সূচনা:
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সাহিত্যিক উপাদানের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলির ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যিক উপাদানে অনেক সময় কাল্পনিক কাহিনী, অতিরঞ্জন বা স্তুতিবাক্যের আধিক্য থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে প্রক্ষিপ্ত অংশ যুক্ত হয়ে মূল লেখা বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলির ক্ষেত্রে এই বিকৃতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলির মধ্যে তর্কাতীতভাবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণ্য উপাদান হলো লিপি বা লেখমালা (Inscriptions)। লিপি উৎকীর্ণ করার বিদ্যা বা লিপি অধ্যয়নের বিজ্ঞানসম্মত শাখাকে বলা হয় 'এপিগ্রাফি' (Epigraphy) এবং প্রাচীন লিপির উদ্ভব ও বিবর্তনের অধ্যয়নকে বলা হয় 'প্যালিওগ্রাফি' (Palaeography)।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও অধ্যাপক র্যাপসন (E. J. Rapson)-এর মতে, "প্রাচীন লিপি একটি দেশ ও যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থার বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করে।" প্রাচীনকালে সাধারণভাবে পাথর, শিলাস্তম্ভ, লোহা, রুপা ও সোনার পাত, তাম্রফলক (তাম্রশাসন) এবং দেব-দেবীর মূর্তির গায়ে লিপি খোদাই করা হতো। মাটির উপরিভাগে বিশেষ করে পর্বতগাত্রেই যে শুধু শিলালেখ পাওয়া যায় তা নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে মাটির তলা থেকেও অসংখ্য অমূল্য শিলালেখ আবিষ্কৃত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রায় সমস্ত শিলালেখ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জাদুঘরে সযত্নে সংরক্ষিত আছে, যা ঐতিহাসিকদের কাছে অতীত ভারতের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
লিপির শ্রেণিবিভাগ
ইতিহাস রচনার সুবিধার্থে প্রাচীন ভারতের প্রাপ্ত লিপিগুলিকে বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. বাণিজ্যিক লিপি: সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত বিভিন্ন সিলমোহর।
২. ধর্মীয় ও নির্দেশমূলক লিপি: সম্রাট অশোকের ধর্মলিপি।
৩. প্রশস্তিমূলক লিপি: রাজাদের স্তুতি করে লেখা (যেমন- এলাহাবাদ প্রশস্তি)।
৪. দানপত্র বা তাম্রশাসন: জমি দান সংক্রান্ত লিপি।
৫. প্রশাসনিক লিপি: শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত নির্দেশিকা।
ইতিহাস নির্মাণে লিপির বহুমুখী গুরুত্ব (Importance of Inscriptions)
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনে লিপির অবদানগুলিকে নিম্নলিখিত বিস্তারিত পয়েন্টগুলির সাহায্যে আলোচনা করা যায়:
১) রাজনৈতিক ঘটনা ও সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি নির্ধারণ
লিপি থেকে বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা, রাজাদের যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজ্যসীমা বিস্তার, রাজার নাম, পরিচয়, তাঁর শাসনকাল এবং বংশলতিকা সহ বিভিন্ন কীর্তিকাহিনীর নিখুঁত বিবরণ জানা যায়।
ঐতিহাসিক উদাহরণ:
এলাহাবাদ প্রশস্তি: গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণ রচিত "এলাহাবাদ প্রশস্তি” থেকে গুপ্ত যুগের ও তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক চিত্র সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। সমুদ্রগুপ্তের 'আর্যাবর্ত' (উত্তর ভারত) এবং 'দাক্ষিণাপথ' (দক্ষিণ ভারত) বিজয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এতে রয়েছে। মধ্যভারত ও রাজস্থানের বিস্তীর্ণ এলাকায় যে তখন প্রজাতান্ত্রিক উপজাতির শাসন বলবৎ ছিল এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যবাদের আঘাতে তা কীভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, তা এই প্রশস্তি থেকেই আমরা জানতে পারি।
আইহোল প্রশস্তি: আনুমানিক ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর সভাকবি রবিকীর্তির রচিত 'আইহোল প্রশস্তি'-তে দ্বিতীয় পুলকেশী কর্তৃক উত্তর ভারতের সমকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী শাসক হর্ষবর্ধনের নর্মদা নদীর তীরে পরাজয়ের কথা সযত্নে তুলে ধরা হয়েছে।
গোয়ালিয়র ও দেওপাড়া প্রশস্তি: গুর্জর-প্রতিহার বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা মিহির ভোজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শৌর্যবীর্যের কথা চিত্রিত হয়েছে 'গোয়ালিয়র প্রশস্তি'-তে। অন্যদিকে, বাংলার সেন বংশের রাজা বিজয় সেনের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের কথা বিস্তারিত জানা যায় 'দেওপাড়া প্রশস্তি' থেকে।
খালিমপুর তাম্রশাসন: পাল শাসক ধর্মপালের 'খালিমপুর তাম্রশাসনে' পাল বংশ শুরুর প্রাক্কালে বাংলায় যে চরম অরাজকতা তথা 'মাৎস্যন্যায়'-এর সৃষ্টি হয়েছিল এবং গোপাল কীভাবে সেই অরাজকতার অবসান ঘটিয়েছিলেন তার সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে।
২) শাসননীতি ও প্রজা কল্যাণমূলক কাজের পরিচয়
লিপিতে উৎকীর্ণ তথ্য থেকে রাজার শাসননীতি, শাসনতান্ত্রিক সংস্কার এবং বিভিন্ন প্রজাকল্যাণমূলক কাজের অকাট্য বিবরণ পাওয়া যায়।
উদাহরণ:
১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে "এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল”-এর তদানীন্তন সম্পাদক জেমস প্রিন্সেপ (James Prinsep) কর্তৃক সম্রাট অশোকের লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়। এর পরেই বিশ্ববাসী অশোকের ধর্মমত, তাঁর অহিংস নীতি ও জনহিতকর কার্যকলাপের (যেমন- মানুষ ও পশুদের জন্য হাসপাতাল নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, কূপ খনন) বিবরণ সম্পর্কে জানতে পারে।
শক-ক্ষত্রপ রাজা রুদ্রদামনের 'জুনাগড় শিলালিপি' থেকে জানা যায় যে, তিনি প্রজাদের কল্যাণের জন্য বহু অর্থ ব্যয় করে মৌর্য আমলে তৈরি হওয়া 'সুদর্শন হ্রদ'-এর বাঁধ সংস্কার করেছিলেন। এটি প্রাচীন ভারতের জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের এক অনবদ্য প্রমাণ।
৩) বৈদেশিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
বিদেশে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক লিপিগুলি থেকে প্রাচীন ভারতের সঙ্গে বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা জানা যায়।
উদাহরণ:
বোঘাজ কয় লিপি: এশিয়া মাইনরের (বর্তমান তুরস্ক) 'বোঘাজ কয়' (Boghazkoi) নামক স্থানে ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি লেখ পাওয়া যায়, যেখানে মিতান্নি ও হিটাইট রাজাদের চুক্তিতে বৈদিক আর্যদের বিভিন্ন দেবতা (যথা- ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও নাসত্য)-র উল্লেখ আছে। ভারতবর্ষের বাইরে আর্যদের গতিবিধি এবং প্রাচীনত্বের এটি একটি বিরাট প্রমাণ।
পারস্যের লিপি: ইরানে সম্রাট দারায়ুসের "পারসিপোলিস” (Persepolis) ও "নাকস-ই-রুস্তম” (Naqsh-i-Rustam) লেখ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রাচীন ইরানের সঙ্গে ভারতবর্ষের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। 'বেহিস্তান' লেখ থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, উত্তর পাঞ্জাব ও গন্ধার প্রদেশ পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বৃহত্তর ভারত: চম্পা (ভিয়েতনাম), যবদ্বীপ (জাভা), কম্বোডিয়া প্রভৃতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অঞ্চলে প্রাপ্ত অসংখ্য সংস্কৃত লেখ থেকে জানা যায় যে, ওই অঞ্চলগুলির সঙ্গে ভারতের গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। হিন্দু সংস্কৃতি কীভাবে সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল, তা এই লিপিগুলিই প্রমাণ করে।
৪) তৎকালীন অর্থনীতির সম্যক ধারণা
লিপিগুলি সমকালীন বিভিন্ন রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো, ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা এবং কর ব্যবস্থার সম্যক ধারণা দেয়। প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের পুনর্গঠনে তাম্রশাসনগুলির কোনো বিকল্প নেই।
উদাহরণ:
সাতবাহন ও গুপ্ত যুগের তাম্রফলকগুলিতে জমি বিক্রি বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে জমি দান (অগ্রহার বা ব্রহ্মদেয় প্রথা) সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ থাকত। এই ভূমিদানের উদ্দেশ্য, ভূমি রাজস্বের পরিমাণ এবং ভূমি সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই ফলকগুলি সরবরাহ করে। ঐতিহাসিকদের মতে, এই জমি দান প্রথার মাধ্যমেই প্রাচীন ভারতে এক ধরণের সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির (Feudalism) উদ্ভব ঘটেছিল।
গুপ্ত আমলে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত, বিশেষত "পুন্ড্রবর্ধনভুক্তি” বা উত্তরবঙ্গ এলাকায় (যেমন- বৈগ্রাম, পাহাড়পুর) প্রাপ্ত তাম্রশাসনগুলি থেকে বিভিন্ন ধরনের জমির শ্রেণিবিভাগ এবং জমি মাপার পদ্ধতির (যেমন- কুল্যবাপ, দ্রোণবাপ) কথা জানা যায়। এছাড়া মুদ্রার একক হিসেবে 'দীনার' বা 'রূপক'-এর উল্লেখও পাওয়া যায়।
মান্দাসোর লিপি থেকে রেশম তাঁতিদের (Silk weavers) একটি গিল্ডের কথা জানা যায়, যা থেকে তৎকালীন শিল্পের গতিপ্রকৃতি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা স্পষ্ট হয়।
৫) ধর্মবিশ্বাসের পরিচয় ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ
দেব-দেবীর মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ লিপি বা রাজকীয় লেখমালাগুলি সমকালীন ধর্মবিশ্বাসের এবং রাজাদের ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়।
উদাহরণ:
সম্রাট অশোকের বিভিন্ন শিলালিপি ও স্তম্ভলিপিগুলি থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার, তাঁর 'ধম্ম'-এর আদর্শ এবং প্রাণীহত্যার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
মালদহ জেলার জগজ্জীবনপুর মৌজায় ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে স্থানীয় বাসিন্দা জগদীশচন্দ্র গাইনের কোদালের ডগায় আকস্মিকভাবে একটি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়। এটি থেকে জানা যায় যে, বাংলার পাল শাসকেরা আন্তরিকভাবে বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বা বিহারের উদ্দেশ্যে রাজা মহেন্দ্রপালদেব যে বিপুল পরিমাণ জমি দান করেছিলেন, তা এই তাম্রশাসনে সযত্নে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশের 'বেসনগর গরুর স্তম্ভলিপি' (Besnagar Pillar Inscription) থেকে জানা যায় যে, গ্রিক রাজদূত 'হেলিওডোরাস' প্রাচীন ভারতে এসে হিন্দু ভাগবত (বৈষ্ণব) ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং বাসুদেবের উদ্দেশ্যে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। এটি প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় আত্তীকরণের এক চূড়ান্ত নিদর্শন।
৬) ভাষা চর্চা ও বিবর্তনের ধারণা
লিপিগুলিতে ব্যবহৃত ভাষা থেকে সেকালে প্রচলিত ভাষা, ব্যাকরণ এবং তার বিবর্তন সম্পর্কে নিখুঁত ধারণা পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতের ভাষার ইতিহাস লিপির মাধ্যমেই পর্যায়ক্রমিকভাবে সাজানো সম্ভব।
উদাহরণ:
হরপ্পা বা সিন্ধু সভ্যতার লেখামালাগুলির আজও পাঠোদ্ধার সম্ভব না হওয়ায় তার ভাষা ও লিপি সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত মৌর্য সম্রাট অশোকের লেখমালার প্রধান ভাষা ছিল 'প্রাকৃত' এবং স্থানীয় মানুষের বোধগম্য ভাষা।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে শক রাজা রুদ্রদামনের জুনাগড় লিপিতেই সর্বপ্রথম বিশুদ্ধ ও দীর্ঘ 'সংস্কৃত' ভাষার ব্যবহার দেখা যায়।
গুপ্ত যুগে (খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে) সরকারি কাজে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং প্রাকৃত ভাষার প্রচলন ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে প্রাক্-মধ্যযুগের শিলালিপি রচনার কাজে সংস্কৃতের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা (যেমন- তামিল, তেলেগু, কন্নড়) ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এর ফলে আঞ্চলিক ভাষাগুলির সাহিত্যিক বিকাশ ঘটে। ভারতে মুসলিম আক্রমণের পর প্রাক্-মধ্যযুগের কিছু লেখমালায় প্রথম আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রচলনও লক্ষ্য করা যায়।
৭) লিপিতত্ত্ব বা বর্ণমালার বিবর্তনের প্রমাণ (Palaeography)
লেখগুলির লিপি বা বর্ণমালা থেকে লিপির বিবর্তন বা কলা (Calligraphy) সম্পর্কে জানা যায়।
উদাহরণ:
প্রাচীন ভারতীয় ভাষায় রচিত লেখাগুলি প্রধানত ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী, এবং ব্রাহ্মী থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন আঞ্চলিক লিপিতে লেখা। সম্রাট অশোকের লিপিগুলি উত্তর-পশ্চিম ভারতের কয়েকটি এলাকা ছাড়া প্রধানত 'ব্রাহ্মী' লিপিতেই লেখা হয়েছিল।
স্থানীয় আদিবাসীদের সুবিধার জন্য উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে 'খরোষ্ঠী' লিপি ব্যবহৃত হয়েছিল। আবার আফগানিস্তানে অশোকের সময় উৎকীর্ণ শিলালিপিগুলি গ্রিক ও আরামাইক বর্ণমালায় রচিত হয়েছিল, যা দ্বিভাষিক (Bilingual) লিপির চমৎকার উদাহরণ।
উল্লেখ্য যে, ব্রাহ্মী লিপি লেখা হতো বাঁ দিক থেকে ডান দিকে, আর খরোষ্ঠী লিপি লেখা হতো ডান দিক থেকে বাঁ দিকে (আরবি ভাষার মতো)। এছাড়া কিছু লেখায় 'শঙ্খ লিপি'-র (Shell script) ব্যবহার দেখা যায়, যা অনেক সময় ডান থেকে বাম দিকে লেখা হতো। সময়ের সাথে সাথে ব্রাহ্মী লিপি থেকেই গুপ্ত লিপি, কুটিলা লিপি এবং আধুনিক ভারতীয় লিপিগুলির (যেমন- বাংলা, দেবনাগরী) উদ্ভব ঘটেছে।
৮) ব্যবসা-বাণিজ্য ও গিল্ড ব্যবস্থার পরিচয়
লিপিগুলি থেকে রাজাদের অন্তর্লিপি ও বহির্বাণিজ্যের পরিচয় মেলে। বাণিজ্যিক সূত্রে কোনো অঞ্চলের ওপর অন্যান্য অঞ্চলের রাজার বা গিল্ডের আধিপত্যের ধারণা পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতে বণিক ও কারিগরদের নিজস্ব সংগঠন ছিল, যাকে 'শ্রেণি' (Guild) বলা হতো। এই গিল্ডগুলি ব্যাংকের মতো কাজ করত। বিভিন্ন গুহালিপি (যেমন- নাসিকের গুহালিপি) থেকে জানা যায় যে, গিল্ডগুলিতে মানুষ অর্থ জমা রাখত এবং সেই অর্থের সুদ থেকে মন্দিরে সারাবছর প্রদীপ জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হতো। এগুলি তৎকালীন উন্নত বাণিজ্যিক পরিস্থিতির সুস্পষ্ট প্রমাণ।
৯) রাজবংশের ধারাবাহিকতা ও কালানুক্রমিক সম্পর্ক স্থাপন
প্রাচীন ভারতের সাহিত্যের একটি বড় ত্রুটি হলো এতে সন-তারিখের বা কালানুক্রমিকতার (Chronology) অভাব। কিন্তু লিপিগুলি নির্দিষ্ট সাল বা অব্দ (যেমন- শকাব্দ, বিক্রমাব্দ, গুপ্তাব্দ) ব্যবহার করে লেখা হতো বলে অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের সঙ্গে ধারাবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে শিলালিপি বিপুল সাহায্য করে।
উদাহরণ:
১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রদেশের রিস্থালে প্রাপ্ত লেখ (৫১২ খ্রিস্টাব্দ) থেকে পরিষ্কারভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, মালবরাজ যশোধর্মণের আগের শাসক ছিলেন প্রকাশধর্মন। শুধু তাই নয়, আউলিকর বংশের প্রকাশধর্মণের পূর্বপুরুষদের একটা সম্পূর্ণ বংশলতিকাও এতে পাওয়া গেছে।
মালদহের জগজ্জীবনপুর মৌজায় আবিষ্কৃত তাম্রশাসনটি বাংলার পাল বংশের ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের দুটি বড় ভুল ধারণা ভেঙে দেয়। এতদিন পর্যন্ত ঐতিহাসিকরা জানতেন যে, বাংলার পাল শাসক দেবপালের পর প্রথম বিগ্রহপাল বা শূরপাল সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু এই তাম্রশাসন থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, দেবপালের পরে সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর পুত্র মহেন্দ্রপালদেব। একটিমাত্র লিপি কীভাবে ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নতুন করে লিখতে বাধ্য করে, এটি তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
১০) সাহিত্যের নিদর্শন ও কাব্যের পরিচয়
এমন অনেক অমূল্য লেখ বা শিলালিপি আছে যেগুলি ইতিহাস বর্ণনার পাশাপাশি উচ্চশ্রেণির সাহিত্যের পর্যায়ে পড়ে। প্রাচীনকালের কবিরা তাঁদের কবিত্বশক্তির স্ফুরণ ঘটিয়েছিলেন এই প্রস্তরখণ্ডগুলিতেই।
উদাহরণ:
হরিষেণ রচিত এলাহাবাদ প্রশস্তি এবং রবিকীর্তির আইহোল প্রশস্তি হলো সংস্কৃত 'কাব্য' শৈলীর (গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে চম্পূ কাব্য) অনবদ্য নিদর্শন।
তামিলনাড়ুর কুডুমিয়ামালাইয়ে প্রাপ্ত পাথরের লেখতে প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীতের স্বরলিপি খোদিত রয়েছে।
রাজস্থানের উদয়পুরে প্রাপ্ত শিলালেখটি বহু সর্গে বিভক্ত একটি সুবিশাল রাজপ্রশস্তি কাব্য।
আজমীরে চৌহান রাজাদের আমলে পাথরের বুকে আস্ত দুটি সংস্কৃত নাটক— "ললিত বিগ্রহরাজ” ও "হরিকেল নাটক” সম্পূর্ণ উৎকীর্ণ অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিস্ময়।
লেখমালা বা শিলালিপির সীমাবদ্ধতা:
ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে লিপির অসীম গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েও বস্তুনিষ্ঠভাবে বলা যায় যে, ইতিহাস চর্চায় লিপির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি রয়েছে:
১) পাঠোদ্ধারের সমস্যা: সময়ের করাল গ্রাসে অনেক লিপির অক্ষর অস্পষ্ট হয়ে গেছে। দুর্বোধ্য অক্ষরে খোদাই করা লিপিতে অনেক সময় সন, তারিখের স্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। যেমন, সিন্ধু সভ্যতার লিপির আজও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকায় পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।
২) অতিশয়োক্তি ও পক্ষপাতিত্ব: প্রশস্তি বা স্তুতিমূলক লিপিগুলি যেহেতু সমকালীন রাজাদের নির্দেশ মেনে বা রাজার অনুগ্রহভাজন সভাকবিদের দ্বারা রচিত, তাই সেগুলিতে রাজাদের দোষত্রুটি সম্পূর্ণ গোপন করে কেবল প্রশংসা করা হয়েছে। এগুলিতে অতিশয়োক্তি, কাল্পনিক গুণ আরোপ এবং শত্রুর প্রতি চরম বিদ্বেষ প্রদর্শনের প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তাই এই লিপিগুলির তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঐতিহাসিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
৩) নিম্নশ্রেণির মানুষের ইতিহাসের অভাব: শিলালিপি বা তাম্রশাসনগুলি মূলত রাজপরিবার, অভিজাত শ্রেণি, বড় বণিক বা ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতায় লিখিত। ফলে সমাজে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদাবান গোষ্ঠীর মানুষ— যেমন কৃষক, সাধারণ শ্রমিক বা প্রান্তিক মানুষদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে লিপি সম্পূর্ণ নীরব থাকে। লিপির ইতিহাস হলো মূলত রাজাদের ইতিহাস, সাধারণ মানুষের নয়।
৪) প্রাকৃতিক বিপর্যয় জনিত সমস্যা: কয়েক হাজার বছর পূর্বে উন্মুক্ত স্থানে (পাহাড়ের গায়ে বা পাথরে) উৎকীর্ণ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে রৌদ্র, ঝড়, বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনে বহু লিপি অবলুপ্ত বা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৫) অসম্পূর্ণতা ও বিভ্রান্তি: অনেক সময় লিপিগুলির বর্ণনায় অসম্পূর্ণতা, অসামঞ্জস্য ও বিভ্রান্তি ধরা পড়ে। একই যুদ্ধে জয়লাভের দাবি করে দুই বিরোধী রাজা নিজ নিজ রাজ্যে প্রশস্তিমূলক শিলালিপি স্থাপন করেছেন, এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়, যা ঐতিহাসিকদের চরম বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, প্রশস্তিমূলক লিপিতে কিছু মাত্রায় অতিরঞ্জন বা পক্ষপাতিত্ব থাকলেও, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে লিপি বা লেখমালার কোনো বিকল্প নেই। সাহিত্যিক উপাদানগুলি যেখানে রূপকথা বা কল্পনার আশ্রয় নেয়, সেখানে মাটির নিচ থেকে উঠে আসা শিলালিপি বা তাম্রশাসন অকাট্য প্রমাণের সাহায্যে সেই কল্পনার জাল ছিন্ন করে কঠোর সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলির মধ্যে লিপির এই নিরঙ্কুশ শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে বলা যেতে পারে, লিপি হলো ইতিহাসের জীবন্ত ও প্রামাণ্য দলিল। লিপিবিহীন প্রাচীন ভারতের ইতিহাস হলো অন্ধকারে পথ হাতড়ে ঘোরার মতো। তাই প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ডক্টর ভিনসেন্ট আর্থার স্মিথ (V.A. Smith) যথার্থই মন্তব্য করেছেন— "প্রশ্নাতীতভাবেই লিপি হলো ভারত ইতিহাসের সর্বাধিক পর্যাপ্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎস।"





0 মন্তব্যসমূহ