ভূমিকা:
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যখন আবেদন-নিবেদনের নরমপন্থী রাজনীতি চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন বাংলার একদল অকুতোভয় তরুণ দেশের স্বাধীনতার জন্য হাতে তুলে নিয়েছিল রিভলভার এবং বোমা। এই সশস্ত্র বিপ্লববাদের বা 'অগ্নিযুগ'-এর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চাঞ্চল্যকর এবং যুগান্তকারী ঘটনাটি হলো ১৯০৮ সালের 'আলিপুর বোমা মামলা' (Alipore Bomb Case), যা ইতিহাসে 'মুরারিপুকুর ষড়যন্ত্র মামলা' (Muraripukur Conspiracy Case) নামেও সমধিক পরিচিত।
এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা, যেখানে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত বাঙালি যুবককে সশস্ত্র বিপ্লব এবং ব্রিটিশ রাজশক্তিকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। আসুন, ১৫০০-এর বেশি শব্দের এই মেগা আর্টিকেলে আমরা আলিপুর বোমা মামলার ঐতিহাসিক পটভূমি, মুরারিপুকুর বাগানবাড়ির গুপ্ত আস্তানা, ক্ষুদিরাম বসুর আত্মত্যাগ, জেলের ভেতরে নরেন গোঁসাই হত্যা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ঐতিহাসিক সওয়াল এবং ভারতের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে অত্যন্ত বিশদভাবে জেনে নিই।
১. ঐতিহাসিক পটভূমি: বঙ্গভঙ্গ এবং সশস্ত্র বিপ্লববাদের উত্থান
আলিপুর বোমা মামলার প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।
লর্ড কার্জন (Lord Curzon) যখন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরাতে এবং বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ধ্বংস করতে ১৯০৫ সালে 'বঙ্গভঙ্গ' (Partition of Bengal) ঘোষণা করেন, তখন সমগ্র বাংলা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণকুমার মিত্রের মতো নেতারা 'স্বদেশী' ও 'বয়কট' (বিদেশি দ্রব্য বর্জন) আন্দোলনের ডাক দেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের নির্মম লাঠিচার্জ, ছাত্রদের স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কার (কার্লাইল সার্কুলার) এবং পুলিশি অত্যাচারে যুবসমাজ বুঝতে পারে যে, কেবল বিদেশি কাপড় পুড়িয়ে বা আবেদন-নিবেদন করে ব্রিটিশদের এই নগ্ন স্বৈরাচার থামানো যাবে না।
এই চরম হতাশা এবং ক্ষোভ থেকেই বাংলার যুবকদের মনে জন্ম নেয় সশস্ত্র বিপ্লববাদের ধারণা। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ব্রিটিশদের শক্তির জবাব শক্তির মাধ্যমেই দিতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দমঠ' এবং গীতার নিষ্কাম কর্মযোগ তাদের মনে নতুন অগ্নিমন্ত্রের জন্ম দেয়।
২. যুগান্তর দল গঠন এবং মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি (The Secret Society)
সশস্ত্র বিপ্লবের এই আদর্শকে বাস্তবায়িত করার জন্য ১৯০৬ সালে ঋষি অরবিন্দ ঘোষের (Aurobindo Ghosh) ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ (Barindra Kumar Ghosh), ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দের ভাই) এবং উল্লাসকর দত্ত মিলে গড়ে তোলেন এক চরমপন্থী গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন—'যুগান্তর দল'। তাদের মুখপত্র ছিল 'যুগান্তর' পত্রিকা, যার পাতায় প্রকাশ্যে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া হতো।
এই বিপ্লবীদের প্রধান আস্তানা এবং গোপন গবেষণাগার হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কলকাতার মানিকতলা অঞ্চলে অবস্থিত অরবিন্দ ও বারীন্দ্রকুমার ঘোষদের নিজস্ব সম্পত্তি—মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি (Muraripukur Garden House)।
মুরারিপুকুরে বোমার কারখানা:
এই বাগানবাড়িটি ছিল শহর থেকে কিছুটা দূরে, গাছপালায় ঘেরা এক নির্জন স্থান। বাইরে থেকে দেখে মনে হতো একদল আধ্যাত্মিক যুবক সেখানে গীতা পাঠ এবং শরীরচর্চা করতে আসে। কিন্তু ভেতরে চলত সম্পূর্ণ অন্য কাজ।
প্রখ্যাত বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো (Hemchandra Kanungo) নিজেদের জমি বিক্রি করে সুদূর প্যারিসে (ফ্রান্স) গিয়ে এক রাশিয়ান বিপ্লবীর কাছ থেকে উন্নত মানের বোমা তৈরির কৌশল শিখে এসেছিলেন।
হেমচন্দ্র কানুনগো এবং প্রতিভাবান রসায়নবিদ উল্লাসকর দত্ত মিলে মুরারিপুকুরের এই বাগানবাড়িতে ভারতের প্রথম উন্নতমানের বোমার কারখানা (Bomb Factory) গড়ে তোলেন। এখানেই তৈরি হতে শুরু করে পিকরিক অ্যাসিডের বোমা এবং বিস্ফোরক।
৩. কিংসফোর্ড হত্যার ছক এবং মুজাফফরপুর বোমা হামলা (The Trigger Event)
মুরারিপুকুরে বোমা তৈরি তো হলো, কিন্তু তা প্রয়োগ করা হবে কার ওপর? বিপ্লবীদের প্রথম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারিত হলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম নিষ্ঠুর এবং অত্যাচারী বিচারক ডগলাস কিংসফোর্ড (Douglas Kingsford)।
কিংসফোর্ড যখন কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন, তখন তিনি স্বদেশী আন্দোলনকারীদের, বিশেষ করে তরুণ ছাত্রদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করতেন। সুশীল সেন নামের মাত্র ১৫ বছরের এক কিশোরকে তিনি প্রকাশ্য আদালতে ১৫ ঘা বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিংসফোর্ডের এই নিষ্ঠুরতায় বিপ্লবীরা ক্ষোভে ফুঁসছিলেন এবং যুগান্তর দল তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ব্রিটিশ সরকার কিংসফোর্ডের প্রাণনাশের আশঙ্কা করে তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে বিহারের মুজাফফরপুরে সেশন জজ হিসেবে বদলি করে দেয়। কিন্তু বিপ্লবীরা তাঁকে সেখানেও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। কিংসফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় যুগান্তর দলের দুই অকুতোভয় তরুণ সদস্য—ক্ষুদিরাম বসু (Khudiram Bose) এবং প্রফুল্ল চাকী (Prafulla Chaki)-র ওপর।
মুজাফফরপুরের সেই কালরাত্রি (৩০শে এপ্রিল, ১৯০৮):
ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী কিংসফোর্ডের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে শুরু করেন। ১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ ইউরোপীয় ক্লাব থেকে কিংসফোর্ডের ঘোড়ার গাড়ির মতো দেখতে একটি গাড়ি বেরিয়ে আসতে দেখে তাঁরা সেই গাড়ির ওপর বোমা নিক্ষেপ করেন। কান ফাটানো শব্দে গাড়িটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না; ছিলেন ব্যারিস্টার প্রিঙ্গল কেনেডির স্ত্রী এবং কন্যা। নির্দোষ দুই মহিলার মৃত্যুতে বিপ্লবীরা চরম মর্মাহত হন। পুলিশ চারদিকে চিরুনি তল্লাশি শুরু করে। প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের রিভলভার দিয়ে আত্মহত্যা করেন (১লা মে)। অন্যদিকে, ওয়াইনি (Waini) স্টেশনে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম বসু। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯০৮ সালের ১১ই আগস্ট মুজাফফরপুর জেলে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেন ভারতের প্রথম কনিষ্ঠতম শহিদ ক্ষুদিরাম বসু।
৪. পুলিশি অভিযান ও মুরারিপুকুর আস্তানা ধ্বংস (The Crackdown)
মুজাফফরপুরের বোমা হামলার পর ব্রিটিশ পুলিশ কলকাতা জুড়ে পাগলের মতো তল্লাশি শুরু করে। পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান সুপারিনটেনডেন্ট ক্রিগ্যান (Superintendent Creagan) গোপন সূত্রে খবর পান যে এই বোমার শিকড় লুকিয়ে আছে মানিকতলার মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে।
২রা মে, ১৯০৮: গভীর রাতে বিশাল পুলিশ ও সেনাবাহিনী মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি ঘিরে ফেলে। তখন বিপ্লবীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ মোট ১৪ জন বিপ্লবীকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ মাটি খুঁড়ে প্রচুর তাজা বোমা, ডিনামাইট, কার্তুজ, রিভলভার, এবং বিপ্লবী ইস্তাহার ও নথিপত্র উদ্ধার করে।
একই দিনে কলকাতার গ্রে স্ট্রিটের (বর্তমানে অরবিন্দ সরণি) বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই বিপ্লবের মূল তাত্ত্বিক গুরু অরবিন্দ ঘোষকে। কলকাতা এবং মেদিনীপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে সর্বমোট ৪৭ জন বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়।
৫. আলিপুর বোমা মামলা শুরু (The Trial Begins)
মুরারিপুকুর থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং নথিপত্রের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার এই বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে "সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা" (Waging war against the King-Emperor) করার মতো রাষ্ট্রদ্রোহিতার চরম অভিযোগ আনে।
১৯০৮ সালের মে মাসে আলিপুরের দায়রা বিচারক (Sessions Judge) চার্লস পোর্টেন বিচক্রফট (Charles Porten Beachcroft)-এর আদালতে শুরু হয় ঐতিহাসিক 'আলিপুর বোমা মামলা'। এটি ছিল এক অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা যে, বিচারক বিচক্রফট এবং প্রধান অভিযুক্ত অরবিন্দ ঘোষ ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে (Cambridge University) একসময় সহপাঠী ছিলেন! ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে এই মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নেন সেযুগের অন্যতম দুঁদে এবং কুখ্যাত আইনজীবী ইয়ার্ডলি নর্টন (Eardley Norton)।
এই মামলাটি টানা এক বছর (মে ১৯০৮ থেকে মে ১৯০৯ পর্যন্ত) ধরে চলেছিল। আদালতে বিপ্লবীদের নির্ভীক এবং খোশমেজাজি আচরণ দেখে ব্রিটিশ বিচারকরা অবাক হয়ে যেতেন। বিপ্লবীদের মনে ফাঁসির কোনো ভয় ছিল না, তারা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি এবং আড্ডা দিতেন।
৬. নরেন গোঁসাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতা ও ঐতিহাসিক জেল-হত্যা
মামলা চলাকালীন ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদের ওপর চরম অমানবিক অত্যাচার শুরু করে। এই অকথ্য শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী (নরেন গোঁসাই) নামক এক দুর্বলচিত্ত বিপ্লবী ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং 'রাজসাক্ষী' (Approver) হয়ে যান।
নরেন গোঁসাই বিপ্লবীদের সমস্ত গোপন তথ্য, কার কী ভূমিকা ছিল, এমনকি অরবিন্দ ঘোষের নামও ব্রিটিশদের কাছে ফাঁস করে দেন। নরেনের এই বিশ্বাসঘাতকতায় পুরো মামলাটি বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং সকলের ফাঁসি প্রায় নিশ্চিত হয়ে ওঠে।
বিপ্লবীরা বুঝতে পারেন, দেশের সাথে বেইমানি করা এই বিশ্বাসঘাতককে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। জেলের ভেতরেই নরেন গোঁসাইকে হত্যা করার এক ভয়ংকর এবং রোমাঞ্চকর ছক কষা হয়। এই দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজেদের কাঁধে তুলে নেন দুই দুঃসাহসী তরুণ—কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
বাইরে থেকে অত্যন্ত গোপনে জেলের ভেতরে দুটি রিভলভার পাচার করা হয়। ১৯০৮ সালের ৩১শে আগস্ট, অসুস্থতার ভান করে কানাইলাল এবং সত্যেন্দ্রনাথ জেলের হাসপাতালে ভর্তি হন। নরেন গোঁসাইকে খবর দেওয়া হয় যে তাঁরাও রাজসাক্ষী হতে চান। নরেন গোঁসাই ইউরোপীয় প্রহরীদের নিয়ে সেখানে আসা মাত্রই কানাইলাল এবং সত্যেন্দ্রনাথ নিজেদের পোশাকের ভেতর থেকে রিভলভার বের করে পর পর গুলি চালিয়ে জেলের ভেতরেই সেই বিশ্বাসঘাতককে হত্যা করেন।
এই চরম বীরত্বের জন্য ১৯০৮ সালের নভেম্বর মাসে কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ফাঁসি হয়। কিন্তু নরেন গোঁসাই মারা যাওয়ায় ব্রিটিশদের মামলা চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, কারণ ব্রিটিশ আইনে মৃত ব্যক্তির সাক্ষ্য আদালতে পুরোপুরি গ্রাহ্য ছিল না।
৭. দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ঐতিহাসিক সওয়াল (The Historic Defense)
এই মামলায় অরবিন্দ ঘোষের জীবন বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসেন তাঁর বন্ধু এবং সেযুগের অন্যতম প্রতিভাবান ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশ (যিনি পরবর্তীকালে 'দেশবন্ধু' নামে পরিচিত হন)। তিনি নিজের সমস্ত লাভজনক মামলা ছেড়ে দিয়ে, টানা আট মাস ধরে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই এই মামলা লড়েছিলেন।
মামলার চূড়ান্ত পর্বে চিত্তরঞ্জন দাশ অরবিন্দ ঘোষের সপক্ষে যে আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক সওয়াল (Closing argument) করেছিলেন, তা ভারতের আইনি ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। বিচারক বিচক্রফটের চোখে চোখ রেখে তিনি বলেছিলেন:
"আমার আবেদন, এই মানুষটির দিকে তাকান... আজ থেকে বহু বছর পর যখন তিনি আর থাকবেন না, তখন তিনি দেশপ্রেমের কবি (Poet of Patriotism), জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং মানবপ্রেমিক হিসেবে পূজিত হবেন। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁর বাণী কেবল ভারত নয়, সমুদ্র পেরিয়ে দূরদূরান্তে প্রতিধ্বনিত হবে।"
চিত্তরঞ্জন দাশের এই অকাট্য যুক্তি এবং প্রমাণের অভাবে ব্রিটিশ বিচারক অরবিন্দ ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
৮. মামলার চূড়ান্ত রায় ও সাজা (The Verdict)
টানা এক বছর ধরে চলা এই দীর্ঘ ও চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয় ১৯০৯ সালের ৬ই মে।
১. অরবিন্দ ঘোষ: প্রমাণের অভাবে তাঁকে বেকসুর খালাস (Acquitted) দেওয়া হয়।
২. মৃত্যুদণ্ড: বোমার কারখানার মূল পাণ্ডা বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং উল্লাসকর দত্তকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে হাইকোর্টে আপিল করার পর তাঁদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর (Cellular Jail, Andaman) বা কালাপানির সাজা দেওয়া হয়।
৩. যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর: হেমচন্দ্র কানুনগো, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অন্যান্য শীর্ষ বিপ্লবীদের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের সাজা দিয়ে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
৪. মোট ১৭ জন বিপ্লবীকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং বাকিদের প্রমাণের অভাবে মুক্তি দেওয়া হয়।
৯. আলিপুর বোমা মামলার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
আলিপুর বোমা মামলা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া ছিল না, এটি ভারতের রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল:
সশস্ত্র বিপ্লববাদের প্রতিষ্ঠা: এই মামলার মাধ্যমেই সমগ্র ভারতবাসী প্রথমবার জানতে পারে যে, দেশের স্বাধীনতার জন্য একদল তরুণ নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে বোমা ও বন্দুক তুলে নিয়েছে। এই বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ ভগৎ সিং, সূর্য সেন (মাস্টারদা) থেকে শুরু করে সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত পরবর্তী প্রজন্মের হাজার হাজার বিপ্লবীকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ব্রিটিশদের বুকে চরম আতঙ্ক: ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল যে, ভারতীয়রা আর কেবল আবেদন-নিবেদন বা পিকেটিং-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জেলের ভেতরে ইউরোপীয় প্রহরীর সামনে নরেন গোঁসাইয়ের খুন ব্রিটিশদের অহংকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
অরবিন্দ ঘোষের আধ্যাত্মিক রূপান্তর: এক বছর আলিপুর জেলে নির্জন কারাবাসের সময় অরবিন্দ ঘোষ এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির (বাসুদেব দর্শন) সম্মুখীন হন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি চিরতরে ত্যাগ করেন এবং ফরাসি উপনিবেশ পণ্ডিচেরীতে (Pondicherry) চলে যান। সেখানে তিনি 'শ্রী অরবিন্দ আশ্রম' প্রতিষ্ঠা করে একজন মহান যোগী ও আধ্যাত্মিক গুরুর জীবন গ্রহণ করেন।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ১৯০৮ সালের আলিপুর বোমা মামলা ছিল ভারতের আকাশে একটি ধূমকেতুর মতো, যা ক্ষণিকের জন্য আবির্ভূত হলেও পরাধীনতার গভীর অন্ধকারে এক তীব্র আলোর ঝলকানি সৃষ্টি করেছিল। ক্ষুদিরাম বসু, কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে ওঠা জয়গান পরাধীন ভারতের ঘুমন্ত যুবশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিল। মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি হয়তো ব্রিটিশরা ধ্বংস করে দিয়েছিল, কিন্তু সেখানে যে স্বাধীনতার অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, তার স্ফুলিঙ্গ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। আলিপুর বোমা মামলার এই আত্মত্যাগের ইতিহাস ভারতের স্বা
ধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য হয়ে চিরকাল অমর থাকবে।


0 মন্তব্যসমূহ