রূপ নিয়েছিল, যে এশিয়ায় তাদেরকে থামানো প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ বা ডাচদের মতো পরাশক্তিগুলো জাপানের সামনে খরকূটোর মত উড়ে গিয়েছিল। তাই আর দেরি না করে সুভাষচন্দ্র জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এর পরের আর্টিকেলে সুভাষচন্দ্র ও জাপানের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ