পটভূমি:
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং আধুনিক ভারতের সমাজব্যবস্থার ইতিহাসে ১৯৩২ সালের 'পুনা চুক্তি' (Poona Pact) একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও নির্ণায়ক অধ্যায়। এই চুক্তিটি কেবল একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল না; এটি ছিল ভারতের হিন্দু সমাজের বিভাজন রোধ এবং দলিত বা অনুন্নত শ্রেণির (Depressed Classes) সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক দলিল।
মহাত্মা গান্ধী এবং ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি আধুনিক ভারতের 'সংরক্ষণ ব্যবস্থা' বা 'Reservation System'-এর মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। আসুন, ইতিহাসের পাতা উল্টে এই চুক্তির পটভূমি, দুই মহান নেতার মতাদর্শগত সংঘাত, পুনা চুক্তির শর্তাবলী এবং ভারতের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
১. ঐতিহাসিক পটভূমি: দলিত অধিকারের উত্থান ও গোলটেবিল বৈঠক
পুনা চুক্তির বীজ মূলত বপন করা হয়েছিল লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকগুলোতে (Round Table Conferences)। ১৯৩০ সালে যখন প্রথম গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, তখন জাতীয় কংগ্রেস তা বয়কট করেছিল। কিন্তু ভারতের দলিত বা অস্পৃশ্য সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে ডঃ ভীমরাও রামজি আম্বেদকর সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ডঃ আম্বেদকর ব্রিটিশ সরকারের কাছে জোরালোভাবে দাবি জানান যে, ভারতের দলিত সম্প্রদায় হিন্দু সমাজের অংশ হলেও তারা যুগ যুগ ধরে চরম অবহেলিত ও শোষিত। তাই তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার জন্য একটি 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' (Separate Electorate) প্রয়োজন। পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বলতে বোঝায়—দলিতদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আসন সংরক্ষিত থাকবে, যেখানে কেবল দলিত প্রার্থীরাই দাঁড়াতে পারবেন এবং শুধুমাত্র দলিত ভোটাররাই তাঁদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।
১৯৩১ সালের দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ডঃ আম্বেদকর পুনরায় তাঁর পৃথক নির্বাচনের দাবি তুললে গান্ধীজি তার তীব্র বিরোধিতা করেন, যার ফলে বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ব্যর্থ হয়।
২. ব্রিটিশদের চাল: রামসে ম্যাকডোনাল্ডের 'সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা' নীতি
দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য এক চতুর রাজনৈতিক চাল চালেন। ১৯৩২ সালের ১৬ই আগস্ট তিনি তাঁর কুখ্যাত 'সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা' বা 'কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড' (Communal Award) ঘোষণা করেন।
এই ঘোষণায় মুসলিম, শিখ এবং খ্রিস্টানদের পাশাপাশি ভারতের 'অনুন্নত শ্রেণি' বা দলিতদেরও হিন্দু সমাজ থেকে একটি পৃথক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাদের জন্য ৭১টি আসন নির্দিষ্ট করে 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' (Separate Electorate) ঘোষণা করা হয়। ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্য ছিল এই নীতির মাধ্যমে ভারতের বৃহত্তর হিন্দু সমাজকে চিরতরে দ্বিখণ্ডিত করে দেওয়া এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করে ফেলা।
৩. গান্ধীজি ও আম্বেদকরের মতাদর্শগত সংঘাত
সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি ঘোষিত হওয়ার পর ভারতের রাজনীতিতে এক চরম সংকটের সৃষ্টি হয়। এই সময় মহাত্মা গান্ধী আইন অমান্য আন্দোলনের কারণে পুনের য়েরওয়াড়া সেন্ট্রাল জেলে (Yerwada Jail) বন্দি ছিলেন।
গান্ধীজির দৃষ্টিভঙ্গি:
গান্ধীজি ব্রিটিশদের এই ঘোষণাকে হিন্দু সমাজের জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, অস্পৃশ্যতা হিন্দু সমাজের একটি কলঙ্ক ঠিকই, কিন্তু দলিতরা বৃহত্তর হিন্দু সমাজেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হলে হিন্দু সমাজ ও দলিতদের মধ্যে চিরস্থায়ী একটি বিভেদের প্রাচীর তৈরি হবে, যা অস্পৃশ্যতাকে আরও পাকাপোক্ত করবে। তিনি দলিতদের 'হরিজন' (ঈশ্বরের সন্তান) আখ্যা দিয়েছিলেন এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এই প্রথা দূর করতে চেয়েছিলেন।
ডঃ আম্বেদকরের দৃষ্টিভঙ্গি:
অন্যদিকে, ডঃ আম্বেদকরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি মনে করতেন, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে দলিতদের মুক্তি সম্ভব নয়। হাজার হাজার বছরের সামাজিক শোষণ থেকে বাঁচতে হলে দলিতদের হাতে আইনি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। তাই তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা'কে তাঁর সমাজের মুক্তির চাবিকাঠি হিসেবে দেখেছিলেন।
৪. গান্ধীজির আমরণ অনশন ও দেশজুড়ে আলোড়ন
ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী ১৯৩২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর য়েরওয়াড়া জেলের ভেতরেই 'আমরণ অনশন' (Fast Unto Death) শুরু করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, যতদিন না দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করা হচ্ছে, ততদিন তিনি জলস্পর্শ করবেন না।
গান্ধীজির এই অনশনের খবরে সমগ্র ভারতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁর বয়স এবং ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে অনশনের কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটতে থাকে। দেশের সমস্ত শীর্ষস্থানীয় নেতা, যেমন—মদনমোহন মালব্য, তেজ বাহাদুর সপ্রু, সি. রাজাগোপালচারী এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ পুনেতে ছুটে আসেন। গান্ধীজির জীবন বাঁচাতে তাঁরা অবিলম্বে ডঃ আম্বেদকরের সাথে আলোচনা শুরু করেন।
৫. ডঃ আম্বেদকরের চরম সংকট ও পুনা চুক্তি স্বাক্ষর
গান্ধীজির অনশন ডঃ আম্বেদকরকে এক ভয়ানক নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে ফেলে দেয়। একদিকে ছিল তাঁর নিজের সমাজের কোটি কোটি মানুষের যুগ যুগের বঞ্চনা থেকে মুক্তির স্বপ্ন (যা ব্রিটিশরা দিয়েছিল), আর অন্যদিকে ছিল মহাত্মা গান্ধীর অমূল্য জীবন। আম্বেদকর জানতেন, যদি অনশনরত অবস্থায় গান্ধীজির মৃত্যু হয়, তবে সমগ্র ভারতজুড়ে দলিতদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ নেমে আসবে এবং দলিত সমাজ চিরতরে বিপন্ন হবে।
অবশেষে, প্রবল মানসিক চাপ এবং জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ডঃ আম্বেদকর আপোষ রফায় আসতে রাজি হন। পুনের য়েরওয়াড়া জেলে দীর্ঘ ও তীব্র দরকষাকষির পর ১৯৩২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর হিন্দু সমাজের উচ্চবর্ণের প্রতিনিধিদের সাথে ডঃ আম্বেদকরের এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইতিহাসে 'পুনা চুক্তি' (Poona Pact) নামে অমর হয়ে আছে।
এই চুক্তিতে দলিতদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ডঃ বি. আর. আম্বেদকর এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য।
৬. পুনা চুক্তির প্রধান শর্তাবলী (Terms of Poona Pact)
পুনা চুক্তির মাধ্যমে ডঃ আম্বেদকর 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা'র দাবি ত্যাগ করেন, কিন্তু বিনিময়ে তিনি দলিতদের জন্য এমন কিছু অধিকার আদায় করে নেন যা ব্রিটিশদের দেওয়া কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের চেয়েও অনেক বেশি সুবিধাজনক ছিল। এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ:
ক. যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থা গ্রহণ (Joint Electorate):
চুক্তিতে স্থির হয় যে, দলিতদের জন্য কোনো পৃথক নির্বাচন থাকবে না। বৃহত্তর হিন্দু সমাজের সাথেই 'যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থা'র মাধ্যমে ভোটগ্রহণ হবে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট আসনে দলিত প্রার্থী দাঁড়াবেন, কিন্তু সমস্ত বর্ণের মানুষ তাঁকে ভোট দিতে পারবেন।
খ. আসন সংখ্যা বৃদ্ধি:
ব্রিটিশদের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতিতে দলিতদের জন্য প্রাদেশিক আইনসভাগুলোতে মাত্র ৭১টি আসন সংরক্ষিত ছিল। পুনা চুক্তির ফলে তা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ১৪৮টি আসন সংরক্ষিত করা হয় (যথা—মাদ্রাজ ৩০, বাংলা ৩০, যুক্তপ্রদেশ ২০, বিহার ও উড়িষ্যা ১৮, মধ্যপ্রদেশ ২০, বোম্বাই ও সিন্ধু ১৫, পাঞ্জাব ৮, আসাম ৭)।
গ. কেন্দ্রীয় আইনসভায় সংরক্ষণ:
প্রাদেশিক আইনসভার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় আইনসভায় (Central Legislature) ব্রিটিশ ভারতের সাধারণ আসনের ১৮ শতাংশ (18%) আসন দলিত বা অনুন্নত শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ঘ. প্রাথমিক নির্বাচন পদ্ধতি (Primary Election):
দলিতদের প্রকৃত প্রতিনিধি বাছাই করার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতি স্থির হয়। সংরক্ষিত আসনগুলোতে প্রথমে কেবল দলিত ভোটাররা ভোট দিয়ে ৪ জনের একটি প্যানেল (Panel) বা প্রার্থী তালিকা তৈরি করবেন। পরে সাধারণ নির্বাচনে হিন্দু সমাজের সব ভোটার মিলে ওই ৪ জনের মধ্যে থেকে একজনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করবেন।
ঙ. সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় সুবিধা:
চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, সরকারি চাকরি এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করা হবে না এবং দলিত শ্রেণির যোগ্য প্রার্থীদের ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হবে। এছাড়া, দলিত ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রতিটি প্রদেশের শিক্ষা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
৭. পুনা চুক্তির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
পুনা চুক্তি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর প্রভাবগুলো ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
হিন্দু সমাজের বিভাজন রোধ: এই চুক্তির ফলে হিন্দু সমাজ ব্রিটিশদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে দ্বিখণ্ডিত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। মহাত্মা গান্ধীর প্রাণ রক্ষা পায় এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তার মূল স্রোতে ফিরে আসে।
সংরক্ষণ ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর: আজকের স্বাধীন ভারতের সংবিধানে তপসিলি জাতি (SC) এবং তপসিলি উপজাতিদের (ST) জন্য যে রাজনৈতিক সংরক্ষণের (Political Reservation) ব্যবস্থা রয়েছে, তার আইনি ও নৈতিক ভিত্তি এই পুনা চুক্তির মাধ্যমেই তৈরি হয়েছিল।
দলিতদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: পুনা চুক্তির ফলে ভারতের দলিত সমাজ প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজনীতিতে একটি সম্মানজনক এবং শক্তিশালী অবস্থান লাভ করে। তাঁরা বুঝতে পারে যে, তাঁদের রাজনৈতিক অধিকারকে আর কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনের গতিবৃদ্ধি: এই ঘটনার পর মহাত্মা গান্ধী সক্রিয় রাজনীতি থেকে সাময়িকভাবে সরে এসে নিজের জীবন সম্পূর্ণভাবে 'হরিজন' (দলিত) উদ্ধার এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের কাজে উৎসর্গ করেন। তিনি 'হরিজন সেবক সংঘ' প্রতিষ্ঠা করেন।
উপসংহার:
পুনা চুক্তি ছিল মহাত্মা গান্ধীর আত্মত্যাগ এবং ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক অসাধারণ মেলবন্ধন। গান্ধীজি যেখানে নৈতিকতার জোরে ভারতের সমাজকে একতাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন, ডঃ আম্বেদকর সেখানে আইনের মাধ্যমে তাঁর শোষিত সমাজের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। পুনা চুক্তির মাধ্যমেই ভারতের অনুন্নত শ্রেণি প্রথমবার নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির আস্বাদন পেয়েছিল, যা পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার সময় ডঃ আম্বেদকরকে এক শক্ত ভিত প্রদান করেছিল।


0 মন্তব্যসমূহ