ভূমিকা:
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু দিন বা ক্ষণ থাকে, যা কেবল একটি রাজবংশের পতন ঘটায় না, বরং একটি আস্ত মহাদেশের আগামী কয়েক শতকের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের ২১শে এপ্রিল দিনটি ছিল ঠিক তেমনই এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। উত্তর ভারতের তপ্ত রোদে পানিপথের বিশাল প্রান্তরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর সামরিক বাহিনী। একদিকে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদির লক্ষাধিক সেনার বিশাল পদাতিক ও দুর্ধর্ষ হস্তীবাহিনী; অন্যদিকে মধ্য এশিয়া থেকে আসা এক ঘরছাড়া, রাজ্যহারা রাজপুত্রের মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার সেনার এক পরিশ্রান্ত অথচ সুশৃঙ্খল দল।
কিন্তু সেই দিন পানিপথের প্রান্তরে যা ঘটেছিল, তা তৎকালীন ভারতীয়দের কাছে ছিল এক চরম বিস্ময়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের অহংকার ধুলোয় মিশে যায়, আর ভারতের মাটিতে জন্ম নেয় এমন এক নতুন সাম্রাজ্য, যা আগামী ৩৩১ বছর ধরে এই উপমহাদেশ শাসন করবে। হ্যাঁ, আমরা মোগল সাম্রাজ্য (Mughal Empire) এবং তার প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের (Babur) কথা বলছি।
কীভাবে একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত ভিনদেশি যোদ্ধা মাত্র কয়েক হাজার সেনা নিয়ে ভারতের মতো এক বিশাল ভূখণ্ডের অধিপতি হলেন? কোন জাদুবলে তিনি ইব্রাহিম লোদির বিশাল বাহিনীকে মাটিতে মিশিয়ে দিলেন? আজ আমরা বাবরের উত্থান, পানিপথের প্রথম যুদ্ধের নিখুঁত রণকৌশল, এবং তাঁর বর্ণময় জীবনের প্রতিটি রোমাঞ্চকর অধ্যায় অত্যন্ত বিশদভাবে জানব।
১. বাবরের জন্ম, বংশপরিচয় এবং ফারগানার দিনগুলো:
১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারি, বর্তমান উজবেকিস্তানের ফারগানা (Fergana) প্রদেশের রাজধানী আন্ধিজানে জন্ম নেন জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর। তাঁর ধমনীতে বইত মধ্য এশিয়ার দুই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং দুর্ধর্ষ বিজেতার রক্ত। বাবার দিক থেকে তিনি ছিলেন তৈমুর লঙের (Timur) পঞ্চম বংশধর, আর মায়ের দিক থেকে ছিলেন দুর্ধর্ষ মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিজ খানের (Genghis Khan) চতুর্দশ বংশধর। অর্থাৎ, জন্মসূত্রেই সমরকুশলতা এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসা তাঁর রক্তে মিশে ছিল। আরবি ভাষায় 'বাবর' শব্দের অর্থ হলো 'বাঘ' (Tiger), আর তাঁর জীবনও ছিল ঠিক একটি লড়াকু বাঘের মতোই।
১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে এক অদ্ভুত দুর্ঘটনায় (পায়রা ওড়াতে গিয়ে ছাদ ভেঙে) বাবরের পিতা উমর শেখ মির্জার মৃত্যু হয়। মাত্র ১১ বছর বয়সে পিতৃহীন বাবর ফারগানার সিংহাসনে বসেন। কিন্তু সেই সিংহাসন মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তাঁর নিজের আত্মীয়স্বজন এবং উজবেক নেতা শৈবানি খান পদে পদে তাঁর রাজ্য কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত শুরু করে।
২. সমরকন্দ দখলের স্বপ্ন এবং যাযাবর জীবন:
বাবরের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুর লঙের রাজধানী 'সমরকন্দ' (Samarkand) দখল করা। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে সমরকন্দের মতো সুন্দর শহর পৃথিবীতে আর দুটি নেই। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথমবার সমরকন্দ দখল করেন, কিন্তু ১০০ দিন পার হওয়ার আগেই ফারগানায় বিদ্রোহের খবর পেয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। এর ফলে তিনি সমরকন্দ তো হারালেনই, সাথে হাতছাড়া হয়ে গেল নিজের পৈতৃক রাজ্য ফারগানাও।
১৫০১ সালে তিনি পুনরায় সমরকন্দ দখল করেন, কিন্তু এবার উজবেক নেতা শৈবানি খানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। এরপর শুরু হয় বাবরের জীবনের চরম কষ্টের যাযাবর অধ্যায়। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে লিখেছেন, "আমার কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয় ছিল না, আর আমার সাথে থাকা মুষ্টিমেয় অনুচরদের পরনে ভালো পোশাকও ছিল না।" বছরের পর বছর পাহাড় ও মরুভূমিতে ঘুরে বেড়িয়ে, চরম দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার স্বাদ পেয়ে বাবর অত্যন্ত বাস্তববাদী ও পোড়খাওয়া এক সেনাপতিতে পরিণত হন।
১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে ভাগ্য কিছুটা সহায় হয়। তিনি বিনা বাধায় আফগানিস্তানের কাবুল (Kabul) দখল করেন। কাবুলে বসে তিনি বুঝতে পারেন যে মধ্য এশিয়ার রাজনীতিতে উজবেকদের বিরুদ্ধে টিকে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাই তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুরের দেখানো পথ ধরে চোখ ফেরান দক্ষিণ-পূর্ব দিকে—ঐশ্বর্যময় ভারতবর্ষের দিকে।
৩. প্রাক-মোগল যুগের ভারতবর্ষ: এক টুকরো টুকরো রাজনৈতিক মানচিত্র
ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। সমগ্র দেশ তখন অসংখ্য ছোট-বড় স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন বলে কিছু ছিল না।
দিল্লির সিংহাসনে তখন অধিষ্ঠিত ছিলেন লোদীয় বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদি (Ibrahim Lodi)। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বদমেজাজি, অহংকারী এবং সন্দেহবাতিকগ্রস্ত একজন শাসক। তাঁর অত্যাচারে দিল্লির অভিজাত আফগান আমিররা চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তাঁর নিজের আত্মীয়দেরও ছাড়তেন না।
এই চরম অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালার কাজটি করেন পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খান লোদি এবং ইব্রাহিম লোদির নিজের কাকা আলম খান লোদি। তাঁরা গোপনে কাবুলে বাবরের কাছে দূত পাঠান এবং ইব্রাহিম লোদিকে পরাস্ত করার জন্য বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। অন্যদিকে, মেবারের পরাক্রমশালী রাজপুত রাজা রানা সাঙ্গাও (Rana Sanga) বাবরকে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। তাদের ধারণা ছিল, বাবর হয়তো তৈমুর লঙের মতোই দিল্লি লুটপাট করে প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে কাবুলে ফিরে যাবেন এবং এই শূন্যতার সুযোগে তারা দিল্লির ক্ষমতা দখল করবে। কিন্তু বাবর যে এ দেশে পাকাপাকিভাবে থাকার জন্যই আসছেন, তা তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি!
৪. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (২১শে এপ্রিল, ১৫২৬):
দৌলত খান লোদির আমন্ত্রণ পেয়ে বাবর ১৫২৫ সালের শেষের দিকে এক সুশিক্ষিত বাহিনী নিয়ে সিন্ধু নদ পার হন। পথে দৌলত খান লোদি বিশ্বাসঘাতকতা করলে বাবর তাঁকে পরাজিত করে পাঞ্জাব দখল করেন এবং সরাসরি দিল্লির দিকে অগ্রসর হন।
১৫২৬ সালের এপ্রিলে দিল্লির অদূরে পানিপথের (বর্তমান হরিয়ানা রাজ্যে অবস্থিত) সুবিশাল প্রান্তরে বাবরের বাহিনী এসে পৌঁছায়। অন্যদিকে এই খবর পেয়ে ইব্রাহিম লোদিও তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। শুরু হয় ইতিহাসের সেই বিখ্যাত 'পানিপথের প্রথম যুদ্ধ' (First Battle of Panipat)।
ক) দুই বাহিনীর তুলনামূলক পার্থক্য:
ইব্রাহিম লোদির বাহিনী ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক বিশাল সমুদ্র। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর বাহিনীতে প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য এবং ১ হাজার রণহস্তী (Elephants) ছিল। অন্যদিকে বাবরের বাহিনীতে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার। কিন্তু বাবরের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সেনাদের কঠোর শৃঙ্খলা, তাঁর নিজের অসামান্য নেতৃত্ব এবং এমন কিছু আধুনিক সমরকৌশল যা ভারতীয়রা আগে কখনো দেখেনি।
খ) 'তুলঘুমা' বা চক্রব্যূহ কৌশল (Tulughma Tactic):
বাবর জানতেন যে সরাসরি আক্রমণ করলে ইব্রাহিমের বিশাল বাহিনীর কাছে তিনি খড়কুটোর মতো উড়ে যাবেন। তাই তিনি উজবেকদের কাছ থেকে শেখা 'তুলঘুমা' কৌশল প্রয়োগ করেন। তিনি তাঁর পুরো বাহিনীকে ডান, বাম, মধ্য এবং রিজার্ভ—এই কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। যুদ্ধের সময় ডান ও বাম দিকের অশ্বারোহী বাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শত্রুপক্ষের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলত। এটি ছিল এক প্রকার মরণফাঁদ।
গ) 'আরবা' বা গরুর গাড়ির ব্যারিকেড (Araba Strategy):
এটি ছিল বাবরের প্রতিরক্ষামূলক কৌশল। তিনি ৭০০টি গরুর গাড়ি (Carts) সংগ্রহ করে চামড়ার মজবুত দড়ি দিয়ে সেগুলোকে একে অপরের সাথে বেঁধে দেন এবং যুদ্ধের ময়দানে একদম সামনের সারিতে ঢাল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেন। গাড়িগুলোর মাঝখানে ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছিল, যেখান থেকে বন্দুকধারীরা নিরাপদে গুলি চালাতে পারত। এই গরুর গাড়ির প্রাচীর ভেদ করে ভেতরে ঢোকার ক্ষমতা ইব্রাহিমের হাতিদের ছিল না।
ঘ) বারুদ, কামান এবং উস্তাদ আলির ম্যাজিক:
পানিপথের প্রথম যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ভারতে প্রথমবারের মতো 'কামান' (Cannons) এবং 'ম্যাচলক' বা গাদাবন্দুকের (Matchlocks) সুপরিকল্পিত ব্যবহার। বাবরের কাছে দুজন বিশ্বমানের তুর্কি গোলন্দাজ বিশেষজ্ঞ ছিলেন—উস্তাদ আলি কুলি (Ustad Ali Quli) এবং মুস্তাফা রুমি (Mustafa Rumi)।
যুদ্ধের ময়দানের আসল চিত্র:
২১শে এপ্রিল সকালে যুদ্ধ শুরু হলে ইব্রাহিম লোদির বিশাল বাহিনী অন্ধের মতো গরুর গাড়ির প্রাচীরের দিকে তেড়ে আসে। প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে তারা থমকে দাঁড়াতেই বাবর তাঁর 'তুলঘুমা' কৌশল কাজে লাগিয়ে ডান ও বাম দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে উস্তাদ আলি এবং মুস্তাফা রুমির কামানগুলো বিকট শব্দে আগুন উগড়ে দিতে শুরু করে।
ভারতীয় হাতিরা এর আগে কখনো কামানের এত বিকট শব্দ শোনেনি। আগুনের গোলা এবং বিকট শব্দে হাতিগুলো পাগল হয়ে যায় এবং পেছন দিকে ঘুরে গিয়ে নিজেদের অর্থাৎ ইব্রাহিম লোদির সৈন্যদেরই পিষে মারতে শুরু করে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লোদির বিশাল বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সুলতান ইব্রাহিম লোদি বীরের মতো যুদ্ধ করে যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ হারান। দিল্লির সুলতানি ইতিহাসে তিনিই একমাত্র শাসক যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গিয়েছিলেন। বাবর এক অভাবনীয় জয় লাভ করে দিল্লি এবং আগ্রা দখল করেন।
৫. রানা সাঙ্গা এবং খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭ খ্রিস্টাব্দ):
পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভ করলেও বাবরের অবস্থান মোটেও নিরাপদ ছিল না। তাঁর সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান মেবারের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজপুত বীর রানা সাঙ্গা (সংগ্রাম সিংহ)। রানা সাঙ্গা বুঝতে পেরেছিলেন বাবর ভারত ছাড়বেন না, তাই তিনি রাজপুত রাজাদের এক বিশাল জোট তৈরি করে বাবরকে ভারত থেকে বিতাড়িত করার শপথ নেন।
১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে আগ্রার কাছে খানুয়ার প্রান্তরে (Battle of Khanwa) দুই বাহিনীর মোকাবিলা হয়। রানা সাঙ্গার বিশাল বাহিনী এবং বীরত্বের কথা শুনে বাবরের সৈন্যদের মনে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেক সৈন্য কাবুল ফিরে যেতে চায়। এই সংকটময় মুহূর্তে বাবর তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক চালটি চালেন।
তিনি তাঁর সৈন্যদের সামনে এক আবেগঘন ভাষণ দেন এবং এই যুদ্ধকে 'জিহাদ' (Jihad) বা ধর্মযুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি শপথ নেন যে জীবনে আর কখনো মদ ছোঁবেন না এবং সমস্ত মদের পাত্র ও পেয়ালা সৈন্যদের সামনে ভেঙে ফেলেন। তিনি তাঁর মুসলিম প্রজাদের ওপর থেকে 'তমঘা' (Tamgha) নামক বাণিজ্য কর তুলে নেন। বাবরের এই নাটকীয় ভাষণে সৈন্যদের মনোবল ফিরে আসে।
খানুয়ার যুদ্ধেও বাবর তাঁর পানিপথের সেই পরীক্ষিত 'তুলঘুমা' এবং কামানের ব্যবহার করেন। রাজপুতরা অসীম বীরত্বে যুদ্ধ করলেও কামানের গোলার সামনে তলোয়ার ও বর্শা ধোপে টেকেনি। রানা সাঙ্গা গুরুতর আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন এবং বাবর এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে 'গাজী' (Gazi) উপাধি ধারণ করেন। খানুয়ার যুদ্ধ পানিপথের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছিল যে আগামী কয়েক শতাব্দী ভারতে মোগলদের রাজত্ব কেউ আটকাতে পারবে না।
৬. চান্দেরি এবং ঘর্ঘরার যুদ্ধ (চূড়ান্ত আধিপত্য বিস্তার):
খানুয়ার যুদ্ধের পর বাবরকে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে নামতে হয় তাঁর সাম্রাজ্যকে সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক করার জন্য।
চান্দেরির যুদ্ধ (Battle of Chanderi, ১৫২৮): রানা সাঙ্গার এক বিশ্বস্ত সেনাপতি মেদিনী রায় চান্দেরি দুর্গ দখল করে বসেছিলেন। বাবর অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করে একদিনের মধ্যে এই দুর্ভেদ্য দুর্গটি অধিকার করেন। রাজপুত নারীরা এই যুদ্ধেও জওহর ব্রত পালন করে নিজেদের সম্মান রক্ষা করেন।
ঘর্ঘরার যুদ্ধ (Battle of Ghaghra, ১৫২৯): পানিপথে ইব্রাহিম লোদি মারা গেলেও পূর্ব ভারতে (বিহার ও বাংলায়) আফগানদের ক্ষমতা তখনও প্রবল ছিল। সুলতান মাহমুদ লোদি এবং বাংলার সুলতান নুসরত শাহের যৌথ বাহিনীকে বাবর বিহারের ঘর্ঘরা নদীর তীরে পরাস্ত করেন। এটি ছিল মধ্যযুগের প্রথম যুদ্ধ যা একই সাথে জল এবং স্থল—উভয় জায়গাতেই লড়া হয়েছিল।
এই তিনটি চূড়ান্ত বিজয়ের পর বাবর আফগানিস্তানের কাবুল থেকে শুরু করে ভারতের বিহার পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্যের নিরঙ্কুশ অধিপতি হয়ে বসেন।
৭. সংস্কৃতি, সাহিত্য ও তুজুক-ই-বাবরি (বাবরনামা):
বাবর কেবল একজন রূঢ় যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুশিক্ষিত, সংস্কৃতিবান এবং পরিশীলিত রুচির মানুষ। তিনি তুর্কি ভাষায় অসামান্য দক্ষতা রাখতেন। তাঁর লেখা আত্মজীবনী 'তুজুক-ই-বাবরি' (Tuzuk-i-Baburi) বা 'বাবরনামা' বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাঁর আত্মজীবনী পড়লে বোঝা যায় যে তিনি কতটা তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি ভারতের গরম আবহাওয়া, ধুলোবালি এবং শিল্পের অভাব নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, "হিন্দুস্তানের সবচেয়ে ভালো দিক হলো এটি একটি বিশাল দেশ এবং এখানে প্রচুর সোনা ও রুপা পাওয়া যায়।" তিনি ভারতের নদী, পাহাড়, গাছপালা, পশু-পাখি (যেমন- হাতি, গন্ডার, ময়ূর) সম্পর্কে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে লিখেছেন।
এছাড়া বাবর ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। তিনি ভারতে জ্যামিতিক নকশার চারবাগ (Charbagh) বা বাগিচা তৈরির প্রথা চালু করেন। আগ্রার 'আরামবাগ' (Aram Bagh) তাঁরই তৈরি করা একটি বিখ্যাত বাগান।
৮. কহিনুর হীরা এবং হুমায়ুনের প্রতি পিতার অসীম ভালোবাসা:
পানিপথের যুদ্ধের পর বাবরের জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ুন যখন আগ্রা দখল করেন, তখন গোয়ালিয়রের রাজপরিবার হুমায়ুনকে একটি মহামূল্যবান হীরা উপহার দেয়। এটিই ছিল সেই বিশ্ববিখ্যাত 'কহিনুর হীরা' (Koh-i-Noor)। বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে এই হীরার দাম এত বেশি যে, তা দিয়ে পুরো পৃথিবীর মানুষের আড়াই দিনের খাবার জোগানো সম্ভব! হুমায়ুন হীরাটি বাবরকে উপহার দিলেও, বাবর খুশি হয়ে সেটি হুমায়ুনকেই ফিরিয়ে দেন।
বাবার প্রতি ছেলের এবং ছেলের প্রতি বাবার ভালোবাসার এক অদ্ভুত উপাখ্যান ইতিহাসে প্রচলিত আছে। ১৫৩০ সালে হুমায়ুন এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা যখন হাল ছেড়ে দেন, তখন সুফি সাধকদের পরামর্শে বাবর হুমায়ুনের বিছানার চারদিকে তিনবার প্রদক্ষিণ করেন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, "হে আল্লাহ! আমার ছেলের সমস্ত রোগ আমাকে দিয়ে দিন, আর আমার আয়ু তাকে দিন।" আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরপর থেকেই হুমায়ুন ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করেন এবং বাবর মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন।
৯. বিদায়বেলা (এক যাযাবর সম্রাটের প্রয়াণ ও মূল্যায়ন):
১৫৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে ডিসেম্বর, মাত্র ৪৭ বছর বয়সে আগ্রায় জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি হুমায়ুনকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যে সে যেন কখনো তার ভাইদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বা নিষ্ঠুর আচরণ না করে।
প্রাথমিকভাবে বাবরকে আগ্রার আরামবাগে সমাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী, প্রায় ৯ বছর পর তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে তাঁর প্রিয় বাগান 'বাগ-ই-বাবর' (Bagh-e-Babur)-এ স্থানান্তরিত করা হয়। আজও সেই খোলা আকাশের নিচে পাহাড়ি পরিবেশে ঘুমিয়ে আছেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।
উপসংহার:
জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের জীবন ছিল এক অদ্ভুত রোলার কোস্টার রাইড। যে ছেলেটি মাত্র ১১ বছর বয়সে সিংহাসনে বসে আজীবন আপনজনদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল, যে বারবার নিজের দেশ থেকে বিতারিত হয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে, সেই ছেলেটিই নিজের অদম্য সাহস, প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং অসাধারণ সামরিক কৌশলের জোরে এক নতুন ইতিহাস রচনা করে গেছেন।
তিনি ভারতে এমন এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যারা কেবল শাসনই করেনি, বরং ভারতের শিল্প, স্থাপত্য (তাজমহল বা লালকেল্লার মতো নিদর্শন), খাদ্যাভ্যাস এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে চিরকালের জন্য মিশে গেছে। বাবর হয়তো ভারতে খুব বেশিদিন শাসন করার সুযোগ পাননি, কিন্তু পানিপথের প্রান্তরে তিনি যে বীজ বপন করে গিয়েছিলেন, তা মহামতি আকবর, জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানের মতো সম্রাটদের হাত ধরে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছিল।








0 মন্তব্যসমূহ