ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন: ইতিহাস, উদ্দেশ্য ও কার্যাবলী

মাঝখানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আর পাশে আনন্দমোহন বসু। সামনে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত, উকিল, শিক্ষক, ছাত্র সবাই খাতা কলম নিয়ে শুনছে।

প্রেক্ষাপট:

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে অভূতপূর্ব নবজাগরণ দেখা গিয়েছিল, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (Indian Association)। ভারতের বুকে সর্বভারতীয় স্তরে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি এবং ব্রিটিশ বিরোধী জনমত গঠনের ক্ষেত্রে ১৮৮৫ সালে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' প্রতিষ্ঠার আগে ভারত সভাই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।

কীভাবে একটি সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মঞ্চ থেকে এটি সমগ্র ভারতের স্বাধীনতার প্রথম স্ফুলিঙ্গে পরিণত হয়েছিল, তার বিস্তারিত ইতিহাস, পটভূমি, উদ্দেশ্য এবং কার্যাবলী নিচে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হলো।

১. ভারত সভা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি

ভারত সভা প্রতিষ্ঠার আগে ভারতের, বিশেষ করে বাংলার রাজনৈতিক চালচিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত 'জমিদার সভা' (Landholders' Society) বা ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত 'ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' (British Indian Association)-এর মতো রাজনৈতিক সংগঠনগুলো মূলত জমিদার, ধনী ব্যবসায়ী এবং সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার কাজেই ব্যস্ত ছিল।

এই সংগঠনগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত একটি বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। এই শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তার এবং সাংবাদিকরা উপলব্ধি করেন যে, কেবল জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করে দেশের মুক্তি সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ এবং শিক্ষিত বেকারদের রাজনৈতিক দাবিদাওয়া ব্রিটিশ সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক এবং সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠনের তীব্র অভাব দেখা দেয়। এই ঐতিহাসিক শূন্যস্থান পূরণের উদ্দেশ্যেই জন্ম নেয় ভারত সভা।

২. ভারত সভার জন্ম ও প্রতিষ্ঠাতাগণ

দীর্ঘ রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ১৮৭৬ সালের ২৬ জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউজ) এক বিশাল জনসভার মাধ্যমে 'ভারত সভা' বা 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' আত্মপ্রকাশ করে।

এই ঐতিহাসিক সংগঠনটির প্রধান রূপকার ছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ও রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর পরম মিত্র, বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ ও আইনজীবী আনন্দমোহন বসু। এছাড়াও এই সংগঠন প্রতিষ্ঠায় শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় এবং কৃষ্ণদাস পালের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিদের বিশেষ অবদান ছিল। আনন্দমোহন বসু ছিলেন ভারত সভার প্রথম সচিব বা সেক্রেটারি। প্রতিষ্ঠার পর খুব দ্রুতই বাংলা ছাড়িয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভারত সভার শাখা ছড়িয়ে পড়ে।

৩. ভারত সভার প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারত সভাকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে দেখতে চাননি। তাঁর আত্মজীবনী 'A Nation in Making' গ্রন্থে তিনি ভারত সভার যে চারটি প্রধান লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেছেন, তা ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী:

 শক্তিশালী জনমত গঠন: ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষিত জনসমাজকে একত্রিত করে ব্রিটিশ সরকারের স্বৈরাচারী ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী, সুদৃঢ় এবং ঐক্যবদ্ধ জনমত (Public Opinion) গঠন করা।

 রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন: ধর্ম, বর্ণ এবং প্রদেশের ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র ভারতের মানুষকে একই রাজনৈতিক আদর্শ এবং স্বার্থের ভিত্তিতে একটিমাত্র মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করা।

 হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি: ব্রিটিশদের 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule) নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনকে সফল করার জন্য হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও ঐক্য স্থাপন করা।

 সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ: রাজনৈতিক আন্দোলনকে কেবল শিক্ষিত বা অভিজাত সমাজের ড্রয়িংরুমে সীমাবদ্ধ না রেখে, সমাজের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ এবং কৃষক শ্রেণীকে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত করা।

৪. ভারত সভার ঐতিহাসিক কার্যাবলী ও আন্দোলন

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারত সভা ব্রিটিশ সরকারের একের পর এক বৈষম্যমূলক আইন ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। এর প্রধান কার্যাবলীগুলো ছিল নিম্নরূপ:

ক) সিভিল সার্ভিস আন্দোলন (Civil Service Agitation)

লর্ড লিটন ভারতে আসার পর ভারতীয়দের উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরি থেকে দূরে রাখার জন্য এক গভীর ষড়যন্ত্র করেন। তিনি সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় বসার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করেন। এই অল্প বয়সে ভারতীয় ছাত্রদের পক্ষে ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংরেজিতে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারত সভা এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এই আন্দোলনকে সর্বভারতীয় রূপ দিতে সুরেন্দ্রনাথ কলকাতা থেকে শুরু করে আগ্রা, লাহোর, দিল্লি, কানপুর, বেনারস এবং বোম্বাই সফর করেন। এটিই ছিল ভারতের বুকে প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন।

খ) লর্ড লিটনের কালাকানুন: মুদ্রাযন্ত্র ও অস্ত্র আইন বিরোধী আন্দোলন

১৮৭৮ সালে স্বৈরাচারী ভাইসরয় লর্ড লিটন 'দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন' (Vernacular Press Act) জারি করেন। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলোর (যেমন- সোমপ্রকাশ, অমৃতবাজার পত্রিকা) কণ্ঠরোধ করা, যাতে তারা ব্রিটিশ বিরোধী কোনো খবর ছাপতে না পারে। একই বছর তিনি 'অস্ত্র আইন' (Arms Act) জারি করে নিয়ম করেন যে, ভারতীয়রা লাইসেন্স ছাড়া কোনো অস্ত্র রাখতে পারবে না, অথচ ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল না।

ভারত সভা এই দুটি চরম বৈষম্যমূলক কালাকানুনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে। টাউন হলে বিশাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয় এবং ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টেও স্মারকলিপি পাঠানো হয়। ভারত সভার এই প্রবল চাপের মুখেই পরবর্তী ভাইসরয় লর্ড রিপন ১৮৮২ সালে মুদ্রাযন্ত্র আইন বাতিল করতে বাধ্য হন।

গ) ইলবার্ট বিল বিতর্ক ও তীব্র গণ-আন্দোলন (Ilbert Bill Controversy)

লর্ড রিপনের শাসনকালে (১৮৮৩ সাল) তাঁর আইন সচিব কোর্টনে ইলবার্ট একটি নতুন বিল আনেন, যার নাম 'ইলবার্ট বিল'। এই বিলে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচার করার অধিকার দেওয়া হয়।

এর আগে কোনো ভারতীয় বিচারক শ্বেতাঙ্গদের বিচার করতে পারতেন না। এই বিলের কথা শুনে ইউরোপীয়রা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং 'ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন' তৈরি করে বিলটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে, যা 'শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ' (White Mutiny) নামে পরিচিত। শ্বেতাঙ্গদের এই বর্ণবাদী আচরণের কড়া জবাব দিতে এবং ইলবার্ট বিলের সমর্থনে ভারত সভা সমগ্র দেশজুড়ে ভারতীয়দের আত্মসম্মান রক্ষার্থে পথে নামে।

ঘ) কৃষক অধিকার ও প্রজাস্বত্ব আইন (Rent Bill)

ভারত সভা যে কেবল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংগঠন ছিল না, তার প্রমাণ মেলে কৃষকদের অধিকার রক্ষায় তাদের ভূমিকায়। জমিদারদের মাত্রাতিরিক্ত কর এবং শোষণের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষার জন্য তারা গ্রামে গ্রামে র‍্যালি করে এবং কৃষকদের সংগঠিত করে। তাদের এই আন্দোলনের ফলেই ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত ১৮৮৫ সালে 'বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন' বা বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্ট (Bengal Tenancy Act) পাস করতে বাধ্য হয়, যেখানে কৃষকদের জমির ওপর কিছুটা অধিকার স্বীকৃতি পায়।

৫. সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন (National Conference)

ভারত সভার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য ছিল একটি সর্বভারতীয় সম্মেলন আয়োজন করা। ইলবার্ট বিল বিতর্কের পর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝতে পারেন যে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে বিচ্ছিন্ন আন্দোলন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি সর্বভারতীয় স্থায়ী রাজনৈতিক মঞ্চের।

এই উদ্দেশ্যেই ভারত সভার উদ্যোগে ১৮৮৩ সালের ২৮-৩০ ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম 'সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন' (National Conference)। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে বহু প্রতিনিধি এই সম্মেলনে যোগ দেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সম্মেলনটিই ছিল ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস'-এর প্রকৃত ভিত্তিভূমি বা প্রথম মহড়া।

৬. জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সংযুক্তি

১৮৮৫ সালে বোম্বাই শহরে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্যোগে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' প্রতিষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসের মূল আদর্শ এবং ভারত সভার আদর্শ প্রায় একই ছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উপলব্ধি করেন যে, একই উদ্দেশ্যে দুটি আলাদা সর্বভারতীয় সংগঠন থাকলে জাতীয় আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়বে।

তাই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এবং রাজনৈতিক ঐক্যের লক্ষ্যে, ১৮৮৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনকে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস'-এর সাথে সম্পূর্ণভাবে বিলীন করে দেন।

৭. ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও গুরুত্ব

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাসে ভারত সভার গুরুত্ব ও অবদান অনস্বীকার্য:

১. আঞ্চলিকতা থেকে জাতীয়তাবাদ: ভারত সভাই প্রথম প্রমাণ করেছিল যে, আঞ্চলিকতা ও ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র ভারতবাসী একজোট হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

২. গণ-আন্দোলনের রূপরেখা: শুধু ড্রয়িংরুমের রাজনীতি নয়, পথে নেমে কীভাবে সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে গণ-আন্দোলন করতে হয়, তা ভারত সভাই প্রথম শিখিয়েছিল।

৩. কংগ্রেসের পথপ্রদর্শক: জাতীয় কংগ্রেস যে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিল, সেই প্ল্যাটফর্মটি ভারত সভাই নিজ হাতে তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিল।

পরিশেষে বলা যায়, ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না; এটি ছিল পরাধীন ভারতের ঘুমন্ত জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তোলার এক প্রজ্জ্বলিত মশাল, যার আলোতেই ভারতবাসী প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শিখেছিল। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ