অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance System) হল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের একটি তীক্ষ্ণ এবং আক্রমণাত্মক হাতিয়ার।
ভারতের ইতিহাসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য বাড়াতে লর্ড ওয়েলেসলি (Lord Wellesley) যে ‘অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি’ (Subsidiary Alliance System) চালু করলেন, তা এক বড় এবং ভয়ংকর কূটনৈতিক চাল। ১৭৯৮ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর লর্ড ওয়েলেসলি ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে রূপান্তর করা এবং ফরাসি প্রভাব সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গঠন এবং ফরাসি প্রভাব শেষ করার জন্য প্রধান হাতিয়ার ছিল অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি। ফরাসি সেনাপতি ডুপ্লে (Dupleix) প্রথমে চুক্তির ধারণা দিলেন। রবার্ট ক্লাইভ পরে চুক্তির ধারণা দিলেন। লর্ড ওয়েলেসলি চুক্তিকে সুনির্দিষ্ট ও আগ্রাসী রূপ দিলেন।
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির প্রধান শর্তগুলো:
দেশীয় রাজা অথবা নবাব চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে খুব কঠোর শর্ত মেনে চলতে হতো। শর্তগুলো প্রথমে সুরক্ষার মতো দেখালেও, শর্তগুলো রাজ্যগুলোকে দুর্বল করার পরিকল্পনা ছিল।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি: চুক্তিবদ্ধ দেশীয় রাজ্যে একদল ব্রিটিশ সৈন্য (Subsidiary force) সবসময় থাকবে।
সৈন্যদের খরচ বহন: ব্রিটিশ বাহিনীর বেতন ও খাবারসহ সব খরচ রাজা বহন করবে। নগদে টাকা না দিলেই রাজ্য কোনো অংশ বা উর্বর প্রদেশ ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে দেবে।
ব্রিটিশ রেসিডেন্ট নিয়োগ: দেশীয় রাজার দরবারে একজন ইংরেজ প্রতিনিধি, ব্রিটিশ রেসিডেন্ট, স্থায়ীভাবে কাজ করবেন। ব্রিটিশ রেসিডেন্ট সরাসরি কোম্পানিকে রাজ্যের রিপোর্ট পাঠাবেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ: চুক্তি করা রাজা কোম্পানির অনুমতি ছাড়া অন্য দেশ বা বিদেশি শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ, চুক্তি বা কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে পারবে না।
ইউরোপীয়দের বিতাড়ন: কোম্পানি অনুমতি না দিলেই ফরাসি বা অন্য ইউরোপীয়কে রাজ্যের সেনাবাহিনী বা প্রশাসনে কাজ দিতে পারবে না। যদি আগে থেকে ফরাসি বা ইউরোপীয় থাকে, তাড়াতে হবে।
সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেশীয় রাজাকে সব ধরনের বিদেশি আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে রক্ষা করবে।
নীতি প্রয়োগের পটভূমি এবং ব্রিটিশদের লক্ষ্য:
লর্ড ওয়েলেসলি যখন ভারতে এলেন, তখন ইউরোপে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান ঘটেছে এবং ভারতে ফরাসি আক্রমণের প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। টিপু সুলতান, মারাঠা এবং হায়দ্রাবাদের নিজাম সবাই ফরাসিদের সাহায্যে নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ওয়েলেসলির উদ্দেশ্য ছিল,
১. দেশীয় রাজাদের পররাষ্ট্রনীতি নিজেদের হাতের মুঠোয় আনা।
২. ফরাসিদের প্রভাব চিরতরে সমূলে নির্মূল করা।
৩. কোম্পানির কোনো আর্থিক ক্ষতি ছাড়াই ভারতে একটি বিশাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গড়ে তোলা।
সাম্রাজ্য বাড়ানোর চতুর পরিকল্পনা:
১৭৯৮ সালে লর্ড ওয়েলেসলি গভার্নর জেনারেল হিসেবে ভারতে পৌঁছালেন। তখন বিশ্ব রাজনীতি খুব গরম ছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তখনো একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেনি। স্যার জন শোরের 'নিরপেক্ষতা নীতি' বা হস্তক্ষেপ না করার নীতির ফলে কোম্পানি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর ঠিক এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ভারতের দেশীয় শক্তিগুলো ফরাসিদের সাহায্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল।
ইউরোপে তখন ফরাসি বিপ্লবের ঢেউ এবং এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান ঘটেছে। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশর আক্রমণ করলেন। তাঁর এই মিশর অভিযানের অন্যতম গোপন লক্ষ্য ছিল স্থলপথে ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়া।
ভারতের ওপর ফরাসি প্রভাব :
মহীশূরের বাঘ টিপু সুলতান: টিপু সুলতান সরাসরি ফরাসিদের সঙ্গে হাত মেলালেন। টিপু সুলতান নিজের রাজধানীতে ফরাসি বিপ্লবের মতো 'জ্যাকোবিন ক্লাব' (Jacobin Club) খুললেন, 'স্বাধীনতার বৃক্ষ' (Tree of Liberty) রোপণ করলেন এবং নিজেকে 'সিটিজেন টিপু' বলে ঘোষণা করলেন। মিশর থেকে নেপোলিয়ন টিপু সুলতানকে চিঠি লিখে সামরিক সাহায্য দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিলেন।
হায়দ্রাবাদের নিজাম: নিজামের বড় পদাতিক বাহিনী ফরাসি সেনাপতি 'রেমন্ড'-এর (Raymond) কঠোর প্রশিক্ষণ পেয়ে, ইউরোপীয় শৈলীতে গড়ে উঠছিল।
মারাঠা সাম্রাজ্য: মহাদজি সিন্ধিয়ার মতো মারাঠা শাসকরা ফরাসি জেনারেল ডি বোয়েন ও পেরনের সাহায্য নিয়ে গোলন্দাজ ও পদাতিক বাহিনীকে আধুনিক ও শক্তিশালী করে তুলেছিল।
এই ঘোরতর সংকটের মুখে লর্ড ওয়েলেসলি বুঝতে পারলেন, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে শুধু যুদ্ধ নয়, দরকার কঠোর কূটনীতি। তিনি চালাকি করে ‘অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি’ নামে একটি নীতি চালু করেন। এবং এর তিনটি লক্ষ্য ঠিক করেন:
১. দেশীয় রাজাদের পররাষ্ট্রনীতি নিজের হাতে নেওয়া:
ওয়েলেসলির সবচেয়ে বড় ভয় ছিল দেশীয় রাজাদের একত্রিত শক্তি। ওয়েলেসলি জানতেন, টিপু সুলতান, মারাঠা এবং নিজাম যদি একসাথে ফরাসিদের সঙ্গে হাত মেলায়, তবে ব্রিটিশদের দ্রুত ভারত থেকে সরে যেতে হবে।
প্রথম লক্ষ্য ছিল রাজাদের কূটনৈতিকভাবে দুর্বল করা। অধীনমিত্র নীতি অনুসারে, দেশীয় রাজাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি চিরতরে শেষ হয়ে যায়। দেশীয় রাজারা কোম্পানির অনুমতি ছাড়া একে অপরের সঙ্গে বা অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি, সন্ধি, এমনকি যুদ্ধও করতে পারে না। ফলে, ভারতের রাজারা একে অপর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং একত্রিত হওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
২. ভারতের ওপর ফরাসি প্রভাব চিরতরে মুছে ফেলা:
নেপোলিয়নের আগ্রাসন থামাতে ওয়েলেসলি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ওয়েলেসলি ভারতীয় রাজদরবারগুলো থেকে প্রতিটি ফরাসি সৈন্য এবং সেনাপতি তাড়িয়ে দেবেন।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কোনো ফরাসি বা অন্য কোনো ইউরোপীয়কে দেশীয় রাজ্যের সেনাবাহিনী বা প্রশাসনে চাকরি দেওয়া যাবে না। আগে থেকে যারা কাজ করছিল, তাদের অবিলম্বে বরখাস্ত করা হবে। শর্তের একটিই ব্যবহার করে ওয়েলেসলি কোনো যুদ্ধ না করে নিজাম এবং মারাঠাদের দরবার থেকে ফরাসিদের বের করে দিল এবং ভারতের মাটিতে ফরাসি স্বপ্নকে চিরতরে শেষ করল।
৩. কোম্পানির কোনো আর্থিক ক্ষতি না করেই ভারতে এক বিশাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গড়ে তোলা:
লন্ডনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টররা সবসময় যুদ্ধের খরচের বিরোধিতা করতেন। ডিরেক্টররা শুধু মুনাফা চেয়েছিলেন। ওয়েলেসলি এক ধুরন্ধর সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন। ওয়েলেসলি এমন একটা পরিকল্পনা তৈরি করলেন যেখানে সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের থাকবে, কিন্তু খরচ ভারতীয়রা বহন করবে।
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ব্যবহার করে ব্রিটিশ সরকার প্রতিটি স্থানীয় রাজ্যে বড় 'সাবসিডিয়ারি ফোর্স' বা ব্রিটিশ বাহিনী স্থাপন করে এবং বলে যে, এই বাহিনীর বেতন ও খাবার খরচ রাজা নিজে দিতে হবে। ফলে ব্রিটিশ কোম্পানির পকেট থেকে এক পয়সাও না খরচে, ভারতীয় রাজাদের টাকা দিয়ে ভারতের মাটিতে বড়, আধুনিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হল, পরে ব্রিটিশ সরকার এই সেনাবাহিনীকে রাজাদের দমন করতে ব্যবহার করে।
যে রাজ্যগুলোতে এই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল:
ওয়েলেসলি খুব চতুর। ওয়েলেসলি ভয় দেখিয়ে, কূটনীতি বা যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতের একের পর এক রাজ্যকে এই চুক্তিতে বাঁধেন।
হায়দ্রাবাদ (১৭৯৮ খ্রি.): লর্ড ওয়েলেসলির 'অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি'র (Subsidiary Alliance) ফাঁদে প্রথম পা দিয়েছিলেন হায়দ্রাবাদের নিজাম আলী খান (দ্বিতীয় আসফ জাহ)। ১৭৯৮ সালে তাঁর এই চুক্তি গ্রহণ করা ভারতের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। নিজাম আলী খান এমনি এমনি ব্রিটিশদের দাসত্ব মেনে নেননি, এর পেছনে ছিল তাঁর চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অস্তিত্ব রক্ষার সংকট। কারণ হায়দ্রাবাদের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল মারাঠা সাম্রাজ্য এবং টিপু সুলতানের মহীশূরের ঠিক মাঝখানে। এই দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীই নিজামের রাজ্য গ্রাস করতে চাইত। এবং ১৭৯৫ সালে 'খর্দার যুদ্ধে' মারাঠাদের কাছে নিজামের বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। নিজাম তখন ব্রিটিশদের সাহায্য চেয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন গভর্নর জেনারেল স্যার জন শোর 'নিরপেক্ষতা নীতি'র দোহাই দিয়ে নিজামকে কোনো সাহায্য করেননি। এই কারণে তিনি ব্রিটিশদের ওপর রেগে গিয়ে এবং মারাঠাদের ভয়ে নিজাম ফরাসিদের শরণাপন্ন হন। ফরাসি সেনাপতি 'রেমন্ড' (Raymond)-এর নেতৃত্বে তিনি ১৪,০০০ সৈন্যের এক দুর্ধর্ষ ফরাসি বাহিনী গঠন করেন, যা হায়দ্রাবাদে ফরাসিদের প্রভাব প্রবল করে তোলে।
১৭৯৮ সালে লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে এসেই দেখলেন হায়দ্রাবাদে ফরাসি প্রভাব ব্রিটিশদের জন্য চরম বিপদের কারণ। এমন মুহূর্তে ওয়েলেসলি এক দুর্দান্ত কূটনৈতিক চাল চাললেন। তিনি নিজামকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, যদি নিজাম ব্রিটিশদের সাথে মিত্রতা করেন, তবে ব্রিটিশ বাহিনী মারাঠা এবং টিপু সুলতানের আক্রমণ থেকে হায়দ্রাবাদকে রক্ষা করবে। মারাঠাদের ভয়ে তটস্থ নিজাম এই টোপ গিলে ফেলেন এবং ১৭৯৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রথম শাসক হিসেবে 'অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি'তে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী নিজাম তাঁর দরবার থেকে ফরাসি সেনাপতি ও সৈন্যদের বরখাস্ত করেন। এবং হায়দ্রাবাদে ৬টি ব্যাটালিয়ন বিশিষ্ট একটি ব্রিটিশ 'সাবসিডিয়ারি ফোর্স' মোতায়েন করেন।
নিজাম তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়ায় তিনি কার্যত ব্রিটিশদের এক আজ্ঞাবহ পুতুলে পরিণত হন। তাঁর নিজের রাজ্যের ভেতরেই ব্রিটিশ রেসিডেন্টরা সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। এই চুক্তির পর থেকে হায়দ্রাবাদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অনুগত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের (সিপাহি বিদ্রোহ) সময় যখন সারা ভারতের রাজারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, তখন হায়দ্রাবাদের নিজাম তাঁর ধন-সম্পদ ও সৈন্য দিয়ে ব্রিটিশদের রক্ষা করেছিলেন। ব্রিটিশরা তখন হায়দ্রাবাদকে তাদের "বিশ্বস্ত মিত্র" (Faithful Ally) উপাধি দিয়েছিল।
মহীশূর (১৭৯৯ খ্রি.): মহীশুর বাঘ টিপু সুলতান এই অপমানজনক চুক্তি মানলেন না। তিনি মরিশাস, তুরস্ক, আরবের আমির এবং আফগানিস্তানের শাসক জামান শাহের কাছে ব্রিটিশ-বিরোধী জোট গড়ার জন্য দূত পাঠান। তিনি মিশরে অবস্থানরত ফরাসি বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে চিঠি লেখেন এবং নেপোলিয়নও তাঁকে সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চিঠির উত্তর দেন। লর্ড ওয়েলেসলি ১৭৯৮ সালে ভারতে নেমেই বুঝতে পারেন যে, টিপু সুলতান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ফরাসিদের সাথে টিপুর এই সম্পর্ক ওয়েলেসলিকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফলে ওয়েলেসলি টিপু সুলতানকে সরাসরি অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি মেনে নেওয়ার জন্য চরমপত্র (Ultimatum) পাঠান। শর্ত ছিল—ফরাসিদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে এবং মহীশূরে ব্রিটিশ সৈন্য রাখতে হবে। স্বাধীনচেতা টিপু সুলতান ওয়েলেসলির এই অপমানজনক প্রস্তাব সগর্বে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বিখ্যাত জীবনদর্শন ছিল—
"ভেড়ার মতো শত বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো একদিন বাঁচাও অনেক ভালো।"
টিপুর এই অস্বীকৃতির পর ১৭৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়েলেসলি মহীশূরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এবং চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে (১৭৯৯) টিপু সুলতান বীরের মতো লড়াই করে মারা গেলেন।
বিজয়ী ব্রিটিশরা মহীশূর রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। কানাড়া, কোয়েম্বাটুর, ওয়ানাড এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশরা সরাসরি নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে। কিছু অংশ নিজামকে দেওয়া হয়। মহীশূরের মূল কেন্দ্রটি প্রাচীন হিন্দু রাজবংশ (ওদেয়ার রাজবংশ)-এর এক নাবালক রাজা তৃতীয় কৃষ্ণরাজ ওদেয়ারের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং তাঁর ওপর জোরপূর্বক 'অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি' চাপিয়ে দেওয়া হয়। এবং টিপু সুলতানের পরিবারের সদস্যদের বন্দী করে ভেলোর দুর্গে নির্বাসিত করা হয়।
তাঞ্জোর (১৭৯৯ খ্রি.): তাঞ্জোরে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে চরম বিবাদ চলছিল। ওয়েলেসলি এই বিবাদে হস্তক্ষেপ করেন এবং দ্বিতীয় সারফোজিকে (Serfoji II) সিংহাসনে বসতে সাহায্য করেন। বিনিময়ে ১৭৯৯ সালে তাঁকে অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তিতে সই করানো হয়। তাঞ্জোরের শাসনভার ব্রিটিশদের হাতে চলে যায় এবং রাজাকে বার্ষিক ৪ লক্ষ টাকা পেনশন দেওয়া শুরু হয়।
সুরাট (১৮০০ খ্রি.): ১৮০০ সালে সুরাটের নবাবের মৃত্যু হলে ওয়েলেসলি উত্তরাধিকারীর দুর্বলতার সুযোগ নেন। প্রশাসনের চরম অব্যবস্থার অজুহাত দেখিয়ে ব্রিটিশরা সুরাটের শাসনভার সম্পূর্ণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং নতুন নবাবকে মাত্র এক লক্ষ টাকা বার্ষিক ভাতা দিয়ে ক্ষমতাহীন করে দেয়।
কর্ণাটক (১৮০১ খ্রি.): দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক বা আরকোট রাজ্যটিও ওয়েলেসলির সাম্রাজ্যবাদী লালসার শিকার হয়। ১৭৯৯ সালে মহীশূরের পতনের পর ব্রিটিশরা দাবি করে যে, কর্ণাটকের নবাব উমদাত-উল-উমারা গোপনে টিপু সুলতানের সাথে ব্রিটিশ-বিরোধী ষড়যন্ত্র লিপ্ত ছিলেন। ১৮০১ সালে নবাবের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী আলী হোসেন এই চুক্তি মানতে অস্বীকার করেন। তখন ওয়েলেসলি নবাবের ভাইপো আজিম-উদ-দৌলাকে সিংহাসনে বসান এবং তাঁকে দিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেন। এর ফলে কর্ণাটকের সমগ্র সামরিক ও বেসামরিক শাসনভার ব্রিটিশদের হাতে চলে যায় এবং নবাবকে কেবল নামমাত্র পেনশনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অযোধ্যা (১৮০১ খ্রি.): উত্তর ভারতের রাজনীতিতে অযোধ্যা ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ধনী রাজ্য। লর্ড ওয়েলেসলি অযোধ্যাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি 'বাফার স্টেট' (Buffer State) বা রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ১৭৯৮ সালে আফগান শাসক জামান শাহ ভারত আক্রমণের হুমকি দিলে ওয়েলেসলি অযোধ্যার নবাব সাদাত আলি খানকে বোঝান যে, তাঁর নিজের সৈন্যবাহিনী এই আক্রমণ ঠেকাতে যথেষ্ট নয়।
ওয়েলেসলি নবাবকে তাঁর নিজস্ব সেনাবাহিনী ভেঙে দিতে এবং ব্রিটিশ সৈন্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে বাধ্য করেন। ব্রিটিশ সৈন্যের রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল খরচ মেটাতে নবাব সাদাত আলি খান ব্যর্থ হলে, ওয়েলেসলি ১৮০১ সালে তাঁকে অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। এই চুক্তির ফলে অযোধ্যার নবাবকে তাঁর রাজ্যের প্রায় অর্ধেক অংশ—রোহিলখণ্ড, গোরক্ষপুর এবং গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চল (Lower Doab)—ব্রিটিশদের হাতে চিরতরে তুলে দিতে হয়। নবাব কার্যত ব্রিটিশদের হাতের পুতুলে পরিণত হন।
মারাঠা সাম্রাজ্য (১৮০২ খ্রি.): মহীশূরের বাঘ টিপু সুলতানকে ধ্বংস করার পর ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী বাধা ছিল মারাঠা সাম্রাজ্য। লর্ড ওয়েলেসলি খুব ভালো করেই জানতেন যে, মারাঠাদের সরাসরি যুদ্ধে হারানো প্রায় অসম্ভব। তাই তিনি মারাঠাদের পতন ঘটাতে কূটনীতি, গুপ্তচরবৃত্তি এবং সামরিক শক্তির এক মারাত্মক মিশ্রণ ব্যবহার করেছিলেন। মারাঠা সাম্রাজ্য একক কোনো রাজার শাসনে ছিল না, এটি ছিল পাঁচটি শক্তিশালী পরিবারের একটি জোট (Confederacy)। পুনের পেশোয়া (প্রধানমন্ত্রী) ছিলেন এই জোটের প্রধান। বাকি চারটি পরিবার ছিল— গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, ইন্দোরের হোলকার, নাগপুরের ভোঁসলে এবং বরোদার গাইকোয়াড়।
পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও হোলকার বংশের এক সদস্যকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলে ইন্দোরের যশোবন্ত রাও হোলকার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে পুনে আক্রমণ করেন।
১৮০২ সালের ২৫ অক্টোবর পুনের যুদ্ধে হোলকারের বাহিনীর কাছে পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও এবং সিন্ধিয়ার যৌথ বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। হোলকার পুনে দখল করে নেন। প্রাণভয়ে ভীত পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও পুনে থেকে পালিয়ে ব্রিটিশদের কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করেন।
ব্রিটিশদের কাছে আশ্রয় নেওয়ার সাথে সাথে লর্ড ওয়েলেসলি তাঁর বহু কাঙ্ক্ষিত 'অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি' (Subsidiary Alliance) পেশোয়ার সামনে ছুড়ে দেন। সিংহাসন ফিরে পাওয়ার লোভে অন্ধ পেশোয়া ১৮০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর লর্ড ওয়েলেসলির সাথে ঐতিহাসিক ব্যাসিনের সন্ধি (Treaty of Bassein) স্বাক্ষর করেন।
রাজপুত রাজ্যসমূহ: ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত রাজপুত রাজ্যগুলো (যেমন—যোধপুর, জয়পুর, ভরতপুর, আলোয়ার প্রভৃতি) মূলত মারাঠা শক্তি (বিশেষ করে সিন্ধিয়া ও হোলকার)-র ক্রমাগত আক্রমণ ও লুন্ঠনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। নিজেদের স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই রাজপুত রাজ্যগুলো ব্রিটিশদের কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করে। মারাঠাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওয়েলেসলি এবং তার পরবর্তী গভর্নর জেনারেলরা একে একে ভরতপুর, আলোয়ার এবং জয়পুরের মতো রাজ্যগুলোকে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে রাজপুত রাজ্যগুলো মারাঠাদের হাত থেকে বাঁচলেও চিরতরে ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়।
দেশীয় রাজ্য ও জনগণের ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব (কুফল):
এই নীতি ভারতীয় রাজ্যগুলোর জন্য এক 'মিষ্টি বিষ' ছিল। এই নীতি ভারতীয় রাজ্যগুলোর স্বাধীনতাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেয়ে নিয়েছিল।
সার্বভৌমত্ব হারানো: ব্রিটিশরা রাজাদের পুতুলে রূপান্তরিত করেছে। পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক ক্ষমতা হারিয়ে, রাজারা স্বাধীনতা পুরোপুরি বিক্রি করেছে।
চরম অর্থনৈতিক সংকট: ব্রিটিশ বাহিনীর ব্যয় অনেক বেশি। ব্রিটিশ বাহিনীর ব্যয় জোগাতে রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়। অধিক কর কৃষকদের উপর চাপ দেয়, ফলে রাজ্যগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
রাজাদের দায়িত্ব না থাকা ও একতরফা শাসন: আগে রাজা প্রজাদের বিদ্রোহের ভয়ে একটু শাসন করতেন। ব্রিটিশদের সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পর রাজা প্রজাদের প্রতি খুব অবহেলাকারী হয়ে গেল এবং ভোগে মগ্ন হল। রাজা প্রজাদের উপর খুব কঠিন অত্যাচার চালু করলেন।
বেকারত্ব ও বিশৃঙ্খলা: দেশীয় রাজা নিজের সেনাবাহিনী ভেঙে দিলেন। হাজার হাজার দেশীয় সৈন্য এক রাতেই বেকার হয়ে গেল। এই বেকার সৈন্যরা পরে 'পিন্ডারি' দস্যুদলে যোগ দিলো এবং সারা দেশে লুটপাট শুরু করলো।
ব্রিটিশদের লাভ (কোম্পানির সুবিধা):
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ব্রিটিশদের অসাধারণ লাভ করিয়েছে।
ভারতীয় রাজাদের টাকায়, ভারতীয় মাটিতে, এই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি বড় ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করে।
দরবারে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট রাখলে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট দেশীয় রাজ্যগুলোর সব লুকানো খবর পায়। এতে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ফরাসিদের ভয় ভারত থেকে চিরতরে চলে যায়।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরোক্ষভাবে ভারতের বিশাল জমিতে একচ্ছত্র আধিপত্য (Paramountcy) গড়ে তুলল।
উপসংহার:
ইতিহাসবিদ সিডনি ওয়েন বলছেন, লর্ড ওয়েলেসলির মিত্রতা নীতি কোম্পানির সাম্রাজ্যকে এক আঘাতে ভারতের সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করে। রূপান্তর কোনো সাধারণ চুক্তি ছিল না, রূপান্তর ছিল ধীরগতির ফাঁসি। ধীরগতির ফাঁসিতে ভারতীয় রাজারা পা দিয়ে কোম্পানির সাম্রাজ্যের কফিনে পেরেক মারছিলেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পথ শত শত বছরের জন্য মসৃণ করছিলেন।







1 মন্তব্যসমূহ
But where are the correct information for class 8
উত্তরমুছুন