ভূমিকা:
ভারতের আধুনিক শিক্ষার ইতিহাসে ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল একটি যুগান্তকারী সময়। ব্রিটিশ শাসনাধীনে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হওয়া প্রয়োজন ছিল। এই উদ্দেশ্যেই ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় ভারতের প্রথম শিক্ষা কমিশন, যা ইতিহাসে 'হান্টার কমিশন' (Hunter Commission 1882) নামে সুপরিচিত। লর্ড রিপনের শাসনকালে গঠিত এই কমিশন মূলত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে যে যুগান্তকারী সুপারিশ করেছিল, তা আজও ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত হয়। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা হান্টার কমিশনের পটভূমি, গঠন, উদ্দেশ্য, গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ এবং ভারতীয় শিক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
হান্টার কমিশন গঠনের পটভূমি (Background of Hunter Commission)
হান্টার কমিশন গঠনের পেছনে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত 'উডের ডেসপ্যাচ' (Wood's Despatch)-কে ভারতীয় শিক্ষার 'ম্যাগনাকার্টা' বা মহাসনদ বলা হয়। উডের ডেসপ্যাচে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল এবং দেশজ শিক্ষার উন্নতির জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, উডের ডেসপ্যাচের এই মহৎ ভাবধারাকে অবহেলা করে সরকার এবং প্রশাসন প্রাথমিক ও দেশজ শিক্ষার ওপর তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়নি। এর পরিবর্তে সমস্ত মনোযোগ এবং সরকারি অর্থ ব্যয় করা হতে থাকে উচ্চশিক্ষা এবং শহরের সরকারি স্কুল-কলেজগুলির পেছনে। এর ফলে সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষ শিক্ষার সুযোগ পেলেও, সাধারণ মানুষের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি একেবারেই হয়নি। গ্রামে-গঞ্জে দেশীয় বিদ্যালয়গুলি অর্থাভাবে ধুঁকতে থাকে। মিশনারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিও সরকারের এই নীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করে। এমতাবস্থায়, দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসার এবং উডের ডেসপ্যাচের নীতিগুলি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা পর্যালোচনা করার জন্য সরকার একটি শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
হান্টার কমিশন গঠন (Formation of the Hunter Commission)
শিক্ষাক্ষেত্রে এই চরম বৈষম্য এবং অরাজকতার অবসান ঘটাতে তৎকালীন উদারপন্থী ভাইসরয় লর্ড রিপন (Lord Ripon) ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ৩রা ফেব্রুয়ারি একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এটিই ভারতের ইতিহাসে প্রথম "ভারতীয় শিক্ষা কমিশন” (Indian Education Commission) নামে পরিচিত।
এই কমিশনের সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তৎকালীন প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রশাসক ও পরিসংখ্যানবিদ স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টার (Sir William Wilson Hunter)। তাঁর নামানুসারেই এই কমিশনকে "হান্টার কমিশন” বলা হয়। এই কমিশনে মোট ২০ জন সদস্য ছিলেন, যার মধ্যে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো।
কমিশনের উল্লেখযোগ্য ভারতীয় সদস্যগণ হলেন:
আনন্দমোহন বসু
স্যার সৈয়দ আহমদ খান
ভূদেব মুখোপাধ্যায়
কে. টি. তেলাং (কাশীনাথ এম্বক তেলাং)
মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর প্রমুখ।
এই কমিশনকে মূলত প্রাথমিক শিক্ষা ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ বিষয়ে বিশেষভাবে বিচার-বিবেচনা করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।
হান্টার কমিশনের রিপোর্ট পেশ (Submission of the Report)
হান্টার কমিশন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষের মতামত সংগ্রহ করে। প্রায় ১৯৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করার পর, ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে কমিশন তাদের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করে।
এটি ছিল ২২২টি প্রস্তাব সংবলিত প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার একটি সুবৃহৎ ও ঐতিহাসিক রিপোর্ট। এই রিপোর্টে ভারতের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা, কোম্পানি ও ব্রিটিশ শাসনে শিক্ষার অগ্রগতি, শিক্ষার বিভিন্ন দিক, প্রাথমিক শিক্ষার চরম অনগ্রসরতা, মাতৃভাষার অবহেলা প্রভৃতি সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পেশ করা হয়।
হান্টার কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ (Objectives of the Hunter Commission)
হান্টার কমিশন গঠনের পেছনে সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল। সেগুলি হলো:
১) উডের ডেসপ্যাচের মূল্যায়ন: ১৮৫৪ সালের উডের ডেসপ্যাচের সুপারিশগুলি কার্যকর করার পর শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা তদন্ত করা এবং এর ব্যর্থতার কারণগুলি খুঁজে বের করা।
২) প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার: দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং এর উন্নতির জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
৩) উচ্চ শিক্ষার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ: ভারতে উচ্চ শিক্ষার অগ্রগতি কতটা হয়েছে এবং সেখানে সরকারি অনুদান কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা।
৪) সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মূল্যায়ন: শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি প্রয়াস, ভারতীয় বেসরকারি উদ্যোগ এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের ভূমিকার গুরুত্ব নির্ণয় করা।
৫) বিশেষ শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিপাত: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি নারীশিক্ষা, মুসলিম শিক্ষা এবং অনুন্নত সম্প্রদায়ের শিক্ষার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করা।
হান্টার কমিশনের ঐতিহাসিক সুপারিশসমূহ (Recommendations of the Hunter Commission)
হান্টার কমিশন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেওয়ার জন্য একাধিক যুগান্তকারী সুপারিশ করেছিল। নিম্নে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষায় কমিশনের সুপারিশগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১) দেশজ বিদ্যালয় ও শিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন
কমিশন মনে করত যে, দেশজ বিদ্যালয়গুলি ভারতীয় শিক্ষার মূল ভিত্তি। তাই দেশজ বিদ্যালয়গুলিকে সরকারি অনুমোদন দেওয়া, এদের সম্প্রসারণ করা এবং শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়। এছাড়া ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়।
২) প্রাথমিক শিক্ষা (Primary Education)
কমিশনের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা হলো জনশিক্ষা প্রসারের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে কমিশনের সুপারিশগুলি ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ:
শিক্ষার মূল লক্ষ্য: দেশের জনসাধারণের জন্য ন্যূনতম ও ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
পাঠক্রম: শিক্ষার্থীরা যাতে দৈনন্দিন জীবনে শিক্ষা কাজে লাগাতে পারে, তার জন্য পাঠক্রমে দেশজ গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, কৃষিকাজ, হিসাবরক্ষণ, স্বাস্থ্যবিদ্যা ও শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শিক্ষার মাধ্যম: প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে সম্পূর্ণভাবে মাতৃভাষা।
পরিচালনার দায়িত্ব: প্রাথমিক শিক্ষার পরিচালনার দায়িত্ব সরাসরি সরকারের হাত থেকে সরিয়ে নবগঠিত স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির (যেমন- জেলা বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি) হাতে অর্পণ করতে হবে।
অর্থব্যবস্থা: স্থানীয় কর বা সেস (Cess)-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ শুধুমাত্র প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে।
পরিদর্শক নিয়োগ: শিক্ষার মান বজায় রাখতে বিদ্যালয় পরিদর্শক (Inspector of Schools) নিয়োগ করতে হবে।
অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩) মাধ্যমিক শিক্ষা (Secondary Education)
মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পর্কে কমিশনের সুপারিশগুলি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক ছিল:
বেসরকারিকরণ: মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে এবং বেসরকারি বিদ্যালয়গুলিকে অনুদান (Grants-in-Aid) দিয়ে সমান সুযোগ দান করতে হবে।
মডেল স্কুল: বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি 'মডেল বিদ্যালয়' স্থাপন করতে হবে।
শিক্ষার মাধ্যম: মাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষা এবং ইংরেজি উভয় ভাষার মাধ্যমেই শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকবে।
কোর্স বিভাজন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ): মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উচ্চস্তরে পাঠক্রমকে দুটি শাখায় ভাগ করার কথা বলা হয়—
"A" কোর্স (A-Course): এটি হলো সাহিত্য ও বিজ্ঞান নির্ভর সাধারণধর্মী শিক্ষা, যা মূলত যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চায় তাদের জন্য।
"B" কোর্স (B-Course): এটি হলো বৃত্তিমুখী ও কারিগরি শিক্ষা (Vocational Education), যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করবে।
৪) উচ্চশিক্ষা (Higher Education)
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকার ধীরে ধীরে তার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও প্রচেষ্টা বন্ধ করবে এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করবে।
বেসরকারি উদ্যোগে মহাবিদ্যালয় (College) স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সাহায্য বা অনুদান দানের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এই অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তারোপের কথা বলা হয়েছে।
সরকারি পরিচালনায় কিছু আদর্শ বা মডেল কলেজ স্থাপন করা যেতে পারে।
সকল দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্রদের জন্য পর্যাপ্ত বৃত্তি বা স্কলারশিপ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাত্রায় আর্থিক সহায়তা করতে হবে।
৫) নারী শিক্ষা (Women's Education)
তৎকালীন সমাজে নারী শিক্ষার চরম দুরবস্থা লক্ষ্য করে কমিশন কিছু বিশেষ সুপারিশ করে:
নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য আরও বেশি করে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।
নারী শিক্ষার জন্য সহজ ও উপযোগী পৃথক পাঠক্রম তৈরি করতে হবে এবং মেয়েদের উৎসাহিত করতে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
বালিকা বিদ্যালয়গুলি পরিদর্শনের জন্য মহিলা পরিদর্শক (Lady Inspectress) নিয়োগ করতে হবে।
নারী শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণের জন্য পৃথকভাবে নর্মাল ট্রেনিং স্কুল (Normal Training School) স্থাপন করতে হবে।
৬) মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থা (Muslim Education)
কমিশন লক্ষ্য করে যে, আধুনিক ইংরেজি শিক্ষায় মুসলিম সম্প্রদায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। তাই মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের জন্য পৃথক দেশজ ও প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। তাদের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থাও করতে বলা হয়।
৭) নৈতিক শিক্ষা (Moral Education)
শিক্ষার সকল স্তরে শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের জন্য নৈতিক শিক্ষাদানের (Moral Education) ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়।
বিদ্যার্থীদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিশেষ পাঠ্যপুস্তক রচনায় উৎসাহ দানের কথা বলা হয়, তবে তা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ওপর ভিত্তি করে হবে না।
৮) শিক্ষক-শিক্ষণ (Teacher Training)
শিক্ষকদের গুণমান বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষণ (Teacher Training) প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে।
শিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা যাতে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে শিক্ষকতা করতে পারেন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
৯) নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন (Night Schools)
যাঁরা দিনের বেলা কাজের জন্য স্কুলে যেতে পারেন না, সেই সব বয়স্ক ব্যক্তি ও শ্রমিকদের শিক্ষাদানের জন্য কিছু কিছু নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। এটি বয়স্ক শিক্ষার (Adult Education) ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ ছিল।
১০) ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ
কমিশন সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত কোনো বিদ্যালয়েই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া যাবে না। সকল মানুষের শিক্ষার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি (Secularism) অনুসরণের সুপারিশ করা হয়।
হান্টার কমিশনের গুরুত্ব (Importance of Hunter Commission)
ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে হান্টার কমিশনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই কমিশনের হাত ধরেই ভারতীয় শিক্ষায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়:
১) বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বায়ত্তশাসন: শিক্ষাব্যবস্থার ওপর থেকে সরকারের একচেটিয়া হস্তক্ষেপ হ্রাস করার সুপারিশ শিক্ষাক্ষেত্রে এক শুভ সূচনার ইঙ্গিত বহন করে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলিকে (Local Boards) প্রাথমিক শিক্ষার ভার অর্পণ করার ফলে শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে।
২) বেসরকারি উদ্যোগের বিকাশ: উচ্চ এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় সরকারি নিয়ন্ত্রণের বদলে বেসরকারি উদ্যোগকে সাহায্য করার ফলে দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি স্কুল ও কলেজ গড়ে ওঠে, যা শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা নেয়।
৩) বৃত্তিমুখী শিক্ষার সূচনা: মাধ্যমিক স্তরে 'B' কোর্সের প্রবর্তনের মাধ্যমে ভারতে প্রথম কারিগরি ও বৃত্তিমুখী শিক্ষার বীজ বপন করা হয়েছিল।
৪) ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসার: মিশনারিদের প্রভাব ক্ষুণ্ণ করে শিক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ ভারতীয় সমাজের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং সমর্থনযোগ্য ছিল।
হান্টার কমিশনের সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা:
হান্টার কমিশন ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় শিক্ষা কমিশন হিসেবে যুগান্তকারী হলেও, এর কিছু উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতাও পরিলক্ষিত হয়:
১) বাস্তবায়নের অস্পষ্টতা: কমিশন তার সুপারিশের মধ্য দিয়ে শিক্ষানীতি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেও, সেই সুপারিশসমূহ বাস্তবে কীভাবে কার্যকরী হবে সে সম্পর্কে বিশেষ কোনো সুস্পষ্ট পথনির্দেশিকা দেয়নি।
২) অর্থসংস্থানের অভাব: প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় বোর্ডগুলির হাতে তুলে দেওয়া হলেও, তাদের আয়ের উৎস ছিল অত্যন্ত সীমিত। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থসংস্থান সম্পর্কে অস্পষ্টতা ছিল, যার ফলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার বহুলাংশে ব্যাহত হয়।
৩) বাধ্যতামূলক শিক্ষার অভাব: তৎকালীন ইংল্যান্ডে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হলেও, হান্টার কমিশন ভারতে প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করতে ব্যর্থ হয়।
৪) সাম্প্রদায়িকতার বীজ: মুসলিমদের জন্য পৃথক ও বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সমাজে বিভাজন এবং সাম্প্রদায়িকতাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।
৫) ফলাফলের ভিত্তিতে অনুদান: কমিশন পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলিকে অনুদান (Payment by results) দেওয়ার যে প্রথা চালু করেছিল, তা শিক্ষাব্যবস্থায় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে এবং শিক্ষার প্রকৃত মানোন্নয়নের পরিপন্থী ছিল।
উপসংহার:
কমিশনের সুপারিশের মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, ভারতের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। হান্টার কমিশন প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য যেমন সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিল, তেমনি প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমুখী ও কারিগরি শিক্ষাকে (Vocational Education) মূলধারায় আনয়নের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। তৎকালীন সময়ে ওই শিক্ষা বিশেষ সফলতা না পেলেও, আজকের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় (যেমন National Education Policy 2020) তার সুস্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। নারী শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে তাঁদের চিন্তাধারা ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাই আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, আধুনিক ভারতের শিক্ষা উন্নয়নে হান্টার কমিশনের অবদান এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবেই গণ্য হবে।


0 মন্তব্যসমূহ