যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘাযতীন): ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিপুরুষ

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বাঘাযতীন

জন্ম ও বংশ পরিচয়:

১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে (মাতুলালয়ে) জন্মগ্রহণ করেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল ঝিনাইদহের রিশখালি গ্রামে। বাবা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন এক পণ্ডিত মানুষ, কিন্তু যতীনের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। পিতৃহীন যতীন এবং তাঁর বড় বোন বিনোদবালাকে বড় করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে মা শরৎশশী দেবী-র ওপর। শরৎশশী দেবী ছিলেন সেকালের এক ব্যতিক্রমী নারী—শিক্ষিতা, স্বাধীনচেতা এবং স্বভাবকবি। তিনি যতীনকে রামায়ণ, মহাভারত এবং রাজপুত বীরদের শৌর্য-বীর্যের গল্প শুনিয়ে বড় করেন। তাঁর মায়ের মূল মন্ত্রই ছিল— "কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না।" মায়ের এই শিক্ষাই যতীনের চরিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছোটবেলা থেকেই কুস্তি, লাঠিখেলা, সাঁতার এবং ঘোড়ায় চড়ায় অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

'বাঘা যতীন' উপাধি প্রাপ্তি:

যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কীভাবে 'বাঘা যতীন' হলেন, সেই ঘটনাটি রূপকথার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।১৯০৬ সালের ঘটনা। তিনি কুষ্টিয়ায় তাঁর নিজের গ্রামে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। একদিন খবর আসে যে, লোকালয়ে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ঢুকে পড়েছে এবং গ্রামবাসীদের আক্রমণ করছে। গ্রামের মানুষকে বাঁচাতে যতীন্দ্রনাথ একটি সাধারণ ভোজালি (dagger) হাতে নিয়ে বাঘের মুখোমুখি হন। দীর্ঘক্ষণ বাঘের সাথে তাঁর মরণপণ লড়াই চলে। বাঘের থাবায় তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ভোজালি দিয়ে বাঘটির ঘাড় লক্ষ্য করে এমন নিখুঁত আঘাত করেন যে বাঘটি সেখানেই লুটিয়ে পড়ে মারা যায়।

তাঁর এই অসীম সাহসিকতার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে একটি 'রৌপ্য পদক' (Silver Shield) দিয়ে পুরস্কৃত করে এবং এরপর থেকেই তিনি দেশবাসীর কাছে 'বাঘা যতীন' নামে পরিচিত হন।


ছাত্রজীবন ও স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাব:

প্রাথমিক শিক্ষা শেষে যতীন্দ্রনাথ কৃষ্ণনগর অ্যাংলো-ভার্নাকুলার স্কুলে ভর্তি হন এবং পরে কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজে (বর্তমান ক্ষুদিরাম বসু মেমোরিয়াল কলেজ) পড়াশোনা শুরু করেন।

কলকাতায় আসার পরই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়। এখানে তাঁর পরিচয় হয় ভগিনী নিবেদিতা এবং স্বামী বিবেকানন্দের সাথে। স্বামীজির সেই বিখ্যাত বাণী— "লোহার মতো পেশি আর ইস্পাতের মতো স্নায়ু চাই" (Muscles of iron and nerves of steel) যতীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

১৮৯৯ সালে কলকাতায় ভয়াবহ প্লেগ মহামারি দেখা দিলে স্বামী বিবেকানন্দের ডাকে সাড়া দিয়ে যতীন্দ্রনাথ মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি মহামারিতে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করতেন। স্বামীজির আদর্শ থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, পরাধীন জাতির সবচেয়ে আগে প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক শক্তি অর্জন করা।


কর্মজীবন এবং ব্রিটিশ সেনার দম্ভ চূর্ণ করা:

পড়াশোনা শেষে যতীন্দ্রনাথ শর্টহ্যান্ড ও টাইপিং শিখে বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে (সরকারি দপ্তরে) চাকরি পান। তাঁর কাজে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ কর্তারা তাঁকে আর্থিকভাবে বেশ সুবিধাজনক পদে বসান। কিন্তু চাকরিতে থাকলেও তাঁর ভেতরে সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন জ্বলত।

রেল স্টেশনের ঘটনা: বাঘ মারার ঘটনার আগেই তিনি তাঁর অসীম সাহসের প্রমাণ দিয়েছিলেন। একবার তিনি ট্রেনে করে কলকাতা থেকে ফিরছিলেন। পথে একটি স্টেশনে তিনি দেখেন কয়েকজন ব্রিটিশ সেনা এক নিরীহ ভারতীয়কে বিনা কারণে লাথি মারছে এবং গালিগালাজ করছে। যতীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করলে তারা তাঁকেও আক্রমণ করে। কিন্তু শরীরচর্চায় পোক্ত যতীন্দ্রনাথ একাই খালি হাতে সেই চার-পাঁচজন সুঠামদেহী ব্রিটিশ সেনাকে এমন মার মারেন যে তারা হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ সরকার এই ঘটনার তদন্ত করলেও যতীন্দ্রনাথের কোনো দোষ প্রমাণ করতে পারেনি।

সশস্ত্র বিপ্লবে পদার্পণ: ১৯০৩ সালের দিকে ভগিনী নিবেদিতার মাধ্যমেই যতীন্দ্রনাথের পরিচয় হয় বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবের অন্যতম প্রবক্তা অরবিন্দ ঘোষ (পরবর্তীতে শ্রী অরবিন্দ)-এর সাথে।

অরবিন্দ ঘোষ যতীন্দ্রনাথের শারীরিক গঠন এবং মানসিক তেজ দেখে মুগ্ধ হন। তিনি যতীনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, "আমার এমন কিছু তরুণ চাই, যারা দেশের জন্য হাসিমুখে প্রাণ দিতে পারে।" যতীন্দ্রনাথ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলেছিলেন, "আমি প্রস্তুত।"

এরপরই তিনি অরবিন্দ ঘোষের নির্দেশনায় বাংলার গুপ্ত বিপ্লবী দল 'অনুশীলন সমিতি'-র সাথে যুক্ত হন। বিপ্লবীদের শরীরচর্চা, লাঠিখেলা ও অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণের দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। বিপ্লবীদের অর্থ জোগাড় এবং গুপ্ত প্রচার চালানোর জন্য তিনি কলকাতায় 'ছাত্র ভাণ্ডার' নামে একটি মেস ও দোকান তৈরি করেন, যা কার্যত হয়ে ওঠে সশস্ত্র বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র।


হাওড়া-শিবপুর ষড়যন্ত্র মামলা ও জেলজীবন (১৯১০):

১৯০৮ সালে 'আলিপুর বোমা মামলা'-য় অরবিন্দ ঘোষসহ বাংলার প্রথম সারির বহু বিপ্লবী গ্রেপ্তার হলে বিপ্লবী আন্দোলন কিছুটা থমকে যায়। কিন্তু বাঘা যতীন হাল ছাড়েননি। তিনি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া বিপ্লবীদের পুনরায় একত্রিত করতে শুরু করেন।

এই সময় পুলিশের ডিএসপি (DSP) শামসুল আলম বিপ্লবীদের ওপর চরম অত্যাচার চালাচ্ছিলেন এবং গুপ্ত সংগঠনগুলোর গোপন খবর ব্রিটিশদের কাছে পাচার করছিলেন। বাঘা যতীন নির্দেশ দেন শামসুল আলমকে সরিয়ে দেওয়ার। ১৯১০ সালের ২৪ জানুয়ারি, কলকাতা হাইকোর্টের ভেতরে যতীনের নির্দেশে তরুণ বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত ডিএসপি শামসুল আলমকে গুলি করে হত্যা করেন।

এর পরপরই ব্রিটিশ পুলিশ বাঘা যতীন এবং তাঁর আরও ৪৬ জন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। এটি ইতিহাসে 'হাওড়া-শিবপুর ষড়যন্ত্র মামলা' (১৯১০) নামে পরিচিত। হাওড়া জেলে ১১ মাস বন্দি অবস্থায় তাঁর ওপর চরম মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালানো হয়। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ১৯১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।


যুগান্তর দলের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে উত্থান:

জেল থেকে বেরিয়ে বাঘা যতীন এক নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। অরবিন্দ ঘোষ তখন রাজনীতি ছেড়ে পণ্ডিচেরিতে চলে গেছেন, অনেক শীর্ষ নেতা জেলে বা নির্বাসনে। বাংলার বিপ্লবী দলগুলো তখন ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত।

এই চরম সংকটের মুহূর্তে বাঘা যতীন সমগ্র বাংলার বিপ্লবীদের এক ছাতার নিচে আনার বিশাল উদ্যোগ নেন। তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, চুম্বকের মতো আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং অসীম সাহসের কারণে হুগলি, যশোর, খুলনা, মেদিনীপুর থেকে শুরু করে সমগ্র বাংলার বিপ্লবীরা তাঁকে তাদের সুপ্রিম কমান্ডার (Supreme Commander) হিসেবে মেনে নেয়। বিভক্ত অনুশীলন সমিতির বিভিন্ন শাখা একত্রিত হয়ে তাঁর নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে 'যুগান্তর দল' হিসেবে।

 সারা ভারতব্যাপী বিদ্রোহের পরিকল্পনা: বাঘা যতীন বুঝতে পেরেছিলেন শুধু বাংলায় বিপ্লব করলে হবে না। তাই তিনি উত্তর ভারতের প্রখ্যাত বিপ্লবী রাসবিহারী বসু-র সাথে হাত মেলান।

যতীন্দ্রনাথের ডানহাত হিসেবে উঠে আসেন নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (যিনি পরে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেতা এম. এন. রায় হিসেবে পরিচিত হন)।

যুগান্তর দলের নেতা হিসেবে বাঘা যতীনের মন্ত্র ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—ছোটখাটো গুপ্তহত্যা নয়, সরাসরি ব্রিটিশদের সাথে সম্মুখ সমর করতে হবে। আর এই চিন্তাধারা থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে জার্মানির কাছ থেকে অস্ত্র আমদানি করে ভারতজুড়ে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সেই অমর পরিকল্পনা, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ঐতিহাসিক বুড়িবালামের যুদ্ধ।


 রডা কোম্পানির অস্ত্র লুণ্ঠন (২৬ আগস্ট, ১৯১৪):

কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত 'রডা অ্যান্ড কোম্পানি' (Rodda & Co.) ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম বড় অস্ত্র বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং শ্বেতাঙ্গ শিকারিরা এখান থেকেই অস্ত্র কিনত। যুগান্তর ও অন্যান্য বিপ্লবী দলের কাছে খবর আসে যে, এই কোম্পানিতে জার্মানি থেকে তৈরি প্রচুর অত্যাধুনিক 'মাউজার পিস্তল' (Mauser Pistols) আসতে চলেছে।

বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নেন, ব্রিটিশদের অস্ত্র দিয়েই ব্রিটিশদের বধ করা হবে। বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি এবং অনুকূল মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই অস্ত্র লুণ্ঠনের একটি নিখুঁত ছক কষা হয়।


দুঃসাহসিক সেই অভিযানের ছক:

ভেতরের চর: রডা কোম্পানিতে শ্রীশচন্দ্র মিত্র (হাবু) নামে এক বাঙালি যুবক কাজ করতেন, যিনি গোপনে বিপ্লবীদের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি খবর দেন যে ১৯১৪ সালের ২৬ আগস্ট কাস্টমস হাউস থেকে অস্ত্রের বিশাল চালান রডা কোম্পানির গুদামে যাবে।

ছদ্মবেশ: পরিকল্পনা অনুযায়ী বিপ্লবী হরিদাস দত্ত একজন গরুর গাড়ির গাড়োয়ান (চালক)-এর ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তিনি পরনে ময়লা ধুতি, হাতে লাঠি এবং মুখে মেটে রঙের মেকআপ নিয়ে কাস্টমস হাউসের সামনে গিয়ে হাজির হন।

অপারেশন রডা: ২৬ আগস্ট কাস্টমস হাউস থেকে অস্ত্র নিয়ে মোট ৭টি গরুর গাড়ি রডা কোম্পানির গুদামের দিকে রওনা দেয়। প্রথম ৬টি গাড়ির সাথে কোম্পানির দারোয়ান ছিল, কিন্তু হাবু মিত্র কৌশলে ৭ নম্বর গাড়িটির দায়িত্বে থাকেন এবং সেই গাড়ির চালক ছিলেন ছদ্মবেশী হরিদাস দত্ত।

লুটপাট: ডালহৌসি স্কোয়ার পার হওয়ার সময় হাবু মিত্র ও হরিদাস দত্ত ৭ নম্বর গরুর গাড়িটিকে মূল রাস্তা থেকে ঘুরিয়ে মলঙ্গা লেনের একটি গোপন আস্তানায় নিয়ে যান।

লুণ্ঠিত অস্ত্রের পরিমাণ ও প্রভাব: সেই একটিমাত্র গরুর গাড়ি থেকে বিপ্লবীরা ৫০টি অত্যাধুনিক মাউজার পিস্তল এবং ৪৬,০০০ রাউন্ড গুলি লুট করেন। মাউজার পিস্তলের বিশেষত্ব ছিল, এর সাথে একটি কাঠের খাপ যুক্ত করে একে দূরপাল্লার রাইফেলের মতো ব্যবহার করা যেত। তৎকালীন বিখ্যাত পত্রিকা The Statesman এই ঘটনাকে "The greatest daylight robbery" (দিনের আলোয় সর্বশ্রেষ্ঠ ডাকাতি) বলে আখ্যায়িত করেছিল। এই লুণ্ঠিত মাউজার পিস্তলগুলোই পরবর্তীতে বাঘা যতীনের যুগান্তর দলের বিপ্লবীদের হাতে পৌঁছে যায়, যা দিয়ে তাঁরা বুড়িবালামের যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করেছিলেন।


বাঘা যতীন এবং রাসবিহারী বসুর ঐতিহাসিক জোট:

রডা কোম্পানির অস্ত্র লুণ্ঠনের পর বাংলার বিপ্লবীদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে ওঠে। কিন্তু বাঘা যতীন জানতেন, শুধু বাংলায় বিদ্রোহ করলে ব্রিটিশরা সহজেই তা দমন করে ফেলবে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের মতো একটি সর্বভারতীয় সশস্ত্র সেনা-অভ্যুত্থান প্রয়োজন। আর এই স্বপ্ন পূরণের জন্যই তিনি হাত মেলান উত্তর ভারতের অবিসংবাদিত বিপ্লবী নেতা রাসবিহারী বসুর সাথে।

দুই মহারথীর সাক্ষাৎ: রাসবিহারী বসু ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা ভারতীয় সেনাদের (সিপাহিদের) মধ্যে বিদ্রোহ ছড়ানোর মূল কারিগর। ১৯১২ সালে বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা নিক্ষেপ করে তিনি গোটা ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনীর ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন। ১৯১৩-১৪ সালের দিকে বারাণসী (কাশী) এবং কলকাতায় এই দুই মহান নেতার একাধিক গোপন বৈঠক হয়। দুজনের চিন্তাধারা ছিল এক—প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশরা এখন ইউরোপে ব্যস্ত, ভারতে তাদের সৈন্য সংখ্যা কম, এটাই আঘাত হানার শ্রেষ্ঠ সময়।

দায়িত্ব বণ্টন ও সর্বভারতীয় পরিকল্পনা: যুগান্তর দলের সুপ্রিম কমান্ডার বাঘা যতীন এবং রাসবিহারী বসু মিলে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেন, যা ইতিহাসে 'গদর ষড়যন্ত্র' (Ghadar Mutiny) বা 'হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র' নামে পরিচিত। কাজের সুবিধার্থে তাঁরা ভারতবর্ষকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে নেন:

১. রাসবিহারী বসুর দায়িত্ব (উত্তর ও পশ্চিম ভারত):

রাসবিহারী বসু এবং তাঁর সহযোদ্ধারা (যেমন- বিষ্ণু গণেশ পিংলে, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল) উত্তর ভারত, পাঞ্জাব, লাহোর, মিরাট এবং আগ্রার ব্রিটিশ সেনা ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ভারতীয় সিপাহিদের সাথে গোপন যোগাযোগ স্থাপন করেন। আমেরিকা ও কানাডা থেকে ফিরে আসা 'গদর পার্টি'-র শিখ বিপ্লবীরাও এই পরিকল্পনায় যোগ দেন। ঠিক হয়, একটি নির্দিষ্ট দিনে সমস্ত ক্যান্টনমেন্টের সিপাহিরা একযোগে ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা করে অস্ত্রাগার দখল করবে।

২. বাঘা যতীনের দায়িত্ব (বাংলা ও পূর্ব ভারত):

বাঘা যতীনের দায়িত্ব ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতি পরিচালনা করা এবং পূর্ব ভারতকে মুক্ত করা। জার্মানি থেকে সমুদ্রপথে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র আসার কথা ছিল (SS Maverick জাহাজে), তা গ্রহণ করার দায়িত্ব নেন বাঘা যতীন। পরিকল্পনা ছিল, জার্মান অস্ত্র হাতে পেলেই যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা কলকাতা দখল করে নেবে এবং উত্তর ভারতের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে। বাঘা যতীন এবং রাসবিহারী বসু মিলে সারা ভারতে একযোগে সেনা বিদ্রোহ শুরু করার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ দিনটিকে নির্ধারণ করেছিলেন।

পরিকল্পনার ব্যর্থতা:

দুর্ভাগ্যবশত, কৃপাল সিং নামক এক শিখ পুলিশের গুপ্তচর বিপ্লবীদের দলে ঢুকে পড়ে এবং নির্দিষ্ট দিনের আগেই ব্রিটিশদের কাছে বিদ্রোহের সমস্ত খবর ফাঁস করে দেয়। খবর পেয়ে ব্রিটিশরা রাতারাতি সমস্ত ক্যান্টনমেন্টের সন্দেহভাজন ভারতীয় সেনাদের নিরস্ত্র করে এবং শত শত গদর বিপ্লবীকে ফাঁসি দেয়। রাসবিহারী বসু অবস্থা বেগতিক দেখে ছদ্মবেশে জাপানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন (যেখানে বসে তিনি পরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা আইএনএ তৈরি করেছিলেন)। আর অন্যদিকে, বাঘা যতীন জার্মান অস্ত্রের আশায় উড়িষ্যার বালেশ্বর উপকূলে গিয়ে আত্মগোপন করেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ঐতিহাসিক বুড়িবালামের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের কিভাবে সূচনা হলো তা নিচে আলোচনা করা হলো।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ইন্দো-জার্মান ষড়যন্ত্র (The Zimmermann Plan)

বাঘা যতীন বুঝতে পেরেছিলেন, ছোটখাটো গুপ্তহত্যা করে ব্রিটিশদের ভারত থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সর্বভারতীয় সশস্ত্র গণ-অভ্যুত্থান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ব্রিটিশদের চরম শত্রু জার্মানির সাথে হাত মেলান।

অস্ত্র আমদানির পরিকল্পনা: প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের (পরবর্তীতে এম. এন. রায়) মাধ্যমে জার্মানির সাথে চুক্তি হয়। পরিকল্পনা ছিল, জার্মানি থেকে 'ম্যাভেরিক' (SS Maverick) নামের একটি জাহাজে করে প্রচুর অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং অর্থ ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলে (উড়িষ্যার বালেশ্বর এবং সুন্দরবন এলাকায়) পাঠানো হবে।

বিশাল ছক: এই অস্ত্র হাতে পেলে বাংলার বিপ্লবীরা ফোর্ট উইলিয়াম দখল করবে এবং কলকাতা থেকে রেললাইন কেটে দিয়ে কলকাতাকে ভারতের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্রিটিশদের পতন ঘটাবে।

বিশ্বাসঘাতকতা ও পুলিশের অভিযান: কিন্তু এই বিশাল ও নিখুঁত পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারেনি। ইউরোপের কিছু গুপ্তচর এবং আমেরিকার পুলিশের মাধ্যমে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা এই অস্ত্র আমদানির খবর আগেভাগেই জেনে যায়।

কলকাতায় 'হ্যারি অ্যান্ড সন্স' (Harry & Sons) নামক যে ছদ্মবেশী কোম্পানির মাধ্যমে বিপ্লবীরা টাকা ও অস্ত্র গ্রহণ করতেন, ব্রিটিশ পুলিশ সেখানে হানা দেয়। বাঘা যতীন অবস্থা বেগতিক দেখে তাঁর চার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা—চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, নীরেন দাশগুপ্ত, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং জ্যোতিষ চন্দ্র পাল-কে নিয়ে উড়িষ্যার বালেশ্বরে (কাপ্তিপোদা জঙ্গলে) আত্মগোপন করেন। কিন্তু স্থানীয় এক গ্রামবাসীর বিশ্বাসঘাতকতায় পুলিশ তাঁদের গোপন আস্তানার খোঁজ পেয়ে যায়।


ঐতিহাসিক বুড়িবালামের যুদ্ধ (৯ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫):

পুলিশের তাড়া খেয়ে বাঘা যতীন এবং তাঁর সঙ্গীরা বালেশ্বরের বুড়িবালাম নদীর তীরে এসে পৌঁছান। দিনটি ছিল ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫।

ব্রিটিশ পুলিশের কুখ্যাত অফিসার চার্লস টেগার্ট (Charles Tegart) এবং রাদারফোর্ডের নেতৃত্বে বিশাল এক পুলিশ ও সামরিক বাহিনী বিপ্লবীদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। নদীর তীরে উইপোকার ঢিবিকে ট্রেঞ্চ (Trench) হিসেবে ব্যবহার করে পাঁচজন বাঙালি যুবক শুরু করেন আধুনিক সামরিক ইতিহাসে অন্যতম অসম এবং বীরত্বপূর্ণ এক লড়াই।

অসম লড়াই: একদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর আধুনিক রাইফেল ও মেশিনগান, অন্যদিকে বিপ্লবীদের হাতে থাকা মাত্র কয়েকটি মাউজার পিস্তল (Mauser Pistols)।

রণাঙ্গনের চিত্র: টানা ৭৫ মিনিট ধরে দুই পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড গুলি বিনিময় চলে। বাঘা যতীনের নিখুঁত নিশানায় বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয়।

সহযোদ্ধার মৃত্যু: লড়াইয়ের এক পর্যায়ে চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। বাঘা যতীনের ডান হাতে এবং পেটে মারাত্মকভাবে গুলি লাগে। প্রচুর রক্তক্ষরণে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাকি তিন সহযোদ্ধা ধরা পড়েন।

মহাপ্রয়াণ ও চিরন্তন অনুপ্রেরণা: মারাত্মক আহত অবস্থায় বাঘা যতীনকে বালেশ্বর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর শরীর থেকে প্রচুর রক্ত ঝরে গিয়েছিল। ব্রিটিশরা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখে তথ্য আদায় করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজের হাতে নিজের ব্যান্ডেজ ছিঁড়ে ফেলেন।

পরদিন, ১০ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান অগ্নিপুরুষ। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, "এত রক্ত ছিল শরীরে? জানতাম না তো! আমরা মরব, দেশ জাগবে।"

বাঘা যতীনের এই আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়নি। তাঁর বীরত্ব পরবর্তীতে সূর্য সেন, ভগত সিং এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মতো বিপ্লবীদের মনে ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের দাবানল জ্বালিয়েছিল। স্বয়ং ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার চার্লস টেগার্ট বাঘা যতীনের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 

"এই লোকটি যদি ইংরেজ হয়ে জন্মাত, তবে আমি তার মূর্তি ট্রাফালগার স্কোয়ারে স্থাপন করতাম।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ