মাস্টারদা সূর্যসেন: চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান, জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ ও ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ

মাস্টারদা সূর্য সেন ও তার ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ

ভূমিকা:

পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যখন আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি ভারতের স্বাধীনতা এনে দিতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন বাংলার একদল অকুতোভয় তরুণ দেশের স্বাধীনতার জন্য হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। এই সশস্ত্র বিপ্লববাদের বা 'অগ্নিযুগ'-এর ইতিহাসে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর, বীরত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী ঘটনাটি হলো ১৯৩০ সালের 'চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ' বা 'চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন'। আর এই সুবৃহৎ সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মূল কাণ্ডারি ছিলেন একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক যাঁকে ইতিহাস চেনে 'মাস্টারদা' সূর্য সেন নামে।

মাস্টারদা সূর্য সেন কেবল একজন বিপ্লবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অসামান্য সংগঠক, দূরদর্শী সেনাপতি এবং অগণিত তরুণের অনুপ্রেরণা। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম তিন দিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়েছিল। জালালাবাদ পাহাড়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ প্রতিটি ঘটনাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অহংকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মাস্টারদা সূর্য সেনের জীবন, চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান, জালালাবাদ পাহাড়ের অসম লড়াই, প্রীতিলতার আত্মত্যাগ এবং মাস্টারদার শেষ জীবনের নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।


মাস্টারদা সূর্য সেন ও চট্টগ্রাম অভ্যুত্থানের পটভূমি:

সূর্য কুমার সেন, যিনি আপামর ভারতবাসীর কাছে 'মাস্টারদা' নামে পরিচিত, তিনি ছিলেন অধুনা বাংলাদেশের চট্টগ্রামের উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের একজন সাধারণ ও শান্ত স্বভাবের অংকের শিক্ষক। বাইরে থেকে তাঁকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে তাঁর ভেতরে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার কী তীব্র আগুন জ্বলছে। সূর্য সেন গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, কেবল আবেদন-নিবেদন বা অহিংস পথে শক্তিশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ভারত থেকে উৎখাত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত সশস্ত্র অভ্যুত্থান।

তিনি আইরিশ বিপ্লবীদের (Irish Republican Army) এবং ১৯১৬ সালের 'ইস্টার রাইজিং'-এর আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। আয়ারল্যান্ডের আদলেই তিনি তাঁর বিপ্লবী সংগঠনের নাম রাখেন 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি' (চট্টগ্রাম শাখা)। তাঁর প্রধান সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, অম্বিকা চক্রবর্তী এবং নির্মল সেনের মতো তুখোড় তরুণ বিপ্লবীরা।


অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঐতিহাসিক পরিকল্পনা:

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল দিনটিকে মাস্টারদা বেছে নেন চট্টগ্রামকে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। অত্যন্ত নিখুঁত এবং গোপনীয়তার সাথে এই অভিযানের ছক কষা হয়েছিল। মাস্টারদার নির্দেশে বিপ্লবীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল রাত ১০টার সময় একযোগে আক্রমণ চালান।

তাঁরা সাফল্যের সাথে চট্টগ্রামের পুলিশ অস্ত্রাগার এবং অক্সিলিয়ারি ফোর্সের (Auxiliary Force) অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেন, শহরের টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ভবন বা এক্সচেঞ্জ ধ্বংস করে দেন এবং রেললাইন উপড়ে ফেলে চট্টগ্রামকে ভারতের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেন। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর মাস্টারদা সূর্য সেন পুলিশের সদর দপ্তরে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং নিজেকে 'প্রভিশনাল ইন্ডিপেনডেন্ট গভর্নমেন্ট' (Provisional Independent Government) বা অস্থায়ী স্বাধীন সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। তিন দিনের জন্য ব্রিটিশ শাসন চট্টগ্রাম থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।

মাস্টারদার নেতৃত্বে ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন


জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ (১৯৩০ সাল):

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল রাতে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সফল হলেও, মাস্টারদা খুব ভালো করেই জানতেন যে ব্রিটিশ বাহিনী শিগগিরই বিশাল সেনাবাহিনী এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রবল আক্রমণ শানাবে। বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার থেকে প্রচুর বন্দুক ও রাইফেল লুট করতে সক্ষম হলেও, দুর্ভাগ্যবশত পর্যাপ্ত গুলি (Ammunition) তাঁরা খুঁজে পাননি, কারণ বন্দুক এবং গুলি আলাদা জায়গায় রাখা হতো। এমতাবস্থায় শহরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মোটেও নিরাপদ নয় বুঝতে পেরে মাস্টারদা তাঁর দল নিয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করার সিদ্ধান্ত নেন।


পাহাড়ে আত্মগোপন ও চরম দুর্ভোগ:

১৯শে এপ্রিল থেকে ২১শে এপ্রিল পর্যন্ত এই তরুণ বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ে (যেমন—ফটিকছড়ির পাহাড়) লুকিয়ে দিন কাটাতে থাকেন। ব্রিটিশ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চিরুনি তল্লাশি এড়াতে তাঁরা দিনের বেলা গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতেন এবং রাতে পথ চলতেন। টানা তিন-চার দিন তাঁদের পেটে কোনো দানাপানি পড়েনি। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং পরিশ্রান্ত এই বিপ্লবীরা ২২শে এপ্রিল দুপুরে চট্টগ্রামের শহরতলী ফতেহাবাদের কাছে অবস্থিত জালালাবাদ পাহাড়ে এসে পৌঁছান।

জালালাবাদ পাহাড়ের চূড়া থেকে চারপাশের দৃশ্য অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যেত, তাই ব্রিটিশ বাহিনী আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার জন্য এই পাহাড়টিকেই তাঁরা সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।


ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণ ও যুদ্ধ প্রস্তুতি:

২২শে এপ্রিল বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বিপ্লবীদের অবস্থান টের পেয়ে যায়। ব্রিটিশ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস এবং সুরমা ভ্যালি লাইট হর্স (Surma Valley Light Horse) বাহিনীর এক বিশাল এবং সুসজ্জিত দল জালালাবাদ পাহাড় চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। এই ব্রিটিশ সেনাদলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন টেট (Captain Taitt) এবং ডিআইজি ফার্মার (DIG Farmer)।

যুদ্ধের ময়দানে দুই পক্ষের শক্তির পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ছিল অত্যাধুনিক লুইস মেশিনগান (Heavy Lewis Machine Gun) এবং দূরপাল্লার থ্রি-নট-থ্রি (.303 Lee-Enfield) রাইফেল। অন্যদিকে, মাস্টারদার বাহিনীর হাতে ছিল অস্ত্রাগার থেকে লুট করা পুরনো আমলের মাস্কেট্রি রাইফেল, রিভলভার এবং অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক গুলি। তা সত্ত্বেও বিপ্লবীদের মনোবল ছিল হিমালয়ের মতো অটল।


জালালাবাদ পাহাড়ের মূল যুদ্ধ ও অসম লড়াই:

২২শে এপ্রিলের পড়ন্ত বিকেলে ব্রিটিশ বাহিনী পাহাড়ের নিচ থেকে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে। মাস্টারদার নির্দেশ পাওয়া মাত্রই পাহাড়ের ওপর থেকে বিপ্লবীরা গর্জনে ফেটে পড়েন।

  প্রথম দফার লড়াই: তরুণ সেনাপতি লোকনাথ বলের বজ্রকঠিন নির্দেশে বিপ্লবীরা পাহাড়ের চূড়া থেকে ব্রিটিশদের দিকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে শুরু করেন। পাহাড়ের উচ্চতায় থাকার কারণে বিপ্লবীরা কৌশলগত সুবিধা পেয়েছিলেন। বিপ্লবীদের নিখুঁত নিশানায় বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্য তৎক্ষণাৎ মারা যায় এবং ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

  মেশিন গানের ব্রাশফায়ার: সম্মুখ সমরে টিকতে না পেরে ব্রিটিশ বাহিনী তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে। তারা জালালাবাদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সংলগ্ন আরেকটি পাহাড়ের চূড়ায় তাদের ভয়ংকর লুইস মেশিনগান স্থাপন করে। এরপর সেখান থেকে জালালাবাদ পাহাড়ের চূড়া লক্ষ্য করে অবিরাম ও নির্বিচার ব্রাশফায়ার চালাতে শুরু করে।

  বীরের মতো প্রতিরোধ: মেশিনগানের বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসা গুলির সামনে সাধারণ রাইফেল হাতে টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব ছিল। তা সত্ত্বেও লোকনাথ বল, অনন্ত সিং এবং অন্যান্য তরুণ বিপ্লবীরা মাটি কামড়ে দাঁড়িয়ে সেই গুলির মোক্ষম জবাব দিতে থাকেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবীদের অনেকেরই বয়স ছিল মাত্র ১৪ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।

মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে জালালাবাদ পাহাড়ে যুদ্ধ

শহিদদের অমর আত্মত্যাগ:

মেশিনগানের নির্মম গুলি একের পর এক পাহাড়ের মাটি তরুণ বিপ্লবীদের তাজা রক্তে লাল করে দেয়। এই ভয়ংকর যুদ্ধে মাস্টারদার বাহিনীর মোট ১২ জন তরুণ অকুতোভয় বিপ্লবী শহিদ হন।

এই যুদ্ধের প্রথম শহিদ ছিলেন সেনাপতি লোকনাথ বলের ছোট ভাই, কিশোর বিপ্লবী হরিগোপাল বল (যাঁকে সবাই আদর করে 'টেগরা' বলে ডাকত)। টেগরা যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে বড় ভাইয়ের কোলে লুটিয়ে পড়েন, তখন তাঁর শেষ কথা ছিল, "দাদা, আমি চললাম, তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও।"

এছাড়াও ত্রিপুরা সেনগুপ্ত, নির্মল লালা, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, নরেশ রায়, শশাঙ্ক দত্ত, মধুসূদন দত্ত, পুলিনচন্দ্র ঘোষ, জিতেন দাসগুপ্ত, মতিলাল কানুনগো, প্রভাত দাশ এবং অর্দ্ধেন্দু দস্তিদারের মতো বীর কিশোর ও যুবকরা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য হাসিমুখে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দেন। অন্যদিকে, এই রক্তক্ষয়ী সরাসরি লড়াইয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রায় ৮০ জন সৈন্য নিহত বা গুরুতরভাবে আহত হয়েছিল (যদিও ব্রিটিশ সরকার নিজেদের সম্মান বাঁচাতে সরকারি নথিতে নিহতের সংখ্যা অনেক কম দেখিয়েছিল)।


রাতের অন্ধকার এবং গেরিলা যুদ্ধের সূচনা:

সন্ধ্যা নেমে অন্ধকার গাঢ় হলে ব্রিটিশ বাহিনী আর পাহাড়ে ওঠার সাহস পায়নি। তারা পাহাড়ের নিচে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেয় এবং পরিকল্পনা করে যে পরদিন সকালে আলো ফুটলেই তারা চূড়ান্ত আক্রমণ শানাবে। কিন্তু মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী রণনীতিকার।

মাস্টারদা বুঝতে পেরেছিলেন, পরের দিন সকালে ব্রিটিশরা যখন নতুন সৈন্য ও আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তখন এই সীমিত গুলি নিয়ে বাঁচার আর কোনো উপায় থাকবে না। তাই তিনি রাতেই পাহাড় ত্যাগ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। গভীর রাতে শহিদ সাথীদের নিথর মৃতদেহগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে মাস্টারদা এবং বাকি বিপ্লবীরা সামরিক কায়দায় স্যালুট বা অভিবাদন জানান। এরপর বুকভরা কষ্ট ও প্রতিশোধের আগুন নিয়ে বাকি বেঁচে থাকা বিপ্লবীদের অত্যন্ত সন্তর্পণে পাহাড় থেকে নেমে যেতে নির্দেশ দেন মাস্টারদা।

এই জালালাবাদ পাহাড় থেকে নেমেই মাস্টারদা তাঁর দলকে ছোট ছোট উপ-দলে (Sub-teams) বিভক্ত করে দেন। তিনি নির্দেশ দেন যে, এখন থেকে সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং চট্টগ্রামের গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অতর্কিত আক্রমণ বা 'গেরিলা যুদ্ধ' (Guerrilla Warfare) চালাতে হবে। মাস্টারদার এই গেরিলা কৌশলই পরবর্তী প্রায় তিন বছর ধরে প্রবল প্রতাপশালী ব্রিটিশ প্রশাসনের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।


ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ ও প্রীতিলতার আত্মত্যাগ (১৯৩২ সাল):

জালালাবাদ যুদ্ধের পর বিপ্লবীদের গেরিলা আক্রমণে ব্রিটিশরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় অবস্থিত 'ইউরোপীয় ক্লাব' (Pahartali European Club) ছিল ব্রিটিশ অসামরিক এবং সামরিক কর্মকর্তাদের বিনোদন ও বিশ্রামের প্রধান কেন্দ্র। এই ক্লাবের প্রধান ফটকে একটি অত্যন্ত বর্ণবাদী, উদ্ধত এবং অপমানজনক সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকত, যা প্রতিটি ভারতীয়র আত্মসম্মানে তীব্র আঘাত হানত। সেই সাইনবোর্ডে লেখা ছিল-

"Dogs and Indians are not allowed” (অর্থাৎ, কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ)।

এই চরম অপমানজনক বৈষম্যের যোগ্য জবাব দিতে এবং জালালাবাদ যুদ্ধের শহিদ ভাইদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মাস্টারদা সূর্য সেন এই ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

ক্লাব আক্রমণের পেছনে আরেকটি বড় রাজনৈতিক কারণও ছিল। ১৯৩০ সালের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধের পর ব্রিটিশ পুলিশ চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করেছিল। বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে তারা নিরীহ গ্রামবাসীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। অথচ, সারাদিন ভারতীয়দের ওপর অত্যাচার চালিয়ে ব্রিটিশ অফিসাররা শনি-রবিবার পাহাড়তলী ক্লাবে গিয়ে নিশ্চিন্তে হুইস্কি পান করত এবং নাচ‑গানে মেতে উঠত। মাস্টারদা চাইলেন ব্রিটিশদের এই নিরাপদ আশ্রয়ে সরাসরি আঘাত হানতে। তিনি ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিতে চাইলেন যে, ভারতীয়দের ওপর নির্যাতন চালিয়ে তারা নিজেরাও শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না।


প্রীতিলতাকে অধিনায়কের দায়িত্ব প্রদান:

মাস্টারদা প্রথমে বিপ্লবী শৈলেশ্বর চক্রবর্তীকে এই অভিযানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু শৈলেশ্বর দুবার চেষ্টা করেও ক্লাবের কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করতে ব্যর্থ হন এবং গ্লানিবোধ থেকে তিনি আত্মহত্যা করেন।

এরপর মাস্টারদা এক ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তাঁর দলের অন্যতম প্রতিভাবান, নির্ভীক নারী সদস্য, কলকাতার বেথুন কলেজের স্নাতক এবং চট্টগ্রামের নন্দনকানন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে এই রোমাঞ্চকর অভিযানের অধিনায়ক (Commander) হিসেবে নিযুক্ত করলেন।


ধলঘাট ক্যাম্প ও প্রীতিলতার ইস্পাতকঠিন রূপান্তর:

মাস্টারদা সূর্য সেনের 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'-র গোপন এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি আস্তানা ছিল পটিয়ার ধলঘাট ক্যাম্প (সাবিত্রী দেবীর বাড়ি)। এই ধলঘাট ক্যাম্পেই একজন শান্ত স্বভাবের স্কুল শিক্ষিকা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এক দুর্ধর্ষ সশস্ত্র বিপ্লবী রূপে রূপান্তরিত হয়েছিলেন।

পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের মতো গুরুদায়িত্ব কাঁধে দেওয়ার আগে মাস্টারদা চেয়েছিলেন প্রীতিলতার শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে ইস্পাতের মতো মজবুত করে তুলতে। ধলঘাট ক্যাম্পে আত্মগোপন করে থাকার সময় তাঁকে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিপ্লবের রণাঙ্গনে একজন নারীকে পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে হলে যে শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক কাঠিন্য প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে তাঁকে নিম্নলিখিত প্রশিক্ষণগুলো দেওয়া হয়েছিল-

  অস্ত্র ও আত্মরক্ষা: প্রীতিলতা প্রথমে লাঠি চালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং পরে শত্রুকে কাবু করার জন্য নিখুঁতভাবে ছোরা চালানোও আয়ত্ত করেন।

  আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার: সাধারণ অস্ত্রের পাশাপাশি তাঁকে ভারী রিভলভার চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে গুলি করা অত্যন্ত দ্রুত আয়ত্ত করে নেন।

  বিস্ফোরক ও বোমা: সম্মুখ সমরে ব্রিটিশ পুলিশকে পরাস্ত করতে বোমার ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। তাই কীভাবে লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করতে হয়, তার কৌশলও তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রপ্ত করেন।

মাস্টারদা সবকিছু দূর থেকে তীক্ষ্ণ নজরে রাখতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর পর্যবেক্ষক। দলের কোনো সদস্যকে বড় দায়িত্ব দেওয়ার আগে তিনি নিজে তার পরীক্ষা নিতেন। প্রীতিলতার শারীরিক দক্ষতা দেখার পাশাপাশি তিনি তাঁর মানসিক দৃঢ়তা, লক্ষ্য স্থির রাখার ক্ষমতা এবং অস্ত্র ব্যবহারের সাবলীলতা পরীক্ষা করেন। প্রীতিলতার স্থির লক্ষ্য, কম্পনহীন হাত এবং অসাধারণ আত্মবিশ্বাস দেখে মাস্টারদা বুঝতে পারেন যে ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রীতিলতা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মাস্টারদার এই আস্থার প্রতিদান দিতে প্রীতিলতা বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি তাঁর ডায়েরিতে দৃপ্ত কণ্ঠে লিখেছিলেন:

 "মেয়েরা যুদ্ধ করতে পারে না—এই মিথ্যা অপবাদ ঘুচিয়ে ব্রিটিশদের অহংকার ভাঙা দরকার। ভারতের নারীরাও যে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিতে পারে এবং দেশের জন্য হাসিমুখে জীবন দিতে পারে, তা প্রমাণ করার সময় এসেছে।"


ক্লাব আক্রমণের রণকৌশল ও ছদ্মবেশ (২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৩২):

১৯৩২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর। রাত আনুমানিক ১০টা ১৫ মিনিটে বিপ্লবীরা কাট্টলী সমুদ্র সৈকতে মিলিত হন এবং সেখান থেকে পাহাড়তলীর দিকে রওনা দেন। মাস্টারদা নিজে এই অভিযানে সশরীরে যোগ দেননি, তিনি নিরাপদ দূরত্ব থেকে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। প্রীতিলতার অধীনে মাত্র ১০-১২ জন তরুণ বিপ্লবী ছিলেন। এই দলটিকে সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য তিনটি উপ-দলে (Sub-teams) ভাগ করা হয়:

  প্রথম দলটির নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং প্রীতিলতা। তাদের কাজ ছিল মূল ফটক দিয়ে সরাসরি ক্লাবের ভেতরে প্রবেশ করে আক্রমণ শানানো।

  বাকি দুটি দলের কাজ ছিল ক্লাবের পেছনের দরজা ও জানালাগুলো পাহারা দেওয়া, যাতে আক্রমণ শুরু হলে কোনো ব্রিটিশ অফিসার সেখান দিয়ে পালাতে না পারে।

ছদ্মবেশ ধারণ:

কঠোর পাহারায় থাকা ক্লাবে নির্বিঘ্নে ঢোকার জন্য প্রীতিলতা নিজেকে একজন মালবাহী পাঞ্জাবি যুবকের ছদ্মবেশে সাজিয়েছিলেন। তাঁর পরনে ছিল খাকি রঙের ধুতি, ঢিলেঢালা শার্ট, মাথায় টাইট পাগড়ি এবং পায়ে কেডস জুতো। দলের অন্যান্য বিপ্লবীরাও কেউ ধুতি-পাঞ্জাবি, আবার কেউ কোট-প্যান্ট পরে ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন যাতে দূর থেকে তাদের বাঙালি যুবক বলে চেনা না যায়। প্রতিটি বিপ্লবীর হাতে ছিল লোডেড রিভলভার, কিছু শক্তিশালী দেশীয় বোমা এবং আত্মহত্যার জন্য কাপড়ের খুঁটে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাঁধা পটাশিয়াম সায়ানাইডের (Potassium Cyanide) পুরিয়া।

পুরুষের ছদ্মবেশে ধুতি-পাঞ্জাবি আর টুপি পরে প্রীতিলতা, হাতে রিভলভার।

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ ও প্রীতিলতার বীরত্ব:

রাত দশটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ক্লাবের সুবিশাল হলরুমে তখন প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশজন ব্রিটিশ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তা এবং ব্রিটিশ নারী হুইস্কি পানে মত্ত হয়ে নাচ-গানে মেতে উঠেছে। ক্লাবের বাইরে ব্রিটিশ সশস্ত্র প্রহরীরা কড়া পাহারা দিচ্ছে।

১. প্রথম আঘাত: প্রীতিলতার প্রথম সংকেত পাওয়া মাত্রই বিপ্লবী প্রফুল্ল দাস এবং কালীকিংকর দে ক্লাবের বড় কাঁচের জানালা লক্ষ্য করে দুটি শক্তিশালী বোমা ছুঁড়ে মারেন। কান ফাটানো শব্দে বোমা ফেটে যায়, মুহূর্তের মধ্যে ক্লাবের আলো নিভে যায় এবং চারপাশে কাঁচের টুকরো ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।

২. বন্দুকযুদ্ধ ও চার্জ: আলো নিভে গেলে ক্লাবের ভেতরে চরম হুড়োহুড়ি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে অধিনায়ক প্রীতিলতা তাঁর হুইসেল বাজিয়ে চিৎকার করে ওঠেন— "চার্জ!" বিপ্লবীরা জানালা ও দরজা দিয়ে ভেতরের ব্রিটিশদের লক্ষ্য করে অবিরাম গুলি চালাতে শুরু করেন। ব্রিটিশরাও আত্মরক্ষার্থে টেবিল ও সোফা উল্টে তার আড়াল থেকে পাল্টা গুলি চালাতে থাকে। ক্লাবের চত্বর ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে ভরে ওঠে।

৩. ক্ষয়ক্ষতি: বিপ্লবীদের এই আকস্মিক এবং তীব্র হামলায় ক্লাবের ভেতরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মিসেস সুলিভান নামের এক ব্রিটিশ নারী গুলিতে মারা যান। ক্যাপ্টেন চার্লস এবং আরও অন্তত তিনজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা গুরুতরভাবে আহত হন।


প্রীতিলতার অমর আত্মত্যাগ:

প্রায় ১০‑১৫ মিনিট ধরে এই ভয়ংকর তাণ্ডব চালানোর পর, প্রীতিলতা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তাঁর দলকে পিছু হটার আদেশ দেন। কারণ, খুব কাছেই অবস্থিত রেলওয়ে পুলিশ ক্যাম্প থেকে ব্রিটিশ সৈন্যরা বন্দুকের শব্দ শুনে ক্লাবের দিকে দৌড়ে আসছিল।

দলের সমস্ত বিপ্লবী যখন নিরাপদে বেরিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে আসা একটি গুলি প্রীতিলতার বুকের বাঁ-দিকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে। যন্ত্রণায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রীতিলতা বুঝতে পারেন যে তাঁর পক্ষে আর দৌড়ে পালানো সম্ভব নয়। সহযোদ্ধারা তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তিনি তাঁদের কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং আদেশ দেন যে তাঁরা যেন তাঁকে রেখেই দ্রুত জায়গা ত্যাগ করে আত্মগোপন করেন। প্রীতিলতা জানতেন, আহত অবস্থায় ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হবে এবং মাস্টারদার গোপন ডেরার খবর আদায় করা হবে।

বিপ্লবের স্বার্থে এবং মাস্টারদাকে সুরক্ষিত রাখতে প্রীতিলতা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তাঁর পকেটে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইডের পুরিয়াটি মুখে ঢেলে দেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেশের স্বাধীনতার বেদিতে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন এই বীর নারী। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম নারী শহিদ।

পরদিন সকালে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁর মৃতদেহ তল্লাশি করে শার্টের পকেট থেকে একটি চিঠি উদ্ধার করে, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক চিঠিতে লেখা ছিল:

 "নেতা আশা করেন, দেশের বোনেরা আর নিজেদের দুর্বল ভাববেন না। ভারতের নারীরাও সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নিতে পারে, দেশের জন্য হাসিমুখে জীবন দিতে পারে। এই চিরন্তন সত্য প্রমাণ করতেই নেতার নির্দেশে আমি এই অভিযানে নেতৃত্ব দিলাম।"


বিশ্বাসঘাতকতা, গ্রেপ্তার এবং মাস্টারদার জীবনের শেষ দিনগুলো:

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের মতো দুঃসাহসিক ঘটনার পর ব্রিটিশ প্রশাসন চরম প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। পুরো চট্টগ্রামে সামরিক আইন (Martial Law) জারি করা হয়। ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করে, মাস্টারদাকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ধরিয়ে দিতে পারলে দশ হাজার টাকার বিশাল আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হবে।

নেত্র সেনের বিশ্বাসঘাতকতা:

পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে মাস্টারদা দীর্ঘদিন ধরে গৈরালা গ্রামে ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে অত্যন্ত গোপনে লুকিয়ে ছিলেন। কিন্তু ১৯৩৩ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি, নেত্র সেন নামের এক স্থানীয় লোভী ও বিশ্বাসঘাতক মানুষ পুরস্কারের দশ হাজার টাকার লোভে ব্রিটিশ পুলিশের কাছে মাস্টারদার গোপন আস্তানার খবর ফাঁস করে দেয়।

খবর পাওয়া মাত্রই ক্যাপ্টেন গায় (Captain Gair)-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ গোর্খা বাহিনী বাড়িটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। এক সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র বন্দুকযুদ্ধের পর ব্রিটিশ বাহিনী মাস্টারদা সূর্য সেন এবং তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের হাতে হাতকড়া পরাতে সক্ষম হয়। (উল্লেখ্য, বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেন সেই পুরস্কারের টাকা ভোগ করতে পারেনি; কিছুদিন পরই বিপ্লবীরা নেত্র সেনকে তার নিজের বাড়িতেই কুপিয়ে খতম করে মাস্টারদাকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিশোধ নিয়েছিল)।


কনডেমড সেলের পৈশাচিক নির্যাতন:

গ্রেপ্তারের পর চট্টগ্রাম জেলের কনডেমড সেলে (নির্দয় নির্যাতন কক্ষ) মাস্টারদা সূর্য সেনের ওপর যে অমানুষিক ও পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা সভ্য মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক ও শিউরে ওঠা অধ্যায়। ব্রিটিশ পুলিশ ও গোয়েন্দারা মাস্টারদার কাছ থেকে দলের গোপন খবর আদায় করার জন্য পাশবিকতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাঁর শরীরের প্রায় প্রতিটি হাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সাঁড়াশি দিয়ে তাঁর হাতের নখগুলো একটি একটি করে উপড়ে ফেলা হয়। এমনকি ব্রিটিশ প্রহরীরা বুট জুতো দিয়ে লাথি মেরে তাঁর মুখের সমস্ত দাঁত ভেঙে ফেলেছিল। অকথ্য যন্ত্রণায় মাস্টারদা দিনের পর দিন কনডেমড সেলে রক্তাপ্লুত ও অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতেন, কিন্তু তাঁর মুখ থেকে ব্রিটিশরা একটি শব্দও বের করতে পারেনি।

মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দৃশ্য

শেষ চিঠি ও অন্তিম মহাপ্রয়াণ:

ফাঁসির ঠিক আগের দিন, ১৯৩৪ সালের ১১ই জানুয়ারি, যন্ত্রণায় কাতর মাস্টারদা তাঁর সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত আবেগঘন শেষ চিঠি লিখেছিলেন:

 "আমার শেষ বাণী—আদর্শকে ভুলে যেও না। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই সোনালী দিনটি যেন চিরস্মরণীয় থাকে। আমার স্বপ্ন—স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন! বিদায় বন্ধুরা, বিদায়..."

১২ই জানুয়ারি, ১৯৩৪ সালের মধ্যরাত। অকথ্য ও পৈশাচিক নির্যাতনের ফলে মাস্টারদার শরীরের প্রায় প্রতিটি হাড় ভেঙে দেওয়ায় তিনি হাঁটার বা দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাই ফাঁসির রাতে সেই অর্ধমৃত, সংজ্ঞাহীন মানুষটিকে একটি চাদরে মুড়িয়ে কার্যত চ্যাংদোলা করে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

ফাঁসির পর ব্রিটিশরা এতটাই আতঙ্কিত ছিল যে, তাঁর মৃতদেহ আত্মীয়দের বা দেশবাসীর হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। ব্রিটিশ প্রশাসনের ভয় ছিল, মাস্টারদার সমাধি থাকলে তা লক্ষ লক্ষ বিপ্লবীর তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হবে এবং সেখান থেকে নতুন বিদ্রোহের জন্ম নেবে। তাই ফাঁসির পর মাঝরাতেই একটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজে করে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহটিকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভারি পাথর বেঁধে বঙ্গোপসাগরের অথৈ জলে চিরতরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। একই সাথে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি তারকেশ্বর দস্তিদারেরও।


ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব:

চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, জালালাবাদ পাহাড়ের রক্তস্নাত যুদ্ধ এবং প্রীতিলতার বীরত্ব—এই ঘটনাগুলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় সম্পূর্ণভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রভাবটি পড়েছিল সশস্ত্র বিপ্লবে নারীদের ভূমিকায়। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আগে সশস্ত্র বিপ্লবী দলগুলোতে নারীদের মূল কাজ ছিল আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া, অস্ত্র ও অর্থ লুকিয়ে রাখা অথবা গোপনে খবর আদান-প্রদান করা। কিন্তু প্রীতিলতা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, নারীরা কেবল নেপথ্যে থাকার জন্য নয়, প্রয়োজনে তাঁরা সরাসরি রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং সম্মুখ সমরে অংশ নিয়ে শ্বেতাঙ্গদের রক্ত ঝরাতে পারেন।


উপসংহার:

এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকারের নীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তারা বুঝতে পারে যে, কেবল বাংলার যুবকরা নয়, বাংলার মেয়েরাও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য সমান বিপজ্জনক। প্রীতিলতার এই অসীম আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার পরে কল্পনা দত্ত, প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্মা, সুনীতি চৌধুরী, শান্তি ঘোষ এবং বীণা দাসের মতো শত শত কিশোরী ও তরুণী সরাসরি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

মাস্টারদা সূর্য সেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ অজেয় নয়। ইউরোপীয় ক্লাবের সেই কুখ্যাত সাইনবোর্ডের অহংকার বিপ্লবীরা নিজেদের রক্তের অক্ষরে চিরতরে মুছে দিয়েছিলেন। বঙ্গোপসাগরের বুকে মাস্টারদার নশ্বর দেহ হারিয়ে গেলেও, তাঁর প্রজ্জ্বলিত করা স্বাধীনতার সেই মশাল পরবর্তী প্রজন্মের হাজারো বিপ্লবীর পথপ্রদর্শক হয়ে চিরকাল জ্বলজ্বল করে জ্বলবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ