ভূমিকা:
পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন কিছু যুগান্তকারী দলিলের সন্ধান পাওয়া যায়, যা সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। এমনই একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, বিতর্কিত এবং সুদূরপ্রসারী দলিল হলো ১৮৩৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি পেশ করা 'মেকলে মিনিট' (Macaulay's Minute)।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আইনসচিব লর্ড টমাস ব্যাবিংটন মেকলে (Lord Thomas Babington Macaulay) কর্তৃক রচিত এই প্রস্তাবপত্রটি কেবল ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখাই নির্ধারণ করেনি, বরং এটি ভারতীয়দের মনস্তত্ত্ব, সমাজব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর এক সুগভীর সাম্রাজ্যবাদী আঘাত হেনেছিল। আধুনিক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষার যে একচ্ছত্র আধিপত্য আমরা আজও দেখতে পাই, তার আদি বীজ এই মেকলে মিনিটেই রোপণ করা হয়েছিল। আসুন, ১৫০০-এর বেশি শব্দের এই মেগা আর্টিকেলে আমরা মেকলে মিনিটের পটভূমি, এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়, ব্রিটিশদের নেপথ্য উদ্দেশ্য এবং ভারতের ইতিহাসে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: শিক্ষানীতি নিয়ে ব্রিটিশদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
মেকলে মিনিটের আবির্ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ দুই দশকের একটি গভীর আদর্শগত ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিণতি। এই পটভূমিকে মূলত দুটি অংশে ভাগ করে বোঝা প্রয়োজন:
ক) ১৮১৩ সালের সনদ আইন (Charter Act of 1813)
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন প্রথম ভারতে আসে, তখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ব্যবসা ও মুনাফা অর্জন। ভারতীয়দের শিক্ষিত করার কোনো দায়বদ্ধতা তাদের ছিল না। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডের মিশনারি এবং মানবতাবাদীদের প্রবল চাপের মুখে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮১৩ সালে একটি সনদ আইন বা চার্টার অ্যাক্ট পাস করে। এই আইনের ৪৩ নং ধারায় বলা হয় যে, কোম্পানি প্রতি বছর ভারতীয়দের সাহিত্য চর্চা, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং পণ্ডিতদের উৎসাহ দানের জন্য অন্তত ১ লক্ষ টাকা ব্যয় করবে। ভারতের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিক্ষা বিস্তারের এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
খ) প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব (Orientalist-Anglicist Controversy)
১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হলেও, এই বিপুল অর্থ ঠিক কীভাবে এবং কোন মাধ্যমে ব্যয় করা হবে, তা নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসকদের মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দেয়। এই দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য ১৮২৩ সালে 'জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন' (General Committee of Public Instruction) বা জনশিক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির ১০ জন সদস্য দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত হয়ে এক তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন:
প্রাচ্যবাদী (Orientalists): এইচ. টি. প্রিন্সেপ (H. T. Prinsep), কোলব্রুক এবং উইলসন প্রমুখ প্রাচ্যবাদীরা মনে করতেন যে, এই সরকারি অর্থ ভারতের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষা এবং সাহিত্যের উন্নয়নেই ব্যয় করা উচিত। কারণ, দেশীয় ভাষায় শিক্ষা দিলে ভারতীয়রা ব্রিটিশ শাসনকে সহজে মেনে নেবে।
পাশ্চাত্যবাদী (Anglicists): চার্লস ট্রেভেলিয়ান (Charles Trevelyan), আলেকজান্ডার ডাফ প্রমুখ পাশ্চাত্যবাদীদের মতে, প্রাচ্য শিক্ষা হলো কুসংস্কারে আচ্ছন্ন এবং আধুনিক যুগের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযোগী। তাই এই অর্থ শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সাহিত্য বিস্তারে ব্যয় করা উচিত।
টানা এক দশক ধরে এই 'প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব' চলতে থাকে, যার ফলে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা ১ লক্ষ টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় কোষাগারেই পড়ে থাকে।
২. লর্ড মেকলের আগমন এবং দ্বন্দ্বের অবসান
এই দীর্ঘস্থায়ী ও বিরক্তিকর দ্বন্দ্বের চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (Lord William Bentinck) এক চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৮৩৪ সালে আইনসচিব (Law Member) হিসেবে লর্ড টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ভারতে আসেন। মেকলে ছিলেন একজন চূড়ান্ত উদ্ধত, দাম্ভিক ইংরেজ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ সমর্থক (Eurocentric)।
লর্ড বেন্টিঙ্ক মেকলেকে জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি (President of the General Committee of Public Instruction) হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাদীদের বক্তব্য শুনে একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করার দায়িত্ব দেন। ভারতীয় সাহিত্য বা ভাষা (সংস্কৃত বা আরবি) সম্পর্কে মেকলের বিন্দুমাত্র কোনো জ্ঞান ছিল না, তা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত দম্ভের সাথে ১৮৩৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি বেন্টিঙ্কের কাছে একটি সুদীর্ঘ প্রস্তাবপত্র পেশ করেন। ভারতের ইতিহাসে এটিই 'মেকলে মিনিট' নামে অমর হয়ে আছে।
৩. মেকলে মিনিটের মূল বক্তব্য ও প্রস্তাবনাসমূহ (Key Provisions of Macaulay's Minute)
মেকলে তাঁর রিপোর্টে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক এবং অপমানজনক ভাষায় প্রাচ্য শিক্ষাকে আক্রমণ করেন এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার সপক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। মেকলে মিনিটের প্রধান প্রস্তাবনাগুলো ছিল নিম্নরূপ:
ক) প্রাচ্য শিক্ষা ও সাহিত্যের চরম অবমূল্যায়ন
মেকলে ভারতীয় ও আরবীয় সাহিত্যকে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক, যুক্তিহীন এবং কুসংস্কারে পূর্ণ বলে দাবি করেন। তাঁর এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্ধত এবং বিতর্কিত লাইনটি ছিল:
"ইউরোপের কোনো একটি ভালো লাইব্রেরির মাত্র একটি তাকের বই, সমগ্র ভারত ও আরবের সম্মিলিত দেশীয় সাহিত্যের সমকক্ষ।" (A single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia.)
তিনি সংস্কৃত বা আরবি ভাষার ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিদ্যাকে "হাস্যকর" বলে উড়িয়ে দেন।
খ) ইংরেজি মাধ্যমের পক্ষে আইনি যুক্তি
১৮১৩ সালের আইনে যে 'সাহিত্য' (Literature) এবং 'শিক্ষিত ভারতীয়' (Learned Native) শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, মেকলে তার নিজস্ব ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, 'সাহিত্য' বলতে এখানে কেবল ইংরেজি সাহিত্যকেই বোঝানো হয়েছে, সংস্কৃত বা আরবি সাহিত্য নয়। আর 'শিক্ষিত ভারতীয়' বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে যিনি জন লকের দর্শন বা মিল্টনের কবিতা সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন।
গ) শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষার স্বীকৃতি
মেকলে দৃঢ়ভাবে প্রস্তাব করেন যে, ভারতের মতো বহুভাষিক দেশে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য দর্শন শেখানোর জন্য মাতৃভাষাগুলো (বাংলা, হিন্দি ইত্যাদি) যথেষ্ট উন্নত নয়। তাই সরকারি অর্থায়নে উচ্চশিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হওয়া উচিত ইংরেজি ভাষা।
ঘ) 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' (Downward Filtration Theory)
মেকলে স্বীকার করেন যে, ব্রিটিশ সরকারের কাছে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বা পরিকাঠামো নেই যার মাধ্যমে ভারতের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করা সম্ভব। তাই তিনি প্রস্তাব করেন যে, সরকারি অর্থে কেবল সমাজের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের একটি ক্ষুদ্র অংশকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করা হবে। পরবর্তীকালে এই শিক্ষিত শ্রেণি থেকে আধুনিক জ্ঞান ধীরে ধীরে দেশীয় ভাষার মাধ্যমে সমাজের নিচুতলার সাধারণ মানুষের মধ্যে 'চুঁইয়ে পড়বে' বা পরিশ্রুত হয়ে নেমে আসবে।
ঙ) দোভাষী বা মধ্যস্থতাকারী শ্রেণি তৈরি
মেকলে মিনিটের সবচেয়ে গভীর ও ভয়ংকর উদ্দেশ্যটি লুকিয়ে ছিল তাঁর একটি লাইনে। তিনি চেয়েছিলেন এমন একদল মানুষ তৈরি করতে, যারা ব্রিটিশ শাসক এবং ভারতীয় প্রজার মধ্যে সেতুবন্ধন করবে। মেকলের ভাষায়:
"আমাদের বর্তমানে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করতে হবে, যারা আমাদের (ইংরেজদের) এবং আমাদের শাসিত কোটি কোটি ভারতীয়দের মধ্যে দোভাষীর কাজ করবে। এই শ্রেণিটি রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তায় হবে সম্পূর্ণ ইংরেজ।" (Indians in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect.)
চ) প্রাচ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুদান বন্ধ
মেকলে প্রস্তাব দেন যে, সংস্কৃত কলেজ বা কলকাতা মাদ্রাসার মতো প্রাচ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া উচিত, অথবা অন্ততপক্ষে সেখানে প্রাচ্য ভাষায় বই ছাপানো বা অনুবাদ করার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা উচিত।
৪. লর্ড বেন্টিঙ্কের অনুমোদন: ১৮৩৫ সালের সরকারি শিক্ষানীতি
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক মেকলের এই বলিষ্ঠ যুক্তি এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার সপক্ষে দেওয়া প্রস্তাবে অত্যন্ত প্রভাবিত হন। তিনি প্রাচ্যবাদীদের সমস্ত আপত্তি খারিজ করে দেন এবং ১৮৩৫ সালের ৭ই মার্চ একটি সরকারি নির্দেশিকা (Government Resolution) জারি করে মেকলে মিনিটকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেন।
এই নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে বলা হয়:
১. ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হবে ভারতে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার ঘটানো।
২. শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা সমস্ত সরকারি অর্থ এখন থেকে কেবলমাত্র ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও কলেজগুলোর জন্যই ব্যয় করা হবে।
৩. প্রাচ্য শিক্ষার বই ছাপানোর কাজে আর কোনো সরকারি অনুদান দেওয়া হবে না।
এই দিনটি থেকেই ভারতে সরকারিভাবে ইংরেজি শিক্ষার যুগ শুরু হয় এবং প্রাচ্য শিক্ষার কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হয়।
৫. মেকলে মিনিটের নেপথ্যে ব্রিটিশদের গোপন উদ্দেশ্য
লর্ড মেকলে বা ব্রিটিশ সরকার যে ভারতীয়দের প্রতি গভীর ভালোবাসায় আধুনিক শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, তা একেবারেই নয়। এই নীতির পেছনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বেশ কিছু গভীর, সুচতুর ও স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্য লুকিয়ে ছিল:
প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন (সস্তা কেরানি তৈরি): ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখন ভারতে দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল। এই বিশাল সাম্রাজ্যের প্রশাসন, আদালত এবং ব্যবসা চালানোর জন্য প্রচুর সংখ্যক অধস্তন কর্মী বা কেরানির প্রয়োজন ছিল। ইংল্যান্ড থেকে ইংরেজ কর্মীদের ভারতে এনে চাকরি দেওয়া ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই মেকলে চাইলেন এমন একদল শিক্ষিত ভারতীয় তৈরি করতে, যারা ইংরেজি জানবে এবং অত্যন্ত সস্তায় ব্রিটিশ প্রশাসনের কেরানি হিসেবে কাজ করবে।
সাম্রাজ্যের অন্ধ অনুগত শ্রেণি তৈরি: ব্রিটিশরা চেয়েছিল ইংরেজি সাহিত্য, পাশ্চাত্য দর্শন এবং শেক্সপিয়রের নাটকের প্রভাবে এমন একটি 'বাবু শ্রেণি' (Babu Class) তৈরি করতে, যারা নিজেদের ভারতীয় ঐতিহ্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হবে এবং মনেপ্রাণে ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের জন্য 'ঈশ্বরের আশীর্বাদ' বলে মনে করবে। এই শ্রেণিটি ব্রিটিশদের অন্ধ অনুগত হবে এবং কোনোদিন ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ করবে না।
ব্রিটিশ পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ: মেকলে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে হিসাব করেছিলেন যে, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়রা যখন রুচি ও অভ্যাসে 'ইংরেজ' হয়ে উঠবে, তখন তারা ধুতি-পাঞ্জাবির বদলে ব্রিটিশ পোশাক, ব্রিটিশ আসবাবপত্র এবং ইউরোপীয় বিলাসবহুল জিনিসপত্র ব্যবহার করতে শুরু করবে। এর ফলে ভারতে ব্রিটিশ শিল্প-কারখানায় তৈরি পণ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে।
খ্রিস্টধর্মের প্রসার: আলেকজান্ডার ডাফ-এর মতো মিশনারিরা মেকলের নীতিকে সমর্থন করেছিলেন কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষার আলো ভারতীয়দের মনে হিন্দু বা ইসলাম ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করবে, যার ফলে খুব সহজেই তাদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা যাবে।
৬. মেকলে মিনিটের সুদূরপ্রসারী প্রভাব (নেতিবাচক ও ইতিবাচক)
মেকলে মিনিট ভারতের সমাজ ও ইতিহাসে এক অদ্ভুত দ্বৈত প্রভাব ফেলেছিল। এর কিছু প্রভাব ছিল মারাত্মক ক্ষতিকর, আবার কিছু প্রভাব (অপ্রত্যাশিতভাবে) ভারতের মুক্তির পথও প্রশস্ত করেছিল।
ক) ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব (Negative Impacts):
১. গণশিক্ষার চরম অবহেলা ও ধ্বংসসাধন: চুঁইয়ে পড়া নীতির ফলে ভারতের বিশাল জনসমাজ ঘোর অন্ধকারের মধ্যেই থেকে যায়। সরকারি অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের হাজার হাজার প্রাচীন পাঠশালা, টোল এবং মাদ্রাসাগুলো অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের নিজস্ব গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
২. মাতৃভাষার চরম অবহেলা: সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে ইংরেজি স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলা, হিন্দি বা অন্যান্য মাতৃভাষার চর্চা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। "ইংরেজি না জানলে কোনো চাকরি জুটবে না"—এই মানসিকতা ভারতীয়দের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে।
৩. সমাজে ভয়ংকর শ্রেণি-বৈষম্য: এই নীতি ভারতীয় সমাজে এক ভয়ানক বিভেদের প্রাচীর তৈরি করে। সমাজ দুটো স্পষ্ট ভাগে ভাগ হয়ে যায়—একদিকে মুষ্টিমেয় ইংরেজি শিক্ষিত 'বাবু' বা উচ্চবিত্ত শ্রেণি, আর অন্যদিকে কোটি কোটি নিরক্ষর, দরিদ্র সাধারণ মানুষ। শিক্ষিত শ্রেণি সাধারণ মানুষকে অশিক্ষিত বলে অবজ্ঞা করতে শুরু করে, যা এক নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক দাসত্বের জন্ম দেয়।
খ) অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব (Positive Impacts):
ব্রিটিশরা যে উদ্দেশ্যে এই নীতি চালু করেছিল, দীর্ঘমেয়াদে তা তাদের বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
১. আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ও নবজাগরণ: ইংরেজি শিক্ষার ফলে ভারতে এক নতুন বুদ্ধিদীপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়। রাজা রামমোহন রায় (যিনি আগে থেকেই ইংরেজি শিক্ষার সপক্ষে ছিলেন), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ—এই শিক্ষিত শ্রেণিতেই আবির্ভূত হন, যাঁরা ভারতের 'নবজাগরণ' বা রেনেসাঁসের নেতৃত্ব দেন।
২. সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ঐক্য: সমগ্র ভারতের শিক্ষিত মানুষদের একটি সাধারণ ভাষা হয়ে ওঠে ইংরেজি। এর ফলে বাংলা, মাদ্রাজ বা পাঞ্জাবের নেতারা একে অপরের সাথে সহজেই যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। এই যোগাযোগের চূড়ান্ত ফলশ্রুতি ছিল ১৮৮৫ সালে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' প্রতিষ্ঠা।
৩. জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার স্পৃহা: মেকলে ভেবেছিলেন ইংরেজি শিক্ষিতরা ব্রিটিশদের গোলাম হবে। কিন্তু রুশো, ভলতেয়ার, জন স্টুয়ার্ট মিল কিংবা ম্যাজিনি-র মতো পাশ্চাত্য দার্শনিকদের স্বাধীনতা, সাম্য ও গণতন্ত্রের বাণী পড়ে ভারতীয় যুবকদের চোখ খুলে যায়। এই ইংরেজি শিক্ষিত নেতারাই (যেমন—সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, সুভাষচন্দ্র বসু) পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটান।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ১৮৩৫ সালের মেকলে মিনিট ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এক অত্যন্ত সুচতুর, বর্ণবাদী এবং অহংকারী পদক্ষেপ। এটি ছিল ভারতের প্রাচীন জ্ঞানভাণ্ডার, সাহিত্য এবং পরম্পরার ওপর এক সরাসরি আক্রমণ। লর্ড মেকলে তাঁর দম্ভের বশবর্তী হয়ে ভারতীয়দের মন ও সংস্কৃতিকে পরাধীন করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু ইতিহাসের পরম পরিহাস এই যে, মেকলে ভারতীয়দের হাতে ইংরেজি ভাষার যে শৃঙ্খল পরিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে ভারতীয়রা সেই ইংরেজি ভাষার জ্ঞান এবং পাশ্চাত্য দর্শনকে হাতিয়ার করেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। আধুনিক ভারতের সমাজ, রাজনীতি, বিজ্ঞান সাধনা এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের বর্তমান উপস্থিতির পেছনে মেকলে মিনিটের যে একটি পরোক্ষ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসের এমন এক 'প্রয়োজনীয় অমঙ্গল' (Necessary
Evil), যা ধ্বংসের মধ্যে দিয়েও এক নতুন সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত করেছিল।


0 মন্তব্যসমূহ