প্রত্নতত্ত্ব:-
প্রত্ন অর্থ পুরাতন এবং তত্ত্ব- অর্থ বিজ্ঞান। সমষ্টিগত অর্থ হল পুরাতন বিষয়ক জ্ঞান। বিজ্ঞান শাখা যেটা অতীতের মানুষের বস্তু, ধ্বংসাবশেষ খুঁজে, গর্তে খনন করে, বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে পুরোনো ইতিহাস পুনরুদ্ধার করে, সেটাই প্রত্নতত্ত্ব (Archaeology)।
১. নিরপেক্ষতা: প্রাচীন লেখকরা রাজদরবারের অনুগ্রহ পেতে বা ধর্মীয় মতের কারণে ইতিহাস বাড়িয়ে লিখতেন। মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা বস্তু বা পাথরে খোদাই করা লেখাগুলি পক্ষপাতহীন।
২. পরিবর্তনহীনতা: লিখিত পুঁথি বা বই নকল করলে তথ্য বদলে যেতে পারে। শিলালিপি বা মুদ্রা একবার খোদাই হলে শতবর্ষ পরেও একই থাকে।
সুদূর অতীত থেকে প্রায় আধুনিক যুগ (১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ বা তার কিছুকাল আগে পর্যন্ত) এর গোড়া পর্যন্ত প্রত্নবস্তুর ব্যাপ্তি। একশো বছরের চেয়ে পুরনো যে কোন বস্তু বা স্থাপত্য কে প্রচলিত সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রত্নতত্ত্বের মর্যাদা দেওয়া হয়। অনুসন্ধান ও খননকার্যের ফলে আবিষ্কৃত এবং মাটির তলা থেকে প্রাপ্ত বস্তু, এমনকি এখনো ব্যবহৃত হয় এমন স্থাপত্যরাজি প্রত্নতত্ত্বের আওতাভুক্ত।
এখানে উল্লেখ্য যে, ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠা ঘটে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জনের আমলে। এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন স্যার জন মার্শাল।
প্রত্নস্থল:-
কোনো এক জায়গায় একসঙ্গে অনেক প্রত্নবস্তুর সন্ধান পাওয়া গেলে সেই স্থানকে প্রত্নস্থল বলে। ওই ধরনের প্রত্নস্থল থেকে আবিষ্কৃত প্রত্বস্তু বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের এবং সাধারণভাবে সেই বিশেষ যুগের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান:-
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস লিখতে, প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলো চারটি প্রধান অংশে ভাগ করা হয়:
১. শিলালিপি ও তাম্রশাসন (Inscriptions & Epigraphy)
লিপি গবেষণাকে বিজ্ঞানিকভাবে 'এপিগ্রাফি' (Epigraphy) বলা হয়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস লেখায় লিপি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। লিপি উপাদান এবং খোদাই স্থানের ভিত্তিতে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
রাজকীয় অনুশাসন (Royal Edicts): রাজারা প্রজাদের কাছে আদেশ বা ধর্মীয় বার্তা দিতে রাজকীয় অনুশাসন তৈরি করতেন। সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হল সম্রাট অশোকের শিলালিপি। ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে পাথরের স্তম্ভ ও পাহাড়ে ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী, গ্রীক ও আরামাইক লিপিতে শিলালিপি খোদাই করা আছে। শিলালিপি থেকে মৌর্য সাম্রাজ্যের বিশালতা এবং অশোকের জনকল্যাণকামী রূপ স্পষ্ট হয়।
প্রশস্তি বা গুণগান (Eulogies): রাজাদের দরবারের কবিরা যখন রাজার বিজয় গল্প পাথরে লিখতেন, তাকে প্রশস্তি বলে। যেমন সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি (হরিষেণ রচিত), দ্বিতীয় পুলকেশীর আইহোল প্রশস্তি (রবিকীর্তি রচিত) এবং গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর নাসিক প্রশস্তি। এলাহাবাদ প্রশস্তি, আইহোল প্রশস্তি, নাসিক প্রশস্তি থেকে আমরা রাজাদের জয়, গুণ এবং সময়ের মানচিত্রের সঠিক বর্ণনা পাই।
তাম্রশাসন (Copper Plate Grants): তামার পাতের ওপর খোদাই করা রাজকীয় দলিল। প্রাচীন ভারতে রাজা যখন ব্রাহ্মণ বা মন্দিরকে করমুক্ত জমি দান করতেন, তখন তাম্রশাসন দিলেন। তাম্রশাসন তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজস্ব (Tax) ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্য রেকর্ড।
২. মুদ্রা তত্ত্ব (Numismatics)
মুদ্রা হল প্রাচীন অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির চমৎকার আয়না। মুদ্রা নিয়ে পড়া-শোনা 'নিউমিসম্যাটিক্স' (Numismatics) নামে পরিচিত।
আদি যুগের মুদ্রা (Punch-marked Coins): ভারতে মানুষ প্রথম রুপা ও তামা দিয়ে আহত মুদ্রা তৈরি করে। মুদ্রায় রাজার নাম না, শুধু পাহাড়, গাছ, মাছ, পশুর চিহ্ন থাকে। এই মুদ্রা ভারতের পুরনো বাণিজ্যিক বিকাশ দেখায়।
ইন্দো-গ্রীক ও কুশান মুদ্রা: কুশান রাজারা ভারতে প্রথম স্বর্ণমুদ্রা ব্যবহার করতেন। কুশান রাজারা বানানো মুদ্রায় এক পাশে গ্রীক হরফে রাজার নাম, আর অন্য পাশে শিব, কার্তিক, বুদ্ধের মতো ভারতীয় দেবদেবীর মূর্তি ছিল। কুশান রাজারা বানানো মুদ্রা সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখায়।
অর্থনীতির পরিমাপক: মুদ্রার ধাতু পরীক্ষা করলে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা স্পষ্ট হয়। গুপ্ত যুগের শুরুর মুদ্রায় সোনার পরিমাণ বেশি, তাই সমৃদ্ধি দেখা যায়। পরের গুপ্ত যুগে মুদ্রায় ভেজাল ধাতু বৃদ্ধি পায়, তাই অর্থনৈতিক পতন প্রকাশ পায়।
৩. স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা (Monuments & Fine Arts)
মাটির উপরে বা নিচে প্রাচীন সভ্যতার ঘরবাড়ি, ধর্মীয় স্থান এবং শিল্পকলা থাকে। প্রাচীন সভ্যতার ঘরবাড়ি, ধর্মীয় স্থান এবং শিল্পকলা মানুষের জীবনযাত্রার শিল্প ও প্রযুক্তি স্তর দেখায়।
নগর পরিকল্পনা: ১৯২২ সালে সিন্ধু নদের তীরে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়ো পাওয়া গিয়েছে। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর মাটির নিচে থাকা নগর সভ্যতার পোড়া ইটের ঘর, ভূগর্ভস্থ নর্দমা, পাবলিক স্নানাগার (Great Bath) এবং শস্যাগার দেখায় যে সাড়ে চার হাজার বছর আগে ভারতীয়রা নগর পরিকল্পনায় পারদর্শী ছিল।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন: সাঁচী ও সারনাথের বৌদ্ধ স্তূপ নকশা, ওড়িশার উদয়গিরি-খন্দগিরির গুহা গঠন, এবং দক্ষিণ ভারতের মহাবলীপুরমের রথ মন্দির ও তাঞ্জাভুরের বৃহদেশ্বর মন্দির স্থাপত্য পরিবর্তন ধর্ম ও সংস্কৃতির বিকাশকে প্রকাশ করে। গান্ধার শিল্পরীতি গ্রীক ও ভারতীয় শৈলীর মিশ্রণ, মথুরা শিল্পরীতি ভাস্কর্য ধর্মীয় চেতনা এবং মানুষের শারীরিক সৌন্দর্যের ধারণা প্রকাশ করে।
চিত্রকলা: অজন্তা ও ইলোরা গুহার দেয়ালে আঁকা ফ্রেস্কো এবং দেওয়ালচিত্রগুলো প্রাচীন ভারতের চিত্রকলা ও রঙ তৈরির পদ্ধতি দেখায়। ফ্রেস্কো এবং দেওয়ালচিত্রগুলো বৌদ্ধ জনগণের গল্প এবং তৎকালীন রাজপরিবারের জীবন দেখায়।
৪. খননকার্য থেকে প্রাপ্ত অন্যান্য বস্তুগত অবশেষ (Material Remains)
প্রাগৈতিহাসিক যুগের (যার কোনো লিখিত রেকর্ড নেই, যেমন পাথর ও ব্রোঞ্জ যুগ) ইতিহাস পুরোপুরি বস্তুগত অবশেষের ওপর নির্ভর করে।
মৃৎপাত্র (Pottery): মাটির পাত্রকে "ইতিহাসের বর্ণমালা" বলা হয়। গড়ন আর রঙ দেখে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সভ্যতার সময়কাল চেনতে পারে। নব্যপ্রস্তর যুগের ধূসর মৃৎপাত্র, তাম্র-প্রস্তর যুগের কালো ও লাল মৃৎপাত্র, বৈদিক যুগের চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র (PGW)।
হাতিয়ার ও ধাতুর ব্যবহার: নব্যপ্রস্তর যুগে মানুষ পাথরের মসৃণ কুঠার ব্যবহার করত। সিন্ধু সভ্যতায় মানুষ ব্রোঞ্জের জিনিস তৈরি করত। পরে বৈদিক যুগে মানুষ লোহার লাঙল বা অস্ত্র তৈরি করল। এই সব দেখায় মানুষ কীভাবে আদিম যুগ থেকে ধীরে ধীরে প্রযুক্তি শিখেছে।
জীবাশ্ম ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা: খনন করা জায়গা থেকে পাওয়া প্রাচীন মানুষের হাড়, প্রাচীন পশুর হাড় অথবা প্রাচীন শস্যের বীজে রেডিওকার্বন ডেটিং (C-14) অথবা অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বয়স নির্ধারণ করা যায়। এরপর প্রাচীন মানুষের হাড়, প্রাচীন পশুর হাড় এবং প্রাচীন শস্যের বীজনের বয়সের তথ্য থেকে সেই সময়ের জলবায়ু, প্রাচীন মানুষের গড় আয়ু, প্রাচীন মানুষের খাবার এবং প্রাচীন মানুষের রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়।
ইতিহাসকে সম্পূর্ণ করতে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের ভূমিকা:
সংক্ষেপে, যদি সাহিত্যিক উপাদান প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের “মন ও আত্মা” হয়, তবে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান তার “অস্থিমজ্জা ও কঙ্কাল”। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ছাড়া প্রাচীন ভারতের ইতিহাস কেবল রূপকথা বা কাল্পনিক গল্পের সমষ্টি হতো। মাটির নিচে থেকে বের করা প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলোই আমাদের অতীতকে বিজ্ঞানসম্মত, বাস্তব এবং গর্বের ভিত্তি তৈরি করেছে।



0 মন্তব্যসমূহ