শচীন্দ্র প্রসাদ বসু: ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকার রূপকার ও অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি

শচীন্দ্র প্রসাদ বসু বুকে ধরে আছেন গোপন পুস্তিকা অনুশীলন সমিতি।

ভূমিকা:

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক সুদীর্ঘ এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রয়েছে। এই ইতিহাস কেবল কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ও পরিচিত নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই দীর্ঘ সংগ্রামের নেপথ্যে এমন অসংখ্য নায়ক রয়েছেন, যাঁদের অসীম আত্মত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং অসামান্য অবদান ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা অর্জন হয়তো আরও অনেক বেশি কঠিন ও বিলম্বিত হতো। এমনই একজন প্রায় বিস্মৃত অথচ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন শচীন্দ্র প্রসাদ বসু (Sachindra Prasad Bose)।

ইতিহাসের পাতায় তিনি মূলত ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব প্রদান, স্বৈরাচারী ব্রিটিশ আইনের বিরুদ্ধে 'অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি' (Anti-Circular Society) গঠন এবং সর্বোপরি ভারতের বুকে সর্বপ্রথম জাতীয় পতাকার (The Calcutta Flag, 1906) নকশা তৈরি ও উত্তোলনের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। পরাধীন ভারতের এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিকের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়, তাঁর আপসহীন সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদের বিকাশে তাঁর ভূমিকা এবং ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।


১. প্রারম্ভিক জীবন, শিক্ষা ও রাজনৈতিক আদর্শের উন্মেষ:

শচীন্দ্র প্রসাদ বসু ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অবিভক্ত বাংলার এক অত্যন্ত মেধাবী, তেজস্বী এবং প্রতিবাদী ছাত্রনেতা। তিনি কলকাতার বিখ্যাত রিপন কলেজের (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) ছাত্র ছিলেন। সেই সময়ে বাংলার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গগন জুড়ে বিরাজ করছেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর বাগ্মিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আপামর ভারতবাসীকে মুগ্ধ করে রেখেছিল। সুরেন্দ্রনাথকে তখন 'রাষ্ট্রগুরু' বা 'মুকুটহীন রাজা' বলা হতো।

তরুণ শচীন্দ্র প্রসাদ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শ, তাঁর প্রখর দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক দর্শনের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। রিপন কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি দেশের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন হয়ে ওঠেন। তিনি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রখ্যাত সাংবাদিক ও জাতীয়তাবাদী নেতা কৃষ্ণকুমার মিত্রের (যিনি 'সঞ্জীবনী' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন) অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। প্রবীণ নেতাদের সান্নিধ্য এবং নিজস্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞার গুণে খুব অল্প বয়সেই তিনি নিজেকে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।


২. লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫):

শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও যুগান্তকারী মোড় আসে ১৯০৫ সালে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন (Lord Curzon) ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ধ্বংস করতে এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে চিরস্থায়ী ফাটল ধরাতে ১৯০৫ সালের ১৯শে জুলাই ঐতিহাসিক 'বঙ্গভঙ্গ' (Partition of Bengal) ঘোষণা করেন, যা ১৬ই অক্টোবর কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল যে, বাংলা একটি বিশাল প্রদেশ এবং প্রশাসনিক সুবিধার্থেই একে ভাগ করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলার শিক্ষিত সমাজ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল যে, এটি হলো ব্রিটিশদের কুখ্যাত 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule) নীতির এক চরম ও নগ্ন প্রকাশ।

লর্ড কার্জনের এই ঘোষণায় সমগ্র বাংলা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলার যুব ও ছাত্রসমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ নেতাদের ডাকে সারা বাংলা জুড়ে শুরু হয় ঐতিহাসিক 'স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন'। ছাত্ররা ব্রিটিশদের পরিচালিত স্কুল-কলেজ বয়কট করে, বিলিতি (বিদেশি) দ্রব্য বর্জন করে এবং 'স্বদেশী' বা দেশীয় শিল্পের প্রসারের শপথ গ্রহণ করে।

শচীন্দ্র প্রসাদ বসু এই সময় রিপন কলেজের ছাত্র হিসেবে এই সুবিশাল ছাত্র আন্দোলনের একেবারে সামনের সারিতে এসে দাঁড়ান। তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা, নির্ভীক মানসিকতা এবং অতুলনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা খুব দ্রুত তাঁকে বাংলার ছাত্রসমাজের অন্যতম প্রধান মুখপত্রে পরিণত করে। তিনি ছাত্রদের সংগঠিত করে গ্রামে-গঞ্জে স্বদেশী প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।


৩. ব্রিটিশদের চরম দমননীতি (কুখ্যাত কার্লাইল সার্কুলার):

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে ছাত্রদের এই স্বতঃস্ফূর্ত এবং বিপুল অংশগ্রহণ দেখে ব্রিটিশ সরকার চরম আতঙ্কিত ও বিচলিত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে, তরুণ ছাত্রসমাজই হলো এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। ছাত্রদের এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য ১৯০৫ সালের ১০ই অক্টোবর ব্রিটিশ সরকারের মুখ্যসচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল (R. W. Carlyle) এক চরম দমনমূলক, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী নির্দেশিকা জারি করেন, যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে 'কার্লাইল সার্কুলার' (Carlyle Circular) নামে কুখ্যাত।
এই সার্কুলারের মাধ্যমে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা ও ছাত্রদের ওপর এক ভয়ংকর খাঁড়া নামিয়ে আনা হয়। সার্কুলারে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়:

  কোনো সরকারি বা সরকার অনুমোদিত স্কুল বা কলেজের ছাত্র কোনো ধরনের রাজনৈতিক সভা, সমিতি, পিকেটিং বা মিছিলে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

  রাস্তায় বা জনসমক্ষে 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ বলে গণ্য হবে।

  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নির্দেশ দেওয়া হয় যে, তাঁরা যেন তাঁদের ছাত্রদের রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখেন।

  যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র বা শিক্ষক এই নির্দেশ অমান্য করে, তবে সেই স্কুল বা কলেজের সরকারি অনুদান (Grant-in-aid), স্কলারশিপ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি (Affiliation) অবিলম্বে বাতিল করা হবে।

  অবাধ্য ছাত্রদের স্কুল থেকে চিরতরে বহিষ্কার (Rusticate) করা হবে এবং ভবিষ্যতে তাদের কোনো সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে না।

ব্রিটিশ প্রশাসনের ধারণা ছিল, শিক্ষাজীবন ধ্বংস হওয়ার ভয় এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের ভীতি দেখালে ছাত্ররা আন্দোলন থেকে পিছু হটবে এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন আপনা থেকেই দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে এর ফল হলো ঠিক তার উল্টো।


৪. ছাত্রসমাজের প্রতিরোধ ও 'অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি' গঠন:

কার্লাইল সার্কুলারের হুমকিতে বাংলার ছাত্রসমাজ ভয় পাওয়ার বদলে আরও বেশি বিদ্রোহী ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। এই স্বৈরাচারী নির্দেশের কাছে মাথা নত না করে তার সরাসরি পালটা জবাব দেওয়ার জন্য তরুণ ছাত্রনেতা শচীন্দ্র প্রসাদ বসু এক ঐতিহাসিক ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

১৯০৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর, কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে (বর্তমান বিদ্যাসাগর উদ্যান) এক বিশাল ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা কৃষ্ণকুমার মিত্রের সভাপতিত্বে এবং শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও রূপরেখায় গঠিত হয় 'অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি' (Anti-Circular Society)। কৃষ্ণকুমার মিত্র এই সংগঠনের সভাপতি হন এবং তরুণ শচীন্দ্র প্রসাদ বসু স্বয়ং এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক (General Secretary) নির্বাচিত হন।

এই অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি কেবল একটি প্রতিবাদী মঞ্চ ছিল না, এটি ছিল একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও কার্যকরী সংগঠন। এর প্রধান কার্যাবলী ছিল বহুমুখী:

  বিকল্প জাতীয় শিক্ষার ব্যবস্থা: যে সমস্ত ছাত্র কার্লাইল সার্কুলার অমান্য করার কারণে স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল এবং জরিমানা দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয় তার জন্য বিকল্প জাতীয় শিক্ষার (National Education) ব্যবস্থা করা। এই ভাবনা থেকেই পরবর্তীতে 'জাতীয় শিক্ষা পরিষদ' বা National Council of Education (যাই আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়) গড়ে তোলার ভিত্তি প্রস্তুত হয়েছিল।

  স্বদেশী প্রচার ও বিদেশি দ্রব্য বর্জন: ছাত্রদের ছোট ছোট দল গঠন করে বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিদেশি দ্রব্য বর্জনের (Boycott) বার্তা প্রচার করা। তাঁরা দেশীয় চরকায় বোনা কাপড়, সাবান, দেশলাই এবং অন্যান্য স্বদেশী দ্রব্যের বিক্রি বাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।

  বন্দে মাতরম গানের প্রচার: ব্রিটিশদের নিষেধাজ্ঞাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাস্তায় রাস্তায় নির্ভয়ে 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দিয়ে মিছিল করা।

  স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন: সভা-সমিতিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিচার্জের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য একটি শক্তিশালী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করা হয়।

শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর সুযোগ্য নেতৃত্বে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি অল্পদিনের মধ্যেই অবিভক্ত বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী, সুসংগঠিত এবং জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয় এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনকে এক অদম্য রূপ দান করে।


৫. পার্সিবাগান স্কোয়ার এবং ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকার জন্ম (The Calcutta Flag, 1906):

শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময়, চিরস্থায়ী এবং ঐতিহাসিক কীর্তিটি হলো পরাধীন ভারতের বুকে প্রথম জাতীয় পতাকার (National Flag of India) নকশা তৈরি এবং জনসমক্ষে তা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পর এক বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছিল। বঙ্গভঙ্গের প্রথম বার্ষিকী (Boycott Day) পালন করার জন্য এবং স্বদেশী আন্দোলনকে আরও তীব্র ও সংহত করতে ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট কলকাতার পার্সিবাগান স্কোয়ারে (বর্তমানে যা আপার সার্কুলার রোড বা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোডের পাশে সাধক রামপ্রসাদ উদ্যান বা গ্রিয়ার পার্ক নামে পরিচিত) এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল।

এই জনসভার প্রস্তুতি চলাকালীন শচীন্দ্র প্রসাদ বসু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুকুমার মিত্র (যিনি ছিলেন কৃষ্ণকুমার মিত্রের পুত্র এবং অরবিন্দ ঘোষের আত্মীয়) একটি গভীর রাজনৈতিক অভাব অনুভব করেন। তাঁরা বুঝতে পারেন যে, একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ জাতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো তার নিজস্ব একটি জাতীয় পতাকা। কোনো দেশের আত্মপরিচয় তার পতাকার মাধ্যমেই ফুটে ওঠে। ব্রিটিশদের পরাধীনতার প্রতীক 'ইউনিয়ন জ্যাক'-এর নিচে দাঁড়িয়ে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা বা স্বরাজের আন্দোলন করা কিছুতেই সম্ভব নয় এবং তা মানানসইও নয়।

এই তীব্র জাতীয়তাবাদী ভাবনা থেকেই তাঁরা একটি পতাকার নকশা তৈরি করেন, যা ভারতের ইতিহাসে 'ক্যালকাটা ফ্ল্যাগ' (Calcutta Flag) বা 'স্বদেশী পতাকা' বা 'বন্দে মাতরম পতাকা' নামে অমর হয়ে আছে।


প্রথম পতাকার নকশা ও গভীর তাৎপর্য:

শচীন্দ্র প্রসাদ বসু রচিত এই পতাকায় তিনটি সমান অনুভূমিক (Horizontal) রঙের ব্যান্ড বা স্ট্রাইপ ছিল। প্রতিটি রঙের এবং প্রতীকের একটি গভীর জাতীয়তাবাদী অর্থ ছিল:

  ওপরের অংশ (সবুজ): পতাকার একেবারে ওপরের ব্যান্ডটি ছিল সবুজ রঙের। এই সবুজ অংশের ওপর আটটি অর্ধ-প্রস্ফুটিত সাদা পদ্মফুল (Lotus) আঁকা ছিল। এই আটটি পদ্ম তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আটটি প্রদেশকে (Provinces) নির্দেশ করত। পদ্ম ভারতের পবিত্রতা ও প্রাচীন ঐতিহ্যেরও প্রতীক।

  মাঝের অংশ (হলুদ): মাঝখানের ব্যান্ডটি ছিল গাঢ় হলুদ বা সোনালি রঙের। এই হলুদ অংশের ঠিক মাঝখানে গাঢ় নীল রঙের দেবনাগরী হরফে বড় বড় করে লেখা ছিল— "वन्दे मातरम्" (বন্দে মাতরম)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই কালজয়ী স্লোগানটি তখন সমগ্র ভারতের আত্মিক ঐক্য এবং ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধের মূল মন্ত্র হয়ে উঠেছিল।

  নিচের অংশ (লাল): পতাকার একদম নিচের ব্যান্ডটি ছিল লাল রঙের। এই লাল অংশের বাঁ-দিকে একটি সাদা সূর্য এবং ডানদিকে একটি অর্ধচন্দ্র ও একটি তারা (Crescent moon and star) আঁকা ছিল। সূর্য ছিল হিন্দু ধর্মের প্রতীক এবং অর্ধচন্দ্র ও তারা ছিল ইসলাম ধর্মের প্রতীক। অর্থাৎ, লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদ তৈরি করতে চেয়েছিলেন, তার চরম প্রতিবাদ হিসেবে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অনবদ্য বার্তা এই পতাকায় নিহিত ছিল।

১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট পার্সিবাগান স্কোয়ারের সেই বিশাল জনসমুদ্রে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ সহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের উপস্থিতিতে তরুণ শচীন্দ্র প্রসাদ বসু ভারতের এই প্রথম জাতীয় পতাকাটি সগর্বে উত্তোলন করেন। বাতাসে উড়তে থাকা সেই সবুজ-হলুদ-লাল পতাকাটি দেখে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ আনন্দে ও উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অহংকারের ওপর এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক আঘাত এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক চরম বিজয়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, পরবর্তীকালে ১৯০৭ সালের ২২শে আগস্ট জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে মাদাম ভিকাজি কামা (Madam Bhikaji Cama) ভারতের যে পতাকাটি উত্তোলন করেছিলেন এবং বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন, তা মূলত শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর এই 'ক্যালকাটা ফ্ল্যাগ'-এরই একটি সামান্য পরিমার্জিত রূপ ছিল।


৬. ব্রিটিশদের রোষানল, গ্রেপ্তার ও রাওয়ালপিন্ডি জেলে নির্বাসন (Deportation):

স্বদেশী আন্দোলনকে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির বিশাল বিস্তার এবং সর্বোপরি প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো স্পর্ধিত কাজের ফলে শচীন্দ্র প্রসাদ বসু খুব দ্রুতই ব্রিটিশ পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখের বালিতে পরিণত হন। তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা, নির্ভীক সংগঠন এবং যুবসমাজকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত করার ক্ষমতা বাংলার তরুণদের সশস্ত্র বিপ্লবের দিকেও অনুপ্রাণিত করছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন বুঝতে পারে যে, এই তরুণ নেতাকে বাইরে রাখলে বাংলার ছাত্র আন্দোলনকে কিছুতেই দমন করা যাবে না।

বাংলার এই চরমপন্থী ও স্বদেশী আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯০৮ সালের শেষের দিকে এক ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। তারা ১৮১৮ সালের ৩ নম্বর রেগুলেশন (Regulation III of 1818) নামক এক অত্যন্ত বর্বরোচিত, কালাকানুন ও স্বৈরাচারী আইনের প্রয়োগ করে। এই আইনের বৈশিষ্ট্য ছিল যে, কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে, বিনা প্রমাণে এবং আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়েই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি করে রাখা যেত।

ব্রিটিশরা এই কালাকানুনের অপপ্রয়োগ করে বাংলার ৯ জন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে রাতের অন্ধকারে গ্রেপ্তার করে। এই ঐতিহাসিক ৯ জনের মধ্যে ছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত, কৃষ্ণকুমার মিত্র, সুবোধ মল্লিক (রাজা সুবোধ মল্লিক), শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী এবং আমাদের তরুণ ছাত্রনেতা শচীন্দ্র প্রসাদ বসু।

তাঁকে গ্রেপ্তার করে বাংলা থেকে বহু দূরে সুদূর পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি জেলে (বর্তমানে যা পাকিস্তানে অবস্থিত) নির্বাসিত (Deported) করা হয়। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে বাংলার রাজনৈতিক মাটি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। রাওয়ালপিন্ডি জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাঁকে দিনের পর দিন অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। তাঁর স্বাস্থ্য চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু এতসব অত্যাচার, নিঃসঙ্গতা এবং কষ্ট সত্ত্বেও এই বীর দেশপ্রেমিকের অদম্য মনোবল ও দেশের প্রতি ভালোবাসা ব্রিটিশরা বিন্দুমাত্র ভাঙতে পারেনি।


৭. পরবর্তী জীবন, নীরব সমাজসেবা ও প্রয়াণ:

দীর্ঘ কারাবাস এবং নির্বাসন শেষে যখন শচীন্দ্র প্রসাদ বসু মুক্তি পেয়ে বাংলায় ফিরে আসেন, তখন ভারতের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ধরনে অনেক বড় পরিবর্তন চলে এসেছিল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেছে এবং রাজনীতিতে নতুন নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটছে। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মহাত্মা গান্ধীর উত্থান এবং জাতীয় কংগ্রেসের অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার ফলে, শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর মতো প্রথম যুগের বিপ্লবী এবং চরমপন্থী ছাত্রনেতারা ধীরে ধীরে মূলধারার প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন।

তবে প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে গেলেও তিনি তাঁর দেশপ্রেমের আদর্শ থেকে কখনোই একচুলও বিচ্যুত হননি। তিনি তাঁর জীবনের বাকি সময়টা মূলত নিঃস্বার্থ সমাজসেবা, শিক্ষা বিস্তার এবং নীরবে দেশের কাজ করে কাটিয়ে দেন। রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহ, পদের লালসা বা নিজের কাজের জন্য স্বীকৃতির অহংকার তাঁকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি। সারা জীবন একনিষ্ঠভাবে দেশের সেবা করার পর, ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই মহান বিপ্লবী ও নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকের জীবনাবসান ঘটে।


ঐতিহাসিক মূল্যায়ন:

আজকের দিনে ১৫ই আগস্ট বা ২৬শে জানুয়ারি লাল কেল্লায় যখন স্বাধীন ভারতের তেরঙ্গা পতাকা সগর্বে উড়ে, তখন আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে এই পতাকার প্রথম বীজটি রোপণ করেছিলেন এক তরুণ বাঙালি ছাত্রনেতা। শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর ঐতিহাসিক অবদানগুলোকে আমরা প্রধান কয়েকটি বিন্দুতে মূল্যায়ন করতে পারি:

১. প্রথম পতাকার জনক ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ: পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া যে তেরঙ্গা পতাকার নকশা ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তার প্রথম অনুপ্রেরণা ও আদি রূপটি ১৯০৬ সালে শচীন্দ্র প্রসাদ বসুই তৈরি করেছিলেন। একটি পরাধীন দেশে নিজস্ব জাতীয় পতাকার ধারণা নিয়ে আসা তাঁর অসীম রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।

২. ছাত্র আন্দোলনের পথিকৃৎ: ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য এবং ব্রিটিশদের দমননীতির বিরুদ্ধে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি গঠন করে তিনি যে সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাহস দেখিয়েছিলেন, তা আজও সমগ্র ভারতের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও কালজয়ী দৃষ্টান্ত।

৩. জাতীয় শিক্ষার প্রসার: ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠনে এবং ছাত্রদের বিকল্প শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

৪. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূর্ত প্রতীক: লর্ড কার্জনের বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর তৈরি পতাকায় সূর্য ও অর্ধচন্দ্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রমাণ করে যে, তিনি সেই সময়েই একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক এবং ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।


উপসংহার:

শচীন্দ্র প্রসাদ বসু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই অজানা, অনালোচিত এবং প্রায় বিস্মৃত অধ্যায়ের এক নীরব নায়ক, যাঁর আত্মত্যাগ, রক্ত ও ঘামের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের স্বাধীন ভারত। মূলধারার ইতিহাস হয়তো তাঁকে পাঠ্যপুস্তকের প্রথম পাতায় উপযুক্ত জায়গা দেয়নি, কিন্তু ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট কলকাতার পার্সিবাগান স্কোয়ারের আকাশে প্রথমবার উড়ে ওঠা সেই সবুজ-হলুদ-লাল পতাকার প্রতিটি সুতোয় তাঁর নাম চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। আজকের স্বাধীন ভারতের নাগরিকদের, বিশেষ করে যুবসমাজের উচিত এই বিস্মৃত বীরের চরম আত্মত্যাগ, সাহসিকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা এবং তাঁর দেশপ্রেমের আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে দেশের কল্যাণে ব্রতী হওয়া।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ