ভূমিকা:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাজমহলকে নিয়ে লিখেছিলেন, "কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল এ তাজমহল..."—অর্থাৎ মহাকালের গালের ওপর গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। যমুনা নদীর তীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই অনিন্দ্যসুন্দর শ্বেতপাথরের ইমারতটি কেবল ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য বিস্ময়। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক এর জ্যামিতিক নিখুঁততা এবং মায়াবী সৌন্দর্য দেখতে আগ্রায় ভিড় জমান। মানুষের চোখে তাজমহল হলো প্রেমের এক চিরন্তন প্রতীক।
কিন্তু পূর্ণিমার রাতে যমুনার জলে যখন তাজের শুভ্র প্রতিবিম্ব পড়ে, তখন তার আড়ালে যেন চাপা পড়ে যায় এক বুকফাটা হাহাকার। এই অপরূপ স্থাপত্যের নেপথ্যে জড়িয়ে আছে এক সম্রাটের সমস্ত কিছু হারানোর বেদনা, এক সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ এবং ক্ষমতার লোভে আপন সন্তানদের মধ্যে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গৃহযুদ্ধ। তাজমহল যতটা প্রেমের, তার চেয়েও অনেক বেশি বিষাদ, ট্র্যাজেডি আর নিঃসঙ্গতার।
আজকের এই মেগা আর্টিকেলে আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টে ফিরে যাব সেই সপ্তদশ শতাব্দীতে। জানব কীভাবে মিনা বাজারের এক কিশোরী আরজুমান্দ বানু হয়ে উঠলেন মমতাজ মহল, তাজমহল নির্মাণের পেছনে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়কর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্থাপত্যবিদ্যা, তাজমহল ঘিরে প্রচলিত কিছু মিথের আসল সত্য এবং জীবনের শেষ আটটি বছর নিজ পুত্রের হাতে বন্দি হয়ে সম্রাট শাহজাহানের সেই করুণ ও যন্ত্রণাদায়ক পরিণতি।
১. মিনা বাজারের সেই প্রথম দেখা: শাহজাদা খুররম ও আরজুমান্দ বানুর প্রেম
ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত এই প্রেমকাহিনির শুরুটা হয়েছিল ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে, আগ্রার রাজকীয় 'মিনা বাজার'-এ (Meena Bazaar)। তখন মোগল সিংহাসনে বসে আছেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। ১৬ বছরের কিশোর শাহজাদা খুররম (যিনি পরে শাহজাহান নামে পরিচিত হন) মিনা বাজারে ঘুরতে গিয়ে একটি কাঁচের পুঁতি ও রেশমের দোকানে থমকে দাঁড়ান। সেখানে পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন ১৫ বছরের এক অপরূপ রূপবতী পারসিক কিশোরী—আরজুমান্দ বানু বেগম (Arjumand Banu Begum)। তিনি ছিলেন সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভাই আসফ খানের কন্যা।
প্রথম দেখাতেই খুররম আরজুমান্দের প্রেমে পড়েন। তিনি তৎক্ষণাৎ বাবার কাছে গিয়ে আরজুমান্দকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু রাজকীয় রাজনীতি ও জ্যোতিষীদের গণনার কারণে এই জুটিকে বিয়ের জন্য দীর্ঘ পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয়। অবশেষে ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। আরজুমান্দের রূপ এবং গুণমুগ্ধ হয়ে খুররম তাঁর নাম দেন 'মমতাজ মহল' (Mumtaz Mahal), যার অর্থ হলো 'প্রাসাদের রত্ন' বা 'The Chosen One of the Palace'।
শাহজাহানের আরও স্ত্রী থাকলেও মমতাজই ছিলেন তাঁর জীবনের ধ্যান, জ্ঞান এবং সাম্রাজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি। মমতাজ শুধু অন্দরমহলেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি শাহজাহানের প্রতিটি সামরিক অভিযানে, এমনকি দুর্গম যুদ্ধের ময়দানেও তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকতেন। রাজকীয় সিলমোহর 'মুহর উজাহ'-এর দায়িত্বও ছিল মমতাজের হাতে। দীর্ঘ ১৯ বছরের বিবাহিত জীবনে মমতাজ ১৪ জন সন্তানের জন্ম দেন, যার মধ্যে মাত্র ৭ জন (৪ পুত্র ও ৩ কন্যা) জীবিত ছিলেন।
২. বুরহানপুরের তাঁবুতে এক বিষাদময় সন্ধ্যা: মমতাজের বিদায়
১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান মোগল সাম্রাজ্যের অধিপতি হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু তাঁর এই রাজকীয় সুখ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দ, সম্রাট শাহজাহান তখন দাক্ষিণাত্যের বিদ্রোহী খান জাহান লোদিকে দমন করার জন্য মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরে (Burhanpur) এক বিশাল সামরিক ক্যাম্প বা তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। তাঁর সাথে রয়েছেন গর্ভবতী সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল।
সেখানেই মমতাজ তাঁর ১৪তম সন্তান, কন্যা গওহরা বেগমকে জন্ম দিতে গিয়ে মারাত্মক প্রসবকালীন জটিলতা (Postpartum Hemorrhage) বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের শিকার হন। চিকিৎসকদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও মমতাজের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে, মৃত্যুর ঠিক আগে মমতাজ শাহজাহানের কাছে দুটি শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন: প্রথমত, সম্রাট যেন আর কখনো বিবাহ না করেন, এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এমন একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি।
১৬৩১ সালের ১৭ জুন মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মমতাজ মহলের মৃত্যু হয়। মমতাজের মৃত্যু শাহজাহানকে মানসিকভাবে পুরোপুরি চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। সমসাময়িক ঐতিহাসিক আবদুল হামিদ লাহোরির 'পাদশাহনামা' থেকে জানা যায়, মমতাজের মৃত্যুর পর শোকে মুহ্যমান সম্রাট টানা আট দিন নিজের কক্ষ থেকে বের হননি। তিনি রাজকীয় পোশাক, রত্ন, সুগন্ধি এবং সংগীত শোনা চিরতরে ত্যাগ করেন। শোকের তীব্রতায় মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সম্রাটের মাথার সমস্ত চুল ও দাড়ি সাদা হয়ে যায়। যে শাহজাহান ছিলেন এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, তিনি পরিণত হন এক বিষাদগ্রস্ত, নিঃসঙ্গ মানুষে।
মমতাজকে প্রথমে বুরহানপুরেই একটি বাগানে (জৈনাবাদ) সমাহিত করা হয়। প্রায় ছয় মাস পর তাঁর মরদেহ একটি সোনার কফিনে বন্দি করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আগ্রায় নিয়ে আসা হয় এবং যমুনার তীরে একটি ছোট অস্থায়ী গম্বুজের নিচে রাখা হয়, যেখানে শুরু হতে যাচ্ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্থাপত্যযজ্ঞ।
৩. তাজমহল নির্মাণের নেপথ্য ইতিহাস ও বিস্ময়কর স্থাপত্যবিদ্যা (Architectural Engineering):
মমতাজকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য শাহজাহান এমন একটি ইমারত বানাতে চেয়েছিলেন, যা হবে স্বর্গের বাগানের (Jannah) এক পার্থিব রূপ। এই নির্মাণের জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন আগ্রায় যমুনা নদীর ঠিক ডান তীরবর্তী একটি জমি, যা আগে রাজপুত রাজা জয় সিংয়ের সম্পত্তি ছিল।
তাজমহল কেবল একটি সুন্দর ইমারত নয়, এটি সপ্তদশ শতাব্দীর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্থাপত্যবিদ্যার এক চরম ও বিস্ময়কর মাস্টারপিস।
ভিত্তিপ্রস্তর ও মাটি পরীক্ষা (Foundation Engineering):
যমুনা নদীর একেবারে গা ঘেঁষে এত বিশাল ও ভারী শ্বেতপাথরের ইমারত তৈরি করাটা ছিল তৎকালীন স্থপতিদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নদীর তীরের নরম মাটি ও বালির ওপর সাধারণ ভিত তৈরি করলে তা যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারত। এই সমস্যা সমাধানের জন্য স্থপতিরা 'ওয়েল ফাউন্ডেশন' (Well Foundation) বা কুয়া-ভিত্তি পদ্ধতির আশ্রয় নেন।
তারা মাটির অনেক গভীরে পর পর একাধিক বিশাল কুয়া খনন করে সেগুলোকে পাথর, নুড়ি এবং বিশেষ এক ধরনের কাঠ (মেহগনি ও আবলুস বা Ebony wood) দিয়ে ভরাট করেন। এই আবলুস কাঠের একটি অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য হলো—এটি জলে ভিজে থাকলে পচে যায় না, বরং নদীর আর্দ্রতা শুষে নিয়ে সময়ের সাথে সাথে আরও পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে। যমুনা নদীর জলধারা আজও এই কাঠের ভিতগুলোকে আর্দ্রতা জুগিয়ে তাজমহলকে মজবুত করে রেখেছে!
নির্মাণ সামগ্রী ও জ্যামিতিক নিখুঁততা:
সমগ্র তাজমহল তৈরি হয়েছে রাজস্থানের মাকরানা (Makrana) খনি থেকে আনা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মানের ট্রান্সলুসেন্ট বা ঈষদচ্ছ শ্বেতপাথর দিয়ে। এই পাথর সূর্যের আলো ও চাঁদের আলোতে ভিন্ন ভিন্ন রঙ ধারণ করে—ভোরে হালকা গোলাপি, দুপুরে চকচকে সাদা এবং পূর্ণিমার রাতে সোনালি আভা ছড়ায়।
তাজমহলের দেওয়ালে 'পিয়েত্রা দুরা' (Pietra Dura) বা রত্ন-খচিত নকশা করার জন্য চীন থেকে জেড (Jade) ও স্ফটিক, তিব্বত থেকে ফিরোজা, আফগানিস্তান থেকে ল্যাপিস লাজুলি (Lapis Lazuli), এবং শ্রীলঙ্কা থেকে নীলকান্তমণি আনা হয়েছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ২৮ ধরনের মহামূল্যবান রত্ন শ্বেতপাথরের গায়ে নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছিল।
তাজমহলের চারপাশের চারটি মিনার একেবারে সোজা ৯০০ (90 Degree) কোণে দাঁড়িয়ে নেই। এগুলোকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বাইরের দিকে সামান্য হেলিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এটি একাধারে 'অপটিক্যাল ইলিউশন' (যাতে দূর থেকে দেখলে মিনারগুলো একদম সোজা মনে হয়) তৈরি করেছে, এবং অন্যদিকে ভূমিকম্প হলে মিনারগুলো যেন মূল গম্বুজের ওপর না পড়ে বাইরের দিকে ভেঙে পড়ে, সেই ইঞ্জিনিয়ারিং সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রধান স্থপতি ছিলেন ওস্তাদ আহমদ লাহোরি (Ustad Ahmad Lahauri)। প্রায় ২২ হাজার শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, ক্যালিগ্রাফার এবং এক হাজার হাতির টানা ২২ বছরের (১৬৩২-১৬৫৩) অক্লান্ত পরিশ্রমে এই মহাকাব্যিক স্মৃতিসৌধটি পূর্ণতা পায়।
৪. তাজমহল ঘিরে প্রচলিত বিতর্কিত মিথ ও তার সত্যতা:
তাজমহল যত বিখ্যাত হয়েছে, একে ঘিরে লোকমুখে তত বেশি কল্পকাহিনি বা মিথ (Myth) তৈরি হয়েছে। ইতিহাস ঘাঁটলে এই মিথগুলোর বাস্তব সত্যতা কিন্তু অন্য কথা বলে।
মিথ ১: কারিগরদের হাত কেটে ফেলা হয়েছিল!
সবচেয়ে জনপ্রিয় মিথ হলো, তাজমহল নির্মাণ শেষ হওয়ার পর শাহজাহান নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন প্রধান স্থপতি ও শ্রমিকদের হাত কেটে ফেলা হয়, যাতে তারা পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো তাজমহল বানাতে না পারে।
সত্যতা: ঐতিহাসিকদের মতে, এটি সম্পূর্ণ একটি কাল্পনিক গল্প। এর সপক্ষে মোগল ইতিহাসে বা সমসাময়িক কোনো বিদেশি পর্যটকের লেখায় বিন্দুমাত্র প্রমাণ নেই। বরং ইতিহাস বলে, তাজমহলের প্রধান স্থপতি ওস্তাদ আহমদ লাহোরি তাজমহল শেষ হওয়ার পরেও শাহজাহানের নির্দেশে দিল্লির 'লালকেল্লা' (Red Fort) নির্মাণের কাজ করেছিলেন। এছাড়া শাহজাহান তাজমহলের কারিগরদের থাকার জন্য আগ্রায় 'তাজ গঞ্জ' (Taj Ganj) নামে একটি আস্ত শহর তৈরি করে দিয়েছিলেন, যা আজও টিকে আছে। হাত কাটার বদলে তিনি মূলত কারিগরদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন (Non-disclosure agreement-এর মতো) যেন তারা অন্য কোনো রাজকীয় ইমারত হুবহু এমন নকশায় না বানান।
মিথ ২: কালো তাজমহল (The Black Taj Mahal):
বলা হয় শাহজাহান যমুনার ঠিক অপর তীরে নিজের জন্য একটি সম্পূর্ণ কালো মার্বেল পাথরের তাজমহল বানাতে চেয়েছিলেন।
সত্যতা: এই তত্ত্বটির জন্ম দিয়েছিলেন ফরাসি পর্যটক জঁ-বাপতিস্ত তাভের্নিয়ে (Jean-Baptiste Tavernier), যিনি ১৬৬৫ সালে আগ্রায় এসেছিলেন। যমুনার ওপারে 'মেহতাব বাগ'-এ কিছু কালো পাথরের ধ্বংসাবশেষ দেখে এই ধারণার সৃষ্টি হয়। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননে (১৯৯০-এর দশকে) প্রমাণিত হয়েছে যে, ওগুলো কালো মার্বেল নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলায় কালো হয়ে যাওয়া সাধারণ শ্বেতপাথর। শাহজাহানের এমন কোনো পরিকল্পনার কথা মোগল নথিপত্রে পাওয়া যায় না।
৫. তাজমহল নির্মাণের বিপুল ব্যয় ও সাম্রাজ্যের অর্থনীতি:
ভালোবাসার এই নিদর্শনের জন্য মোগল সাম্রাজ্যকে চরম অর্থনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়েছিল। ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে তাজমহল সম্পূর্ণ হওয়ার পর হিসাব করে দেখা যায়, এর পেছনে রাজকোষ থেকে খরচ হয়েছিল প্রায় ৩ কোটি ২০ লক্ষ রুপি! আজকের দিনের মুদ্রাস্ফীতি ও সোনার দামের সাথে তুলনা করলে এই অংকটি প্রায় ৭০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের (কয়েক হাজার কোটি টাকা) সমতুল্য!
শাহজাহানের রাজত্বকালকে মোগল সাম্রাজ্যের 'সুবর্ণযুগ' বলা হলেও, স্থাপত্যের পেছনে এই লাগামহীন ব্যয়ের কারণে রাজকোষে মারাত্মক টান পড়েছিল। সাধারণ কৃষকদের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং দাক্ষিণাত্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, শাহজাহানের এই অতিরিক্ত স্থাপত্য-প্রীতিই পরোক্ষভাবে মোগল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক পতনের বীজ বপন করেছিল।
৬. উত্তরাধিকারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ: সিংহাসন যখন অভিশাপ
তাজমহলের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক বছর পরই শাহজাহানের জীবনে নেমে আসে ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে সম্রাট শাহজাহান হঠাৎ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যু আসন্ন ভেবে তাঁর চার পুত্র—দারা শিকোহ, সুজা, আওরঙ্গজেব এবং মুরাদের মধ্যে মোগল সিংহাসন দখলের জন্য এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ (War of Succession) শুরু হয়।
শাহজাহানের সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ও ঘোষিত উত্তরাধিকারী ছিলেন দারা শিকোহ (Dara Shikoh), যিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার এবং সুফি মতাদর্শের অনুসারী। কিন্তু তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব (Aurangzeb) ছিলেন অত্যন্ত ধুরন্ধর, ক্ষমতালোভী এবং দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। আওরঙ্গজেব একে একে নিজের ভাইদের পরাজিত ও হত্যা করতে শুরু করেন।
১৬৫৮ সালের সামুগড়ের যুদ্ধে আওরঙ্গজেব দারার বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। এরপর আওরঙ্গজেব সোজা আগ্রা দুর্গে প্রবেশ করে নিজের জন্মদাতা পিতা সম্রাট শাহজাহানকে বন্দি করেন এবং নিজে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। শাহজাহানের চোখের সামনেই আওরঙ্গজেব দারা শিকোহকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেন এবং দারার কাটা মুন্ডুটি একটি বাক্সে ভরে উপহার হিসেবে শাহজাহানের কাছে পাঠান। ক্ষমতার এই নিষ্ঠুর খেলায় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর সম্রাট এক নিমেষে পরিণত হলেন নিজ প্রাসাদের এক অসহায় বন্দিতে।
৭. আগ্রা দুর্গের মুসম্মন বুর্জ: এক সম্রাটের নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন ও বিদায়
১৬৫৮ থেকে ১৬৬৬—জীবনের শেষ আটটি দীর্ঘ বছর সম্রাট শাহজাহানকে কাটাতে হয়েছিল আগ্রা দুর্গের (Agra Fort) একটি ছোট সুদৃশ্য ব্যালকনি বা প্রাসাদে বন্দি অবস্থায়, যার নাম 'মুসম্মন বুর্জ' (Muasamman Burj)।
একসময় যিনি কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন, তিনি এখন কেবল নিজের স্মৃতি আর চোখের জলের সম্বল নিয়ে বেঁচে রইলেন। এই চরম দুর্দিনে তাঁর পাশে কোনো পুত্র বা সাম্রাজ্যের কেউ ছিল না, কেবল তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা জাহানারা বেগম (Jahanara Begum) নিজের ইচ্ছায় বাবার সাথে বন্দিজীবন বরণ করে নিয়েছিলেন তাঁর সেবা করার জন্য। আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শাহজাহানকে সাধারণ বন্দিদের মতোই রাখা হতো, এমনকি তাঁর চিঠিপত্র লেখার কালিও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
মুসম্মন বুর্জের ঠিক উল্টোদিকেই যমুনার বাঁকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল তাজমহল। কথিত আছে, শাহজাহান তাঁর বন্দিজীবনের প্রতিটি দিন এবং রাত ওই ব্যালকনিতে বসে দূরে তাজমহলের দিকে তাকিয়ে কাটিয়েছিলেন, যেখানে ঘুমিয়ে ছিল তাঁর প্রিয়তমা মমতাজ। বয়সের ভারে এবং একটানা কান্নার কারণে জীবনের শেষদিকে শাহজাহানের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। সরাসরি তাজমহল দেখতে না পেয়ে তিনি মুসম্মন বুর্জের দেওয়ালে বসানো একটি বিশাল হীরকের (Diamond) টুকরোর প্রতিফলনে তাজের ছায়া দেখতেন।
অবশেষে ১৬৬৬ সালের ২২ জানুয়ারি, ৭৪ বছর বয়সে দীর্ঘ অসুস্থতার পর শাহজাহান এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময়ও তাঁর চোখ নিবদ্ধ ছিল যমুনার ওপারে থাকা ওই শ্বেতপাথরের স্মৃতিসৌধটির দিকে।
একজন সম্রাটের মৃত্যুতে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্মান ও তোপধ্বনি করার কথা, আওরঙ্গজেব তার কিছুই করতে দেননি। কোনো রাজকীয় জাঁকজমক ছাড়াই, রাতের অন্ধকারে কয়েকজন সাধারণ প্রহরী ও সাধারণ মানুষের কাঁধে চেপে শাহজাহানের কফিন নিয়ে যাওয়া হয় তাজমহলে। সেখানে মমতাজ মহলের ঠিক পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তাজমহলের ভেতরে গেলে একটি অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ে। পুরো তাজমহলের প্রতিটি জিনিস জ্যামিতিকভাবে নিখুঁত প্রতিসাম্য (Perfect Symmetry) মেনে তৈরি। গম্বুজ থেকে শুরু করে বাগান—সবকিছুর ডান ও বাম দিক হুবহু এক। কিন্তু মূল সমাধিকক্ষে মমতাজের কবরটি রয়েছে একদম ঠিক মাঝখানে, আর শাহজাহানের কবরটি রয়েছে তার একপাশে একটু অসমানভাবে। আওরঙ্গজেবের এই একটি সিদ্ধান্তই তাজমহলের জ্যামিতিক নিখুঁততাকে ভেঙে দিয়েছিল, যা আজও শাহজাহানের ট্র্যাজিক পরিণতির নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
উপসংহার:
তাজমহল কেবল ইট, পাথর আর চুন-সুরকির কোনো ইমারত নয়। এটি হলো মানুষের আবেগের এমন এক পরাবাস্তব প্রকাশ, যেখানে প্রেম, বিরহ, শিল্প, সম্পদ এবং ক্ষমতার চরম ট্র্যাজেডি এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। সম্রাট শাহজাহান হয়তো অনেক ভুল করেছিলেন, হয়তো তাঁর অতিরিক্ত আবেগ সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিয়েছিল, কিন্তু তিনি পৃথিবীকে এমন একটি উপহার দিয়ে গেছেন, যা সময়ের সাথে সাথে পুরোনো হয় না।
আগ্রা দুর্গের সেই মুসম্মন বুর্জ আজ নিঃশব্দ। শাহজাহান এবং মমতাজ মহলের সেই পার্থিব প্রেম এখন মহাকালের গর্ভে বিলীন। কিন্তু যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা তাজমহল আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সময়, ক্ষমতা এবং সাম্রাজ্য একদিন ধুলোয় মিশে যায়, কিন্তু মানুষের সত্যিকারের ভালোবাসার চিহ্ন কালের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দুর মতোই অমর হয়ে থাকে।





0 মন্তব্যসমূহ