ভূমিকা:
ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে অনেক শাসক এসেছেন এবং গেছেন, কিন্তু খুব কম শাসকই তলোয়ারের জোরের চেয়ে কূটনীতি এবং ভালোবাসার জোরে সাম্রাজ্য জয় করতে পেরেছিলেন। সম্রাট জালালউদ্দিন মুহম্মদ আকবর (Jalaluddin Muhammad Akbar) ছিলেন ঠিক তেমনই একজন ব্যতিক্রমী এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র তেরো বছর বয়সে যখন তিনি দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তখন মোগল সাম্রাজ্য ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং টলটলায়মান। তাঁর পিতামহ বাবর ভারত জয় করেছিলেন বটে, কিন্তু শাসন সুসংহত করার সময় পাননি। পিতা হুমায়ুন জীবনের বেশিরভাগ সময় সিংহাসন হারানো এবং পুনরুদ্ধারের লড়াইয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন।
আকবর যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন মোগলরা ভারতের মাটিতে একদল 'বিদেশী আক্রমণকারী' হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু আকবর খুব দ্রুত অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, ভারতের মতো একটি বিশাল, বৈচিত্র্যময় এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে কেবল সামরিক শক্তি বা ধর্মান্ধতা দিয়ে বেশিদিন শাসন করা সম্ভব নয়। একটি স্থায়ী সাম্রাজ্য গড়তে হলে এই দেশের মাটি ও মানুষের সাথে একাত্ম হতে হবে। এই গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি থেকেই জন্ম নিয়েছিল সম্রাট আকবরের দুটি কালজয়ী নীতি—'রাজপুত নীতি' (Rajput Policy) এবং তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় দর্শন 'দীন-ই-ইলাহী' (Din-i-Ilahi)।
আজকের এই সুদীর্ঘ এবং তথ্যসমৃদ্ধ মেগা আর্টিকেলে আমরা সম্রাট আকবরের এই দুই যুগান্তকারী মাস্টারস্ট্রোক নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করব, যা মোগল সাম্রাজ্যকে একটি অস্থায়ী দখলদারি থেকে ভারতের জাতীয় সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করেছিল।
প্রথম পর্ব: আকবরের রাজপুত নীতি, কূটনীতি ও বন্ধুত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন
ষোড়শ শতাব্দীর ভারতে রাজপুতরা ছিল সবচেয়ে দুর্ধর্ষ, স্বাধীনতাপ্রিয় এবং প্রভাবশালী সামরিক শক্তি। দিল্লির যেকোনো শাসকের কাছেই রাজপুতানা (বর্তমান রাজস্থান) ছিল গলার কাঁটার মতো। আকবরের আগে দিল্লির সুলতানরা রাজপুতদের সাথে কেবল যুদ্ধই করেছেন, যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যেই শত্রুতার এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আকবর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতের কেন্দ্রস্থলে আধিপত্য বিস্তার করতে হলে রাজপুতদের মতো বিশ্বস্ত ও বীর জাতিকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং বন্ধু হিসেবে পাশে রাখা প্রয়োজন।
১. রাজপুত নীতি গ্রহণের পেছনের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব:
আকবর অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান শাসক ছিলেন। তিনি জানতেন যে তাঁর নিজের দরবারের আফগান ও উজবেক অভিজাতরা (Nobles) যেকোনো সময় তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে (এবং তারা করেছিলও)। নিজের সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করতে তাঁর এমন একটি অনুগত বাহিনীর প্রয়োজন ছিল, যারা মোগলদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে মুক্ত। রাজপুতরা ছিল কথার দাম দেওয়া এক বীর জাতি। একবার যাদের তারা বন্ধু মানত, তাদের জন্য হাসিমুখে প্রাণ দিতেও তারা দ্বিধা করত না। আকবর এই রাজপুতদের বীরত্বকেই মোগল সাম্রাজ্যের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
২. বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন (Matrimonial Alliances):
আকবরের রাজপুত নীতির সবচেয়ে বড় এবং চমকপ্রদ দিকটি ছিল রাজপুত রাজপরিবারগুলোর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন। ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে আকবর যখন আজমীরে খাজা মইনুদ্দিন চিশতীর দরগাহ জিয়ারত করতে যাচ্ছিলেন, তখন অম্বর (বর্তমান জয়পুর)-এর রাজা ভারমল (Raja Bharmal) আকবরের বশ্যতা স্বীকার করেন।
সম্পর্ককে চিরস্থায়ী রূপ দিতে রাজা ভারমল তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা হরখা বাঈ (যিনি ইতিহাসে জোধাবাঈ বা মরিয়ম-উজ-জমানি নামে অধিক পরিচিত)-এর সাথে আকবরের বিবাহ দেন। এটি কেবল একটি সাধারণ বিবাহ ছিল না; এটি ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। আকবর তাঁর হিন্দু স্ত্রীদের সম্পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। রাজপ্রাসাদের ভেতরে মন্দির তৈরি করে পুজো করার অধিকার তাঁদের ছিল, যা সেকালের কট্টর ইসলামিক পরিবেশে সম্পূর্ণ অকল্পনীয় একটি ঘটনা। পরবর্তীতে বিকানের, জয়সালমের এবং যোধপুরের মতো শক্তিশালী রাজপুত রাজ্যগুলোও মোগলদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়।
৩. উচ্চপদ ও মনসবদারী প্রদান (Administrative Integration):
আকবর কেবল বৈবাহিক সম্পর্ক করেই থেমে থাকেননি। তিনি তাঁর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় এবং অন্যান্য বশ্যতা স্বীকার করা রাজপুত রাজাদের মোগল প্রশাসনে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে বসিয়েছিলেন।
রাজা ভারমলের পুত্র ভগবন্ত দাস এবং পৌত্র মানসিংহ (Raja Man Singh) মোগল সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।
মানসিংহ তো কেবল সেনাপতিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আকবরের 'নবরত্ন' সভার অন্যতম উজ্জ্বল রত্ন এবং কাবুলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের সুবাদার।
রাজস্ব ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আরেক হিন্দু পণ্ডিত রাজা টোডরমলকে (Raja Todar Mal), যাঁর 'জবতি প্রথা' বা ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা আজও আধুনিক অর্থনীতির এক বিস্ময়।
এর ফলে রাজপুতরা আর নিজেদের বিজিত বা পরাধীন মনে করত না। তারা মোগল সাম্রাজ্যকে নিজেদের সাম্রাজ্য ভাবতে শুরু করে এবং এই সাম্রাজ্যের প্রসারের জন্য আফগানিস্তান থেকে বাংলা পর্যন্ত নিজেদের রক্ত ঝরাতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
৪. ধর্মীয় বৈষম্য দূরীকরণ (জিজিয়া ও তীর্থকর বিলোপ):
রাজপুতদের মন জয় করার জন্য আকবর তাঁর প্রশাসনিক নীতিতেও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন।
১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি হিন্দুদের ওপর থেকে অত্যন্ত অপমানজনক 'তীর্থকর' (Pilgrim Tax) প্রত্যাহার করে নেন।
১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা 'জিজিয়া কর' (Jizya - অমুসলিমদের ওপর ধার্য করা নিরাপত্তামূলক কর) সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করেন।
এই একটি মাত্র ঘোষণা আকবরকে ভারতের অগণিত হিন্দু প্রজার হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে দেয়। সাধারণ মানুষ তাঁকে ভিনদেশি শাসকের বদলে 'দিল্লিশ্বর' হিসেবে গ্রহণ করে।
৫. ব্যতিক্রম (মেবারের মহারানা প্রতাপ এবং হলদিঘাটির যুদ্ধ):
আকবরের রাজপুত নীতি যে সবসময় মসৃণ ছিল, তা নয়। রাজপুতানার প্রায় সমস্ত রাজ্য যখন আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল, তখন একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল মেবার (Mewar)। মেবারের রানা উদয় সিং এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র মহারানা প্রতাপ (Maharana Pratap) কোনোভাবেই মোগলদের কাছে মাথা নত করতে রাজি হননি।
১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক হলদিঘাটির যুদ্ধে আকবরের মোগল বাহিনীর (যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং একজন রাজপুত—মানসিংহ) মুখোমুখি হন মহারানা প্রতাপ। এই যুদ্ধটি ছিল এক অদ্ভুত প্যারাডক্স। একদিকে একজন হিন্দু রাজপুত সেনাপতি যুদ্ধ করছেন একজন মুসলিম সম্রাটের হয়ে, অন্যদিকে মহারানা প্রতাপের গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান ছিলেন একজন মুসলিম—হাকিম খান সুর! এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে আকবরের নীতি ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে ভাগ করেছিল। হলদিঘাটির যুদ্ধে মোগলরা জয়ী হলেও মহারানা প্রতাপ আমৃত্যু তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন, যা ইতিহাসের পাতায় এক বীরত্বগাথা হয়ে রয়েছে।
৬. রাজপুত নীতির ফলাফল ও মূল্যায়ন:
আকবরের এই রাজপুত নীতি ছিল এক মাস্টারস্ট্রোক। এর ফলে মোগল সাম্রাজ্য এমন এক সামরিক এবং রাজনৈতিক স্থায়িত্ব লাভ করেছিল, যা পরবর্তী প্রায় দেড়শো বছর অটুট ছিল। রাজপুতদের তরবারি, যা আগে মোগলদের দিকে তাক করা থাকত, তা এখন মোগল সাম্রাজ্য রক্ষার পাহারাদার হয়ে দাঁড়াল। আকবরের এই নীতি প্রমাণ করেছিল যে, কাউকে জোর করে পদানত করার চেয়ে তাকে সম্মান দিয়ে আপন করে নেওয়াটা একজন শাসকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয়।
দ্বিতীয় পর্ব: ধর্মীয় বিবর্তন এবং দীন-ই-ইলাহী (The Religion of God)
সম্রাট আকবরের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং দার্শনিক দিকটি হলো তাঁর নিজস্ব ধর্মনীতি বা 'দীন-ই-ইলাহী'। আকবর কোনো সাধারণ গোঁড়া শাসক ছিলেন না। তাঁর মন ছিল এক চির-অনুসন্ধিৎসু দার্শনিকের মতো। জীবনের প্রথম দিকে তিনি একজন অত্যন্ত ধর্মভীরু সুন্নি মুসলিম ছিলেন, যিনি নিয়ম করে দিনে পাঁচবার নামাজ পড়তেন এবং দরগাহে যেতেন। কিন্তু তাঁর মনের ভেতরে সব ধর্মের সত্যকে জানার এক অদম্য তৃষ্ণা লুকিয়ে ছিল।
১. ইবাদত খানা (Ibadat Khana) বিতর্কের মুক্ত প্রাঙ্গণ (১৫৭৫ খ্রি.):
সাম্রাজ্য সুসংহত হওয়ার পর আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে (Fatehpur Sikri) একটি বিশেষ উপাসনা গৃহ বা 'ইবাদত খানা' নির্মাণ করেন। প্রথমদিকে এখানে কেবল ইসলাম ধর্মের শিয়া ও সুন্নি পণ্ডিতরা আসতেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। কিন্তু আকবর অত্যন্ত হতাশ হয়ে লক্ষ করেন যে, উলেমারা (ধর্মীয় নেতারা) একে অপরের প্রতি চরম অসহিষ্ণু। তারা সত্য খোঁজার বদলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতেই বেশি ব্যস্ত।
এই উলেমাদের সংকীর্ণতা দেখে আকবর বিরক্ত হন এবং ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইবাদত খানার দরজা সব ধর্মের পণ্ডিতদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
হিন্দু ধর্ম থেকে আসেন পুরুষোত্তম ও দেবী।
জৈন ধর্ম থেকে আসেন হরিবিজয় সুরি ও জিনচন্দ্র সুরি।
জরথুষ্ট্রীয় বা পারসিক ধর্ম থেকে আসেন দস্তুর মেহেরজী রানা।
খ্রিস্টান ধর্ম থেকে আসেন পর্তুগিজ জেসুইট ফাদার অ্যাকোয়াভিভা (Aquaviva) এবং মনসেরাট (Monserrate)।
মাসের পর মাস ধরে আকবর এই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের মধ্যে হওয়া বিতর্ক অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, ঈশ্বর বা ভগবান একজনই, কেবল তাঁকে ডাকার পথগুলো আলাদা। কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের কাছে পরম সত্যের একচেটিয়া অধিকার নেই। সব ধর্মেই কিছু ভালো জিনিস রয়েছে।
২. মজহার নামা (The Infallibility Decree - ১৫৭৯ খ্রি.):
ইবাদত খানার আলোচনার ফলে আকবরের নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে আমূল পরিবর্তন আসে। তিনি বুঝতে পারেন যে গোঁড়া উলেমারা সাম্রাজ্যের প্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তাই ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফৈজীর পিতা শেখ মুবারকের সাহায্যে একটি ঐতিহাসিক দলিল প্রকাশ করেন, যার নাম 'মজহার' (Mahzar)।
এই দলিলের মাধ্যমে আকবর নিজেকে সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ধর্মীয় বিচারক (Imam-i-Adil) হিসেবে ঘোষণা করেন। এর অর্থ হলো, ধর্মীয় কোনো বিষয়ে উলেমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে আকবরের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি ধর্মকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ করেন এবং ধর্মগুরুদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার রাস্তা চিরতরে বন্ধ করে দেন।
৩. সুলহ-ই-কুল (Sulah-i-Kul): সর্বজনীন শান্তি:
আকবরের ধর্মীয় দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল 'সুলহ-ই-কুল' বা Universal Peace (সর্বজনীন শান্তি)। তিনি চাইতেন তাঁর সাম্রাজ্যে হিন্দু, মুসলিম, জৈন, খ্রিস্টান সবাই যেন সমান অধিকার নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এই আদর্শ থেকেই ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি সব ধর্মের সারমর্ম নিয়ে একটি নতুন আধ্যাত্মিক মতাদর্শ বা জীবনবিধান প্রচার করেন, ইতিহাসে যাকে 'দীন-ই-ইলাহী' (Din-i-Ilahi) বলা হয়।
৪. দীন-ই-ইলাহী:
অনেক পাঠ্যবইয়ে দীন-ই-ইলাহীকে একটি 'নতুন ধর্ম' হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন এটি আসলে কোনো প্রচলিত অর্থে ধর্ম ছিল না। এর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ ছিল না। কোনো পুরোহিত, মন্দির, মসজিদ বা উপাসনালয় ছিল না। এর কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় রীতিনীতি বা আচার-অনুষ্ঠান ছিল না। বরং এটি ছিল একটি সুফি ঘরানার আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী বা ভ্রাতৃত্ববোধ (Sufi Order)। আকবর এর নাম দিয়েছিলেন 'তৌহিদ-ই-ইলাহী' (Tauhid-i-Ilahi) বা ঐশ্বরিক একেশ্বরবাদ।
দীন-ই-ইলাহীর প্রধান নীতিগুলো:
১. সম্রাটকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মান্য করা এবং তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত থাকা (সম্পত্তি, জীবন, সম্মান ও ধর্ম বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকা)।
২. একে অপরের সাথে দেখা হলে 'আল্লাহু আকবর' (ঈশ্বর মহান) এবং 'জাল্লা জালালুহু' (তাঁর মহিমা প্রতিফলিত হোক) বলে সম্ভাষণ করা।
৩. মাংসাহার যথাসম্ভব বর্জন করা এবং সম্পূর্ণ নিরামিষাশী জীবনযাপনকে উৎসাহিত করা।
৪. নিজের জন্মদিনে দরিদ্রদের অন্নদান করা এবং দানশীল হওয়া।
৫. সূর্য ও অগ্নির উপাসনা করা (এটি পারসিক ধর্মের প্রভাব ছিল)।
৬. বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং বিধবা বিবাহকে উৎসাহিত করা।
৫. দীন-ই-ইলাহীর অনুগামী এবং ব্যর্থতার কারণ
দীন-ই-ইলাহী কোনো গণ-ধর্ম ছিল না। আকবর কখনোই তলোয়ারের জোরে বা ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে কাউকে এই ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করেননি। এটি মূলত আকবরের দরবারের কিছু ঘনিষ্ঠ ও উচ্চপদস্থ অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আকবরের বিখ্যাত নবরত্ন সভার হিন্দু সদস্য বীরবল (Birbal) ছিলেন এই মতাদর্শের একমাত্র প্রধান হিন্দু অনুগামী। এছাড়া আবুল ফজল এবং ফৈজীর মতো মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ এর সদস্য ছিলেন।
আকবরের মৃত্যুর পর দীন-ই-ইলাহী খুব দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর কারণ হলো, এটি সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি হয়নি। এটি ছিল মূলত সম্রাটের প্রতি চরম রাজনৈতিক আনুগত্য এবং একটি উদার মননশীলতার চর্চা। সমসাময়িক গোঁড়া ঐতিহাসিক আব্দুল কাদির বদাউনি (Badauni) আকবরের এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং তাঁকে 'ইসলাম বিরোধী' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা বদাউনির এই সমালোচনাকে ধর্মান্ধতার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করেন।
তৃতীয় পর্ব: আকবরের নীতির ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
সম্রাট আকবরকে যদি কেবল একজন বিজেতা হিসেবে দেখা হয়, তবে তিনি চেঙ্গিজ খান বা আলেকজান্ডারের চেয়ে খুব একটা আলাদা ছিলেন না। কিন্তু আকবরকে ভারতের ইতিহাসে 'আকবর দ্য গ্রেট' (Akbar the Great) বলা হয় তাঁর তলোয়ারের জন্য নয়, বরং তাঁর মস্তিষ্কের জন্য।
তাঁর রাজপুত নীতি এবং দীন-ই-ইলাহী ছিল ষোড়শ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আধুনিক এবং সাহসী দুটি পদক্ষেপ।
রাজনৈতিক দূরদর্শিতা: তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হয়ে কোটি কোটি হিন্দু জনগণের ওপর জোরজুলুম করে রাজত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না। রাজপুতদের সাথে বন্ধুত্বের মাধ্যমে তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে একটি 'জাতীয় রূপ' দিয়েছিলেন। যে রাজপুতরা একসময় বাবর ও হুমায়ুনের প্রবল শত্রু ছিল, তারাই আকবরের সাম্রাজ্যের মজবুত স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল।
সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন: দীন-ই-ইলাহী হয়তো ধর্ম হিসেবে সফল হয়নি, কিন্তু এর মূল দর্শন 'সুলহ-ই-কুল' (সর্বজনীন শান্তি) ভারতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গেছে। এই নীতির ফলেই আকবরের রাজত্বকালে পারসি, সংস্কৃত এবং হিন্দি সাহিত্যের এক অভূতপূর্ব আদান-প্রদান ঘটেছিল। মহাভারত ও রামায়ণের ফারসি অনুবাদ (রজমনামা) সম্পন্ন হয়েছিল এই উদার পরিবেশের কারণেই।
পরবর্তীকালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব যখন আকবরের এই উদার ও পরমতসহিষ্ণু নীতি থেকে সরে গিয়ে কট্টর ধর্মান্ধতার পথ বেছে নেন, ঠিক তখনই সুবিশাল মোগল সাম্রাজ্যের পতনের ঘণ্টা বেজে যায়। আওরঙ্গজেবের রাজপুতদের শত্রু বানানো এবং জিজিয়া কর পুনরায় আরোপ করার সিদ্ধান্ত মোগলদের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছিল।
উপসংহার:
পরিশেষে একথা অনস্বীকার্য যে, সম্রাট আকবরের রাজপুত নীতি এবং ধর্মীয় দর্শন কোনো আকস্মিক খেয়ালের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল এক গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অসামান্য দূরদর্শিতা এবং ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে তোলার এক মাস্টারস্ট্রোক। তিনি কেবল মাটির সীমানা জয় করেননি, তিনি জয় করেছিলেন মানুষের হৃদয়। আর এই কারণেই ভারতের ইতিহাসে অশোকের পর সম্রাট আকবরই হলেন দ্বিতীয় শাসক, যিনি এক বিশাল বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী 'জাতীয় রাষ্ট্রে' পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।



0 মন্তব্যসমূহ