অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি (১৯০৫): ইতিহাস, কার্লাইল সার্কুলার ও তাৎপর্য

শচীন্দ্র প্রসাদ বসু রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন।

ভূমিকা:

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। এই ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে অসংখ্য বীরত্ব এবং আত্মত্যাগের কাহিনি। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার নগ্ন স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করেছিল, তখন ভারতের, বিশেষত বাংলার তরুণ ছাত্রসমাজ সেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া 'অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি' (Anti-Circular Society) ছিল ভারতের বুকে প্রথম সুসংগঠিত এবং সর্ববৃহৎ ছাত্র আন্দোলন।

কীভাবে একটি ছাত্র সংগঠন ব্রিটিশ সরকারের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দিয়েছিল? কীভাবে তারা ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার রক্ষা করার পাশাপাশি ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো ঐতিহাসিক কাজ করেছিল? আসুন, ১৫০০-এর বেশি শব্দের এই মেগা আর্টিকেলে আমরা অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির প্রতিষ্ঠার পটভূমি, ব্রিটিশদের দমনমূলক আইন, সোসাইটির কার্যাবলী এবং ভারতীয় রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পর্কে অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করা হলো। 


১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বঙ্গভঙ্গ এবং ছাত্রসমাজের জাগরণ

অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি কেন তৈরি হয়েছিল, তা বুঝতে হলে আমাদের ১৯০৫ সালের বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটটি বুঝতে হবে।

লর্ড কার্জন (Lord Curzon) যখন ভারতের ভাইসরয় হয়ে এলেন, তখন তিনি লক্ষ্য করলেন যে বাংলা হলো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং জাতীয়তাবাদের মূল কেন্দ্র বা 'স্নায়ুকেন্দ্র' (Nerve Center)। কার্জন চেয়েছিলেন এই জাতীয়তাবাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে। এই কুৎসিত উদ্দেশ্যেই তিনি ১৯০৫ সালের ১৯শে জুলাই ঘোষণা করেন যে, প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করা হবে—যা ইতিহাসে 'বঙ্গভঙ্গ' (Partition of Bengal) নামে পরিচিত।

এই ঘোষণার সাথে সাথেই সমগ্র বাংলা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলার নেতারা সিদ্ধান্ত নেন যে ব্রিটিশদের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে 'স্বদেশী' ও 'বয়কট' (বিদেশি দ্রব্য বর্জন) আন্দোলন শুরু করা হবে। আর এই আন্দোলনে সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যারা রাস্তায় নেমে এসেছিল, তারা হলো বাংলার তরুণ ছাত্রসমাজ। স্কুল-কলেজের ছাত্ররা বিদেশি পোশাক পুড়িয়ে ফেলে, বিদেশি জিনিসপত্রের দোকানের সামনে পিকেটিং (Picketing) শুরু করে এবং পথে ঘাটে 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে। ছাত্রদের এই বিপুল রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ব্রিটিশ সরকারের মনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে।


২. ব্রিটিশদের দমননীতি: কুখ্যাত সার্কুলার বা নির্দেশিকাসমূহ

ছাত্রদের এই অদম্য জাতীয়তাবাদী স্রোতকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার একের পর এক চরম দমনমূলক ও স্বৈরাচারী নির্দেশিকা বা 'সার্কুলার' (Circular) জারি করতে থাকে। এর মধ্যে প্রধান তিনটি সার্কুলার ছিল:

ক) কার্লাইল সার্কুলার (The Carlyle Circular)

১৯০৫ সালের ১০ই অক্টোবর ব্রিটিশ সরকারের মুখ্যসচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল (R. W. Carlyle) জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে একটি গোপন নির্দেশিকা পাঠান, যা 'কার্লাইল সার্কুলার' নামে কুখ্যাত।

এই সার্কুলারের প্রধান শর্তগুলো ছিল:

  কোনো স্কুল বা কলেজের ছাত্র কোনো রাজনৈতিক সভা, সমিতি বা মিছিলে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

  প্রকাশ্যে রাস্তায় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি বলে গণ্য হবে।

  যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র এই নির্দেশ অমান্য করে, তবে সেই স্কুল বা কলেজের সরকারি অনুদান (Grant-in-aid) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি (Affiliation) অবিলম্বে বাতিল করা হবে।

  শিক্ষকদের নির্দেশ দেওয়া হয় তাঁরা যেন ছাত্রদের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী কাজে যুক্ত ছাত্রদের নামের তালিকা পুলিশের হাতে তুলে দেন।

খ) পেডলার সার্কুলার (The Pedler Circular)

কার্লাইল সার্কুলারের ঠিক এগারো দিন পর, ২১শে অক্টোবর জনশিক্ষা অধিকর্তা (Director of Public Instruction) আলেকজান্ডার পেডলার আরেকটি নির্দেশিকা জারি করেন। এতে বলা হয়, যেসব ছাত্র ধর্মঘটে অংশ নিয়েছে বা স্বদেশী আন্দোলনের মিছিলে হেঁটেছে, তাদের অবিলম্বে স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কার (Rusticate) করতে হবে এবং ভবিষ্যতে তারা কোনো সরকারি চাকরি পাবে না।

গ) লিয়ন সার্কুলার (The Lyon Circular)

পূর্ববঙ্গ ও আসামের নতুন ছোটলাট ব্যামফিল্ড ফুলারের নির্দেশে মুখ্যসচিব পি. সি. লিয়ন আরেকটি ভয়ংকর সার্কুলার জারি করেন। এতে বলা হয় যে, ছাত্রদের দ্বারা পিকেটিং সম্পূর্ণ বেআইনি এবং বন্দে মাতরম ধ্বনি দিলে পুলিশ সরাসরি ছাত্রদের গ্রেপ্তার করতে পারবে।

ব্রিটিশদের ধারণা ছিল, শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যতের ভয় দেখালে ছাত্ররা ভয় পেয়ে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাংলার তেজস্বী যুবসমাজ এই সমস্ত কালাকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে।


৩. অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির জন্ম ও প্রতিষ্ঠা (Formation of the Society)

ব্রিটিশদের এই নগ্ন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য এবং বহিষ্কৃত ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি বিকল্প এবং শক্তিশালী সংগঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই ঐতিহাসিক শূন্যস্থান পূরণের উদ্দেশ্যেই জন্ম নেয় 'অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি'।

প্রতিষ্ঠার দিনক্ষণ:

১৯০৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে এক বিশাল ছাত্রসভায় এই সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রতিষ্ঠাতাগণ ও নেতৃত্ব:

এই সংগঠনের মূল রূপকার ছিলেন রিপন কলেজের (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) মেধাবী ও বাগ্মী ছাত্রনেতা শচীন্দ্র প্রসাদ বসু (Sachindra Prasad Bose)।

  সভাপতি (President): প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং 'সঞ্জীবনী' পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র (Krishna Kumar Mitra) এই সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হন।

  সম্পাদক (Secretary): তরুণ ছাত্রনেতা শচীন্দ্র প্রসাদ বসু স্বয়ং এর সম্পাদক নির্বাচিত হন।

  কোষাধ্যক্ষ (Treasurer): কৃষ্ণকুমার মিত্রের পুত্র সুকুমার মিত্র কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন।

  এছাড়াও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, লিয়াকত হোসেন, এবং ফজলুল হকের মতো বিশিষ্ট নেতারা এই সংগঠনকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন যুগিয়েছিলেন।

অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয় কৃষ্ণকুমার মিত্রের 'সঞ্জীবনী' পত্রিকার অফিস, অর্থাৎ কলকাতার ৬ নং কলেজ স্কোয়ারে (বর্তমানে যা ৮/৩ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট)।


৪. অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির প্রধান উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি

এই সংগঠনটি কেবল একটি প্রতিবাদী মঞ্চ ছিল না, এটি গঠনমূলক কাজের মাধ্যমে ব্রিটিশদের একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা বা 'প্যারালাল সিস্টেম' তৈরি করে দিয়েছিল। এদের প্রধান কর্মসূচিগুলো ছিল নিম্নরূপ:

ক) বহিষ্কৃত ছাত্রদের শিক্ষার বিকল্প ব্যবস্থা (Alternative Education)

সোসাইটির প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল কার্লাইল ও পেডলার সার্কুলার অমান্য করার কারণে যেসব ছাত্র স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল, তাদের জন্য বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করা। ব্রিটিশদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত ছাত্রদের নিয়ে সোসাইটির নেতারা নিজস্ব ক্লাস শুরু করেন। এই উদ্যোগটিই পরবর্তীকালে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের 'ডন সোসাইটি' (Dawn Society) এবং বৃহত্তর 'জাতীয় শিক্ষা পরিষদ' (National Council of Education) গঠনে বিশাল ভূমিকা পালন করেছিল, যা থেকে আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছে।

খ) স্বদেশী পণ্যের প্রসার ও প্রচার

সোসাইটির ছাত্ররা দলে দলে ভাগ হয়ে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায় এবং বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেশীয় চরকায় বোনা কাপড়, দেশলাই, সাবান এবং অন্যান্য স্বদেশী দ্রব্যের বিক্রি বাড়ানোর কাজ করত। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে বোঝাতেন কেন বিদেশি জিনিস কেনা বন্ধ করে দেশের কারিগরদের তৈরি জিনিস কেনা উচিত।

গ) বিদেশি দ্রব্য বর্জন (Boycott of Foreign Goods)

অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির সদস্যরা অত্যন্ত অহিংস কিন্তু কঠোরভাবে বিদেশি দ্রব্য বর্জনের ডাক দেন। তারা বিদেশি কাপড়ের দোকানগুলোর সামনে পিকেটিং করতেন এবং ক্রেতাদের বিদেশি জিনিস কিনতে বাধা দিতেন। অনেক সময় তারা বিদেশি কাপড় একত্র করে রাস্তায় বিশাল আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানাতেন।

ঘ) সার্কুলার অমান্য করে 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি

ব্রিটিশ সরকার প্রকাশ্যে বন্দে মাতরম ধ্বনি দেওয়া নিষিদ্ধ করেছিল। সোসাইটির মূল লক্ষ্যই ছিল এই স্বৈরাচারী নির্দেশকে সরাসরি অমান্য করা। তারা বুক চিতিয়ে, পুলিশের লাঠির পরোয়া না করে রাস্তায় রাস্তায় বন্দে মাতরম গাইতে গাইতে মিছিল করতেন। পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে অনেক ছাত্র রক্তাক্ত হলেও তারা পিছপা হননি।

ঙ) হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি স্থাপন

ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের মূল উদ্দেশ্যই ছিল হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা। সোসাইটির নেতারা, বিশেষ করে মৌলবি লিয়াকত হোসেন এবং শচীন্দ্র প্রসাদ বসু, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য ব্যাপক প্রচার চালান। তারা রাখীবন্ধন উৎসবের মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।


৫. ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকার নকশা ও উত্তোলন (The Calcutta Flag, 1906)

অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি এবং এর সম্পাদক শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় এবং ঐতিহাসিক কীর্তিটি হলো পরাধীন ভারতের বুকে প্রথম জাতীয় পতাকার (National Flag) নকশা তৈরি এবং তা উত্তোলন করা।

বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার প্রথম বর্ষপূর্তি এবং স্বদেশী আন্দোলনকে আরও তীব্র করতে ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট কলকাতার পার্সিবাগান স্কোয়ারে (বর্তমানে গ্রিয়ার পার্ক) এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। শচীন্দ্র প্রসাদ বসু এবং সুকুমার মিত্র অনুভব করেছিলেন যে, একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ জাতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো তার নিজস্ব পতাকা।

তাঁরা একটি পতাকার নকশা তৈরি করেন, যা ইতিহাসে 'ক্যালকাটা ফ্ল্যাগ' (Calcutta Flag) বা 'স্বদেশী পতাকা' নামে পরিচিত।

  এই পতাকায় সবুজ, হলুদ এবং লাল রঙের তিনটি অনুভূমিক ব্যান্ড ছিল।

  ওপরের সবুজ অংশে ব্রিটিশ ভারতের আটটি প্রদেশের প্রতীক হিসেবে আটটি অর্ধ-প্রস্ফুটিত সাদা পদ্মফুল আঁকা ছিল।

  মাঝের হলুদ অংশে গাঢ় নীল রঙের দেবনাগরী হরফে লেখা ছিল— "বন্দে মাতরম"।

  নিচের লাল অংশের বাঁ-দিকে হিন্দু ধর্মের প্রতীক হিসেবে একটি সাদা সূর্য এবং ডানদিকে ইসলাম ধর্মের প্রতীক হিসেবে একটি অর্ধচন্দ্র ও তারা আঁকা ছিল।

১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট পার্সিবাগান স্কোয়ারের সেই বিশাল জনসমুদ্রে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির উদ্যোগে ভারতের এই প্রথম জাতীয় পতাকাটি সগর্বে উত্তোলিত হয়।


৬. সোসাইটির শাখা বিস্তার এবং ব্রিটিশদের নির্মম দমননীতি

অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির প্রভাব কেবল কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। খুব দ্রুতই এর শাখা পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে বরিশাল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর এবং মেদিনীপুরে ছড়িয়ে পড়ে। বরিশালে অশ্বিনীকুমার দত্তের 'স্বদেশবান্ধব সমিতি'-র সাথে এই সোসাইটি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিল।

সোসাইটির এই অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা এবং ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপে সরকার প্রমাদ গোনে। ১৯০৮ সাল নাগাদ বাংলায় বিপ্লবী ও সশস্ত্র আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে, ব্রিটিশ সরকার ১৮১৮ সালের ৩ নম্বর রেগুলেশন (Regulation III of 1818) নামক এক বর্বরোচিত ও স্বৈরাচারী আইনের প্রয়োগ করে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে।

বিনা বিচারে বাংলার ৯ জন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির সভাপতি কৃষ্ণকুমার মিত্র এবং সম্পাদক শচীন্দ্র প্রসাদ বসু অন্যতম ছিলেন। তাঁদের গ্রেপ্তার করে সুদূর পাঞ্জাব এবং আগ্রার জেলে নির্বাসিত (Deported) করা হয়। মূল নেতাদের গ্রেপ্তারের ফলে এবং কংগ্রেসের ভেতরে চরমপন্থী-নরমপন্থী বিভাজনের কারণে ১৯০৮ সালের পর থেকে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।


৭. ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও মূল্যায়ন:

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির গুরুত্ব অপরিসীম। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর তাৎপর্যগুলোকে নিচের কয়েকটি বিন্দুতে মূল্যায়ন করা যায়:

১. ছাত্র রাজনীতির পথিকৃৎ: এর আগে ভারতের রাজনীতি ছিল মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা অভিজাতদের ড্রয়িংরুমের বিষয়। অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটিই প্রথম প্রমাণ করেছিল যে, ছাত্র ও যুবসমাজ দেশের রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নির্ণায়ক শক্তি হতে পারে। পরবর্তীকালে ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বা স্বাধীন ভারতের ছাত্র আন্দোলনে যে যুবশক্তির বিস্ফোরণ দেখা গিয়েছিল, তার আদি রূপরেখা এই সোসাইটিই তৈরি করে দিয়েছিল।

২. জাতীয় শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর: ব্রিটিশদের দাসত্বমূলক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থে এবং দেশীয় সিলেবাসে একটি 'জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা' গড়ে তোলার যে স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়িত করার জন্য ছাত্রদের প্রাথমিক যোগান দিয়েছিল এই সোসাইটিই।

৩. ভয়হীনতার সংস্কৃতি: ব্রিটিশ পুলিশের লাঠি, বেত, জেল এবং স্কুল থেকে বহিষ্কারের হুমকি—সবকিছুকে উপেক্ষা করে নির্ভয়ে বন্দে মাতরম গাওয়ার যে সাহস সোসাইটির ছাত্ররা দেখিয়েছিল, তা সমগ্র ভারতের মানুষের মন থেকে ব্রিটিশ-ভীতি দূর করে দিয়েছিল।

৪. জাতীয় ঐক্যের প্রতীক: ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট তাদের তৈরি প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন কেবল একটি কাপড়ের টুকরো ওড়ানো ছিল না, এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ এবং ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বপ্ন দেখার প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।


উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, ১৯০৫ সালের অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি কেবল একটি অস্থায়ী ছাত্র সংগঠন ছিল না; এটি ছিল পরাধীন ভারতের ঘুমন্ত যুবশক্তির প্রথম প্রজ্জ্বলিত মশাল। লর্ড কার্জন বা কার্লাইল ভেবেছিলেন যে কালাকানুনের চোখরাঙানি দেখিয়ে বাংলার ছাত্রদের দমিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, তাঁদের সেই দমননীতিই বাংলার বুকে স্বাধীনতার দাবানল সৃষ্টি করেছিল।

কৃষ্ণকুমার মিত্র, শচীন্দ্র প্রসাদ বসু এবং সেই হাজার হাজার নাম-না-জানা তরুণ ছাত্র, যাঁরা নিজেদের শিক্ষাজীবন এবং উজ্জ্বল কেরিয়ারকে দেশের পায়ে হাসিমুখে বলিদান দিয়েছিলেন—তাঁদের সেই আত্মত্যাগ আজও স্মরণীয়। আজকের দিনের স্বাধীন ভারতের ছাত্র ও যুবসমাজের কাছে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির নির্ভীকতা, গঠন

মূলক চিন্তাধারা এবং প্রখর দেশপ্রেম এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ