উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): ইতিহাস, সুপারিশমালা এবং সমালোচনা

চার্লস উড
ভূমিকা:

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সুদীর্ঘ ও বিবর্তিত ইতিহাসের দিকে তাকালে বেশ কিছু যুগান্তকারী দলিলের সন্ধান পাওয়া যায়, যা পরাধীন ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি এবং মনস্তত্ত্বকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। এই সমস্ত দলিলের মধ্যে সবচেয়ে সুসংগঠিত, বিস্তৃত এবং প্রভাবশালী নির্দেশনামাটি হলো ১৮৫৪ সালের 'উডের ডেসপ্যাচ' (Wood's Despatch) বা স্যার চার্লস উডের শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশনামা।

এই নির্দেশনামাকে আধুনিক ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার 'ম্যাগনাকার্টা' (Magna Carta) বা 'মহাসনদ' বলা হয়। লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে যে বৈষম্যমূলক 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' (Downward Filtration Theory) প্রবর্তন করেছিলেন, উডের ডেসপ্যাচ সেই নীতির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটিয়ে ভারতে গণশিক্ষা এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার পথ প্রশস্ত করেছিল। আজকের ভারতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে সুশৃঙ্খল শিক্ষা কাঠামো আমরা দেখতে পাই, তার মূল ভিত্তিপ্রস্তর এই উডের ডেসপ্যাচেই রোপণ করা হয়েছিল।

আসুন, ১৫০০-এর বেশি শব্দের এই মেগা আর্টিকেলে আমরা উডের ডেসপ্যাচের ঐতিহাসিক পটভূমি, এর প্রধান সুপারিশমালা, ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং এর দীর্ঘমেয়াদী ত্রুটিগুলো নিয়ে অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হলো। 


১. ঐতিহাসিক পটভূমি: মেকলের নীতির ব্যর্থতা এবং নতুন শিক্ষানীতির খোঁজ

উডের ডেসপ্যাচের পটভূমি বুঝতে হলে আমাদের ১৮১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া ব্রিটিশ শিক্ষানীতির বিবর্তনের দিকে তাকাতে হবে।

  সনদ আইন এবং মেকলের নীতি: ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টে প্রথমবার ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বের পর ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে তাঁর বিখ্যাত 'মেকলে মিনিট' পেশ করেন। মেকলের নীতি অনুযায়ী স্থির হয় যে, সরকারি অর্থে কেবল উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হবে এবং সেখান থেকে শিক্ষা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে 'চুঁইয়ে পড়বে'।

  চুঁইয়ে পড়া নীতির চরম ব্যর্থতা: প্রায় দুই দশক (১৮৩৫-১৮৫৩) চলার পর ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে মেকলের এই 'ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি' সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উচ্চবিত্তরা ইংরেজি শিখে কেবল সরকারি চাকরি ও নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল; তারা সাধারণ অশিক্ষিত মানুষদের শিক্ষিত করার কোনো দায়িত্ব নেয়নি। ফলে ভারতের বিশাল গ্রামীণ ও দরিদ্র জনসমাজ ঘোর অন্ধকারের মধ্যেই থেকে যায়।

  ১৮৫৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট এবং সংসদীয় কমিটি: ১৮৫৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চার্টার বা সনদ নবায়নের সময় উপস্থিত হয়। তখন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক মূল্যায়নের জন্য একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করে। এই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারতের জন্য একটি সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষানীতি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয় ব্রিটিশ সরকারের 'বোর্ড অফ কন্ট্রোল' (Board of Control)-এর তৎকালীন সভাপতি (President) স্যার চার্লস উড (Sir Charles Wood)-এর ওপর।


২. উডের ডেসপ্যাচ বা নির্দেশনামা প্রকাশ (১৮৫৪)

দীর্ঘ পর্যালোচনা এবং ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার খুঁটিনাটি বিচার করার পর, ১৮৫৪ সালের ১৯শে জুলাই স্যার চার্লস উড ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির (Lord Dalhousie) কাছে একটি সুদীর্ঘ ও অত্যন্ত সুপরিকল্পিত নির্দেশনামা পাঠিয়ে দেন।

এই নির্দেশনামায় ভারতের প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুশৃঙ্খল রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল। যেহেতু এটি স্যার চার্লস উডের নেতৃত্বাধীন বোর্ড অফ কন্ট্রোল থেকে প্রেরিত হয়েছিল, তাই ইতিহাসে এটি 'উডের ডেসপ্যাচ' (Wood's Despatch) বা উডের শিক্ষা-ঘোষণাপত্র নামে অমর হয়ে আছে।


৩. উডের ডেসপ্যাচের প্রধান সুপারিশ ও শর্তাবলী (Provisions of Wood's Despatch)

উডের ডেসপ্যাচ কেবল গুটিকয়েক প্রস্তাবের সমষ্টি ছিল না; এটি ছিল ১০০টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত একটি বিশাল নির্দেশনামা। এই ডেসপ্যাচের প্রধান ও ঐতিহাসিক সুপারিশগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

ক) শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ (State Responsibility for Education)

এই ডেসপ্যাচে প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে, ভারতের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের শিক্ষার দায়িত্ব কোনোমতেই বেসরকারি ব্যক্তি বা মিশনারিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। শিক্ষার প্রসার ঘটানো ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম প্রধান পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। মেকলের চুঁইয়ে পড়া নীতিকে সম্পূর্ণ বাতিল করে গণশিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়।

খ) জনশিক্ষা বিভাগ বা শিক্ষা দপ্তর প্রতিষ্ঠা (Department of Public Instruction)

শিক্ষাব্যবস্থাকে সুচারুরূপে পরিচালনা করার জন্য ব্রিটিশ ভারতের পাঁচটি প্রদেশ—বাংলা, বোম্বাই, মাদ্রাজ, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) এবং পাঞ্জাবে আলাদাভাবে 'জনশিক্ষা বিভাগ' (Department of Public Instruction বা DPI) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রতিটি প্রদেশে একজন করে 'ডিরেক্টর' (Director of Public Instruction) নিযুক্ত করার কথা বলা হয় এবং তাঁর অধীনে বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনের জন্য একদল ইনস্পেক্টর (Inspectors of Schools) নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।

গ) সুশৃঙ্খল শিক্ষা কাঠামোর স্তরবিন্যাস (Hierarchy of Educational Institutions)

উডের ডেসপ্যাচে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি পিরামিডের মতো স্তরে স্তরে সাজানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই কাঠামোটি ছিল নিম্নরূপ:

১. প্রাথমিক বিদ্যালয় (Primary Schools): একেবারে নিচুতলায় প্রতিটি গ্রামে দেশীয় ভাষার (Vernacular) প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।

২. মিডল স্কুল (Middle Schools): প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপরে থাকবে অ্যাংলো-ভার্নাকুলার বা মিডল স্কুল, যেখানে দেশীয় ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিও শেখানো হবে।

৩. উচ্চ বিদ্যালয় (High Schools): জেলা সদরগুলোতে জেলা স্কুল বা উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।

৪. কলেজ (Colleges): উচ্চ বিদ্যালয়ের ওপরে থাকবে অ্যাংলো-ভার্নাকুলার কলেজ।

৫. বিশ্ববিদ্যালয় (Universities): সবার ওপরে, শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রেসিডেন্সি শহরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।

ঘ) শিক্ষার মাধ্যম: ইংরেজি ও মাতৃভাষার সমন্বয় (Medium of Instruction)

মেকলে যেখানে মাতৃভাষাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে কেবল ইংরেজির পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, উডের ডেসপ্যাচ সেখানে এক চমৎকার সমন্বয় সাধন করে। এতে বলা হয়:

  উচ্চশিক্ষার মাধ্যম: কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শন শিক্ষার মাধ্যম হবে ইংরেজি ভাষা।

  প্রাথমিক ও গণশিক্ষার মাধ্যম: সাধারণ মানুষের জন্য প্রাথমিক ও বিদ্যালয় স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে নিজ নিজ মাতৃভাষা বা দেশীয় ভাষা (Vernacular Languages)।

এটি ছিল মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্রে এক বিরাট যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

ঙ) বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (Establishment of Universities)

উডের ডেসপ্যাচের সবচেয়ে বিখ্যাত সুপারিশ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। ইংল্যান্ডের 'লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়'-এর (London University) অনুকরণে ভারতের তিনটি প্রধান প্রেসিডেন্সি শহর—কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে মজার বিষয় হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ সরাসরি ছাত্রদের পড়ানো বা শিক্ষাদান (Teaching) ছিল না; এদের কাজ ছিল মূলত পরীক্ষা গ্রহণ করা (Affiliating and Examining) এবং উপাধি বা ডিগ্রি প্রদান করা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন চ্যান্সেলর (আচার্য), একজন ভাইস-চ্যান্সেলর (উপাচার্য) এবং একটি সেনেট (Senate) গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়।

চ) অনুদান প্রথা বা গ্রান্ট-ইন-এইড (Grant-in-Aid System)

কেবল সরকারি অর্থে সমগ্র ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা চালানো সম্ভব নয়, এটি বুঝতে পেরে উড ডেসপ্যাচে 'গ্রান্ট-ইন-এইড' বা অনুদান প্রথা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, শর্তসাপেক্ষে বেসরকারি বিদ্যালয় বা কলেজগুলোকে সরকার আর্থিক সাহায্য প্রদান করবে।

অনুদান পাওয়ার শর্তগুলো ছিল:

১. বিদ্যালয়টিতে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা (Secular Education) দিতে হবে।

২. বিদ্যালয়ের নিজস্ব একটি পরিচালনা সমিতি থাকতে হবে।

৩. ছাত্রদের কাছ থেকে সামান্য হলেও মাসিক বেতন বা ফি আদায় করতে হবে (যাতে তারা শিক্ষাকে বিনামূল্যে পাওয়া মূল্যহীন বস্তু না ভাবে)।

৪. সরকারি ইনস্পেক্টরদের দ্বারা বিদ্যালয় পরিদর্শন করাতে রাজি থাকতে হবে।

ছ) শিক্ষক শিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (Teachers' Training Institutions)

মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের জন্য যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন। তাই উডের ডেসপ্যাচে ইংল্যান্ডের অনুকরণে ভারতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য 'নর্মাল স্কুল' (Normal Schools) বা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।

জ) নারী শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (Women & Vocational Education)

এই নির্দেশনামায় নারী শিক্ষার প্রসারের প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থনের কথা ঘোষণা করা হয়। লর্ড ডালহৌসি এবং জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের নারী শিক্ষার উদ্যোগকে এতে সাধুবাদ জানানো হয় এবং নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উদারভাবে অনুদান দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এছাড়াও, ভারতের যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে আইন, চিকিৎসাবিদ্যা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো বৃত্তিমূলক বা পেশাদারি শিক্ষা (Vocational and Professional Education) প্রসারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।


৪. উডের ডেসপ্যাচের ঐতিহাসিক তাৎপর্য:

উডের ডেসপ্যাচ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক জলন্ত মাইলফলক। ঐতিহাসিক জেমস (H.R. James) এই নির্দেশনামাকে "ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ম্যাগনাকার্টা" বলে অভিহিত করেছেন। এর তাৎপর্যগুলো হলো:

১. আধুনিক কাঠামোর জন্ম: আজ আমরা স্কুলে প্রাইমারি, হাইস্কুল, তারপর কলেজ এবং শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্তরগুলো দেখি, তার সম্পূর্ণ পরিকাঠামো ১৮৫৪ সালের এই নির্দেশনামাতেই প্রথম তৈরি করা হয়েছিল।

২. মাতৃভাষার পুনর্জাগরণ: মেকলের কারণে দেশীয় ভাষাগুলো যে অবহেলার শিকার হয়েছিল, উডের ডেসপ্যাচ তাকে আবার যোগ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়। প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়ায় বাংলা, হিন্দি, মারাঠি ইত্যাদি ভাষার সাহিত্য ও চর্চায় জোয়ার আসে।

৩. বেসরকারি উদ্যোগের বিকাশ: 'গ্রান্ট-ইন-এইড' প্রথা চালু হওয়ার ফলে বিদ্যাসাগর, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বা অন্যান্য সমাজ সংস্কারকদের পক্ষে বেসরকারি উদ্যোগে স্কুল ও কলেজ স্থাপন করা অনেক সহজ হয়ে যায়। বাংলার বুকে গড়ে ওঠা অসংখ্য স্কুল এই অনুদান প্রথারই ফসল।

৪. নারী শিক্ষার প্রসার: সরকারি পৃষ্ঠপোষণায় নারী শিক্ষার যে নবজাগরণ শুরু হয়, তা পরবর্তীকালে ভারতীয় সমাজে এক বিরাট সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল।

৫. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা: ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভারতের উচ্চশিক্ষায় এক নবযুগের সূচনা হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাশ করা শিক্ষিত যুবকরাই পরবর্তীতে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং নবজাগরণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।


৫. উডের ডেসপ্যাচের ত্রুটি, সমালোচনা এবং নেতিবাচক দিক

যদিও উডের ডেসপ্যাচকে মহাসনদ বলা হয়, তবুও অনেক ঐতিহাসিক এবং শিক্ষাবিদ এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই নির্দেশনামার বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক দিক ছিল, যা ভারতীয় সমাজকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল:

  কেরানি তৈরির কারখানা: এই শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ছিল না। ব্রিটিশদের বিশাল সাম্রাজ্য চালানোর জন্য প্রচুর সস্তা কেরানির (Clerks) প্রয়োজন ছিল। উডের ডেসপ্যাচের ফলে এমন একদল শিক্ষিত ভারতীয় তৈরি হলো, যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের অধীনে একটি কেরানির চাকরি জোগাড় করা।

  পরীক্ষাসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল পরীক্ষা নেওয়া এবং ডিগ্রি দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সরাসরি পড়ানোর ক্ষমতা তাদের ছিল না। এর ফলে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থবিদ্যা এবং ডিগ্রিসর্বস্ব হয়ে পড়ে, যা স্বাধীন ভারতে আজও একটি বড় সমস্যা।

  দেশজ শিক্ষাব্যবস্থার চূড়ান্ত বিনাশ: অনুদান পাওয়ার জন্য সরকার যে কঠোর শর্তগুলো (যেমন- ধর্মনিরপেক্ষতা, সরকারি পরিদর্শন, ফি নেওয়া) চাপিয়ে দিয়েছিল, তা ভারতের প্রাচীন টোল, পাঠশালা বা মক্তবগুলোর পক্ষে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। ফলে ভারতের হাজার হাজার বছরের পুরোনো গ্রামীণ দেশজ শিক্ষাব্যবস্থা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।

  গণশিক্ষার ব্যর্থতা: কাগজে-কলমে গণশিক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ব্রিটিশ সরকার উচ্চশিক্ষার পেছনে যত টাকা খরচ করেছিল, প্রাথমিক শিক্ষার পেছনে তার সিকিভাগও খরচ করেনি। ফলে বিশাল কৃষক ও শ্রমিক সমাজ অশিক্ষিতই রয়ে যায়।

  ইংরেজি ভাষার একচ্ছত্র দাপট: মাতৃভাষাকে প্রাথমিক স্তরে স্বীকৃতি দিলেও সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য ইংরেজি জ্ঞান বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। এর ফলে সমাজে এমন একটি হীনম্মন্যতার সৃষ্টি হয় যে, ইংরেজি না জানলে সমাজে কোনো সম্মান বা চাকরি জুটবে না—এই ধারণা আজও ভারতীয়দের মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি।


৬. উপসংহার: এক মিশ্র উত্তরাধিকার

সবশেষে বলা যায়, ১৮৫৪ সালের উডের ডেসপ্যাচ ছিল ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি সত্যি যে ব্রিটিশদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করা এবং এমন একটি অনুগত শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করা যারা মনেপ্রাণে ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেবে।

কিন্তু ইতিহাসের পরম পরিহাস হলো, এই উডের ডেসপ্যাচের হাত ধরে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বা স্বামী বিবেকানন্দের মতো মণীষীদের জন্ম হয়েছিল। এই পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত নেতারাই পরবর্তীতে ব্রিটিশদের দেওয়া স্বাধীনতার বুলি ও গণতন্ত্রের পাঠ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিলেন। তাই হাজারো ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, আধুনিক ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিভূমি রচনায় উডের ডেসপ্যা

চের ঐতিহাসিক অবদান অনস্বীকার্য এবং তা চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ