প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদানসমূহ


প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান:-

   অতীত সম্বন্ধে মানুষের জানার আগ্রহ বরাবরের আর অতীত ঘটনাই হল ইতিহাসের বিষয়বস্তু (যদিও সব অতীতই ইতিহাস নয়)। ওই সমস্ত ঘটনা জানার জন্য যে সমস্ত তথ্যের উপর ঐতিহাসিকরা নির্ভর করেন সেই নির্ভরশীল তথ্যগুলি ইতিহাসের উপাদান।

   ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক সংশ্লিষ্ট তথ্য গুলি যত্ন সহকারে বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের বিশ্লেষিত তথ্যটির যথার্থতার ওপরেই ইতিহাসের মান নির্ভর করে। এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, কোন একটি বিশেষ তথ্যের উপর নির্ভর করে কোন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক। কারণ তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন। বলাবাহুল্য, এটাই হল ইতিহাসের বড় আকর্ষণ।


প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, যথা:-

১) প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। 

২) সাহিত্যিক উপাদান।


প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান আবার চার ভাগে বিভক্ত, যথা:-

ক) লিপি বা শিলালিপি

খ) মুদ্রা 

গ) স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

ঘ) অন্যান্য বস্তুগত অবশেষ


প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান:

ক) লিপি বা শিলালিপি (Inscriptions & Epigraphy)

প্রাচীন ইতিহাস রচনায় লিপি অপরিহার্য। লিপি হল পাথর, পাহাড়ের গা, স্তম্ভ, তামার পাত (তাম্রশাসন), মাটির পাত্র, মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা প্রাচীন লেখা।

গুরুত্ব: লিপিতে রাজা, বংশতালিকা, জয়ী অঞ্চল, যুদ্ধের তারিখ এবং ধর্মীয় ঘোষণার তথ্য থাকে। এই তথ্যগুলো সমসাময়িক সময়ে খোদাই করা হতো, ফলে মিথ্যা বা কাল্পনিক তথ্য কমই থাকে।

উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:

অশোকের অনুশাসন: ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপিতে খোদিত শিলালিপি সম্রাট অশোকের অহিংস নীতি, ধম্ম এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানা প্রকাশ করে।

এলাহাবাদ প্রশস্তি: কবি হরিষেণ সংস্কৃত ভাষায় লিখেছেন। কবি হরিষেণের লিপি গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় এবং সামরিক প্রতিভা সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়।

নাসিক প্রশস্তি সাতবাহন রাজা গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর বীরত্বকে তুলে ধরে, এবং সাতবাহন রাজা গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর রাজত্বকালকে জানায়।

তাম্রশাসন: প্রাচীন ভারতে ভূমি দান করার সময় তামার পাতে দলিল খোদাই করা হতো। তামার পাতে খোদাই করা দলিলগুলো থেকে তখনকার অর্থনৈতিক এবং রাজস্ব ব্যবস্থা পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।


খ) মুদ্রা (Numismatics)

প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধি আর রাজনৈতিক পরিবর্তন মুদ্রা দেখায়। সোনা, রূপা, তামা, সীসা আর মাটির মুদ্রা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়।

গুরুত্ব: মুদ্রা যদি রাজার মূর্তি, নাম, সাল খোদাই করা থাকে, মুদ্রা থেকে শাসনকাল জানা যায়। মুদ্রা যদি খাঁটি সোনা বা মিশ্র ধাতু হয়, মুদ্রা থেকে অর্থনৈতিক অবস্থা অনুমান করা যায়। মুদ্রা যদি কোথা থেকে পাওয়া যায়, মুদ্রা থেকে সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক পরিধি বোঝা যায়।

উল্লেখযোগ্য উদাহরণ:

কুশান মুদ্রা: কুশান রাজাদের মুদ্রায় গ্রীক, পারসিক এবং ভারতীয় দেব-দেবীর মূর্তি খোদাই করা থাকে। এই মুদ্রা কুশান রাজাদের ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সংস্কৃতির বিনিময়কে দেখায়।

গুপ্ত মুদ্রা, গুপ্ত রাজাদের সোনার মুদ্রা বা দিনার, গৌরবময় যুগের অর্থনৈতিক উন্নতি দেখায়। কিছু মুদ্রায় রাজা সমুদ্রগুপ্তকে অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে বা বীণা বাজাতে দেখা যায়। মুদ্রায় দেখা দৃশ্য রাজা ব্যক্তিগত রুচি প্রকাশ করে।


গ) স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং চিত্রকলা (Monuments, Sculptures, Paintings)

প্রাচীন যুগের ধর্ম, শিল্পকলা, প্রযুক্তি এবং সামাজিক জীবনধারা তৎকালীন স্থাপত্যে দেখা যায়। তৎকালীন শিল্পকর্মও এই সবকিছু প্রকাশ করে।

নগর সভ্যতা ও স্থাপত্য: হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর ধ্বংসাবশেষে দেখা যায় যে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের নগর পরিকল্পনা বেশ উন্নত ছিল (যেমন—পাকা রাস্তা, ড্রেনেজ সিস্টেম, শস্যাগার ও স্নানাগার)।

ধর্মীয় স্থাপত্য: সাঁচী, সারনাথ এবং ভরহুতের বৌদ্ধ স্তূপ, অজন্তা ও ইলোরার গুহা মন্দির, এবং দক্ষিণ ভারতের মহাবলীপুরম বা তাঞ্জাভুরের মন্দিরগুলো তৎকালীন ধর্মীয় পরিবর্তন এবং স্থাপত্যের সেরা উদাহরণ।

ভাস্কর্য ও চিত্রকলা:

গান্ধার ও মথুরা শিল্পরীতির ভাস্কর্য কুশান ও গুপ্তযুগের মানুষের পোশাক, অলঙ্কার ও শারীরিক গঠন দেখায়। অজন্তা গুহার দেয়ালচিত্র (Fresco) তৎকালীন সমাজের বিলাসী জীবন এবং আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ করে।


ঘ) অন্যান্য বস্তুগত অবশেষ (Pottery and Material Remains)

মাটি খুঁড়ে বের করা প্রাচীন মানুষের কঙ্কাল, হাতিয়ার, মাটির পাত্র (Pottery), খেলনা এবং পুতি ইতিহাস লিখতে সাহায্য করে। মাটি খুঁড়ে বের করা প্রাগৈতিহাসিক যুগ, লিখিত রূপ না থাকায়, জানার একমাত্র উপায়। মাটি খুঁড়ে বের করা চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র (PGW) বা উত্তরীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (NBPW) দেখলে ঐতিহাসিকরা আর্যদের বিস্তার এবং লোহার ব্যবহারিক বিবর্তনের সময় নির্ধারণ করে।


সাহিত্যিক উপাদান দুই ভাগে বিভক্ত, যথা:-

১) দেশীয় সাহিত্য

২) বিদেশীয় সাহিত্য


সাহিত্যিক উপাদান:

দেশীয় সাহিত্য (Indigenous Literature)

১. ধর্মীয় সাহিত্য:

বৈদিক ও হিন্দু সাহিত্য: আর্যদের আদি ইতিহাস, সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি জানার প্রধান উৎস চারটি বেদ (ঋক, সাম, যজুঃ, অথর্ব)। ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ, পুরাণ এবং মহান মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত প্রাচীন ভারতের সমাজ কাঠামো, বর্ণ ব্যবস্থা এবং রাজধর্মের পরিবর্তন প্রকাশ করে।

বৌদ্ধ সাহিত্য: পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক (সুত্ত, বিনয় ও অভিধম্ম পিটক)। 'জাতক'-এর গল্পগুলো খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের সাধারণ মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা স্পষ্ট করে। 'মহাবংশ' ও 'দীপবংশ' শ্রীলঙ্কার সাথে ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস বর্ণনা করে।

জৈন সাহিত্য: প্রাকৃত ভাষায় লেখা 'অঙ্গ', 'উপাঙ্গ' এবং 'কল্পসূত্র' উত্তর ভারতের আধুনিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মহাবীরের জীবনী প্রকাশ করে।

২. ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মেতর সাহিত্য:

ধর্মের বাইরে রাজনীতি, ব্যাকরণ, নাটক আর জীবনীমূলক বইগুলো ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজনীতি ও আইন: চাণক্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ মৌর্য যুগের রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং কূটনীতির একটি দলিল। মনুস্মৃতি বা যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি তৎকালীন সমাজের আইনগুলো দেখায়।

জীবনীকাব্য (Charitakavyas): রাজদরবারের কবিরা রাজাদের গুণ গাইতে গাইতে জীবনী লিখতেন। যেমন বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ (রাজা হর্ষবর্ধনের জীবনী), বিলহনের ‘বিক্রমাঙ্কদেবচরিত’ এবং সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’ (পাল বংশের ইতিহাস)।

বিশুদ্ধ ইতিহাস: কলহনের ‘রাজতরঙ্গিণী’ (১১৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) পুরনো ভারতের একমাত্র বই যা আজকের ভাষায় ‘খাঁটি ঐতিহাসিক বই’ বলা হয়। কলহনের ‘রাজতরঙ্গিণী’ কাশ্মীরের ধারাবাহিক ইতিহাস বলে।

নাটক ও সাহিত্য: কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’, ‘মেঘদূতম’ এবং শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিকম’ নাটকগুলোতে গুপ্তযুগের সমাজ, সংস্কৃতি দেখা যায়। এই নাটকগুলো সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ প্রকাশ করে।


খ) বিদেশি সাহিত্য বা পর্যটকদের বিবরণ (Foreign Accounts)

প্রাচীনকাল থেকে ব্যবসা, ধর্ম, শিক্ষা খোঁজে বহু বিদেশি ভ্রমণকারী ভারতে গিয়েছেন। ভারতীয় লেখকরা প্রায়ই ভারতীয় রাজাদের অতিরিক্ত প্রশংসা করতেন, কিন্তু বিদেশি ভ্রমণকারী দেখেছেন এবং দেখার বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে লিখেছেন।

গ্রীক ও রোমান বর্ণনা: গ্রীক দূত মেগাস্থিনিস সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের দরবারে ‘ইন্ডিকা’ লিখেছেন এবং মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ মৌর্য যুগের শাসন ও সমাজের তথ্য দেয়। অজ্ঞাত নাবিকের ‘পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি’ এবং টলেমির ‘জিওগ্রাফি’ প্রাচীন ভারতের রোমান সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্পর্কে বিশদ দেয়।

চীনা পরিব্রাজকের বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ। বৌদ্ধধর্মের টানে চীন থেকে আসা পণ্ডিতদের কাজ ঐতিহাসিক তথ্য দেয়। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়ে ফাহিয়েনের ‘ফো-কুও-কি’ এবং হর্ষবর্ধনের সময়ে হিউয়েন সাঙের ‘সি-ইউ-কি’ তৎকালীন ভারতের শিক্ষা, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্ম এবং শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট চিত্র দেয়। পরবর্তীতে ইৎসিং-এর বিবরণ থেকেও প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়।

ইসলামীয় বা আরবীয় বিবরণ: সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণের সময় আল-বেরুনী তার সঙ্গে ছিলেন। আল-বেরুনী রচনা করেছেন ‘কিতাব-উল-হিন্দ’ (অন্য নাম ‘তাহকিক-ই-হিন্দ’)। এই গ্রন্থটি একাদশ শতকের ভারতের বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন ও সমাজের একটি পরিষ্কার চিত্র দেয়।

উপসংহার:

শেষে বলা যায়, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় কোনো একক অংশই একা কাজ করে না। সাহিত্যিক অংশ ইতিহাসের হাড়ের ওপর মাংসের স্তর বসিয়ে ইতিহাসকে জীবন্ত করে, আর প্রত্নতাত্ত্বিক অংশ দৃঢ় হাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সত্যি প্রমাণ করে। এই দুই অংশের বৈজ্ঞানিক মিশ্রণই ঐতিহাসিকরা প্রাচীন ভারতের গৌরবপূর্ণ ও ধারাবাহিক ইতিহাস আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ