ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের উত্থান এবং আফজল খাঁ বধ: মারাঠা সাম্রাজ্যের রক্তক্ষয়ী বীরত্বগাথা

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ (১৬৩০-১৬৮০)

ভূমিকা:

সপ্তদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষ। উত্তর ভারত তখন প্রবল প্রতাপশালী মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে, আর দক্ষিণ ভারত বা দাক্ষিণাত্য শাসিত হচ্ছে বিজাপুর, গোলকুণ্ডা এবং আহমেদনগরের সুলতানদের দ্বারা। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যের কৃষিজীবী মারাঠারা তখন কেবলই এই সুলতানদের সেনাবাহিনীতে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করত অথবা বিনা প্রতিবাদে অত্যাচার সহ্য করত। চারদিকে যখন পরাধীনতা আর চরম হতাশার অন্ধকার, ঠিক তখনই মহারাষ্ট্রের সহ্যাদ্রি পর্বতমালার রুক্ষ ও দুর্গম প্রকৃতি থেকে জন্ম নিল এক অবিস্মরণীয় বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ। এই স্ফুলিঙ্গের নাম ছিল শিবাজী ভোঁসলে—যিনি পরবর্তীকালে পরিচিত হন 'ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ' নামে।

ইতিহাসের পাতায় শিবাজী মহারাজ কেবল একজন নিছক সাম্রাজ্য বিস্তারকারী রাজা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি সেই অন্ধকার যুগে 'হিন্দবি স্বরাজ্য' (Hindavi Swarajya) বা নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর উত্থানের কাহিনি কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। বিশেষ করে বিজাপুরের পরাক্রমশালী সেনাপতি আফজল খাঁ-কে বধ করার যে রোমাঞ্চকর ঘটনাটি তাঁর জীবনে ঘটেছিল, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয়দের মনে বীরত্ব ও দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে। আজকের এই মেগা আর্টিকেলে আমরা ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের শৈশব, তাঁর রাজনৈতিক উত্থান, গনিমি কাওয়া বা গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং সর্বোপরি আফজল খাঁ বধের সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া ঐতিহাসিক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানব।


১. শিবাজীর জন্ম, শৈশব এবং স্বরাজ্যের বীজবপন:

১৬৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি (মতান্তরে ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ) পুনের নিকটবর্তী শিবনেরি দুর্গে জন্মগ্রহণ করেন শিবাজী। তাঁর পিতা শাহাজী রাজে ভোঁসলে ছিলেন বিজাপুরের আদিলশাহী দরবারের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী সেনাপতি ও জায়গিরদার। তবে শিবাজীর জীবনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তাঁর মা, বীরমাতা জিজাবাঈ (Jijabai)।

পিতা শাহাজী রাজে বেশির ভাগ সময় যুদ্ধের কারণে দূরে থাকতেন, তাই শিবাজীর শৈশব কেটেছে মা জিজাবাঈ এবং অভিভাবক দাদোজি কোণ্ডদেবের ছায়ায়। জিজাবাঈ ছোট্ট শিবাজীকে শোনাতেন রামায়ণ, মহাভারত এবং রাজপুত বীরদের শৌর্য-বীর্যের কাহিনি। এই পৌরাণিক কাহিনিগুলো শিবাজীর কচি মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি বুঝতে শেখেন যে, অন্যের দাসত্ব করে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের মাটি এবং মানুষের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা অনেক বেশি গৌরবের।

দাদোজি কোণ্ডদেব শিবাজীকে যুদ্ধবিদ্যা, অশ্বচালনা এবং তলোয়ার চালানোর পাশাপাশি রাজনীতি ও কূটনীতির শিক্ষাও দেন। কৈশোরে পা দিতেই শিবাজী তাঁর আশেপাশের মাওয়ালা (Mavala) উপজাতির যুবকদের একত্রিত করতে শুরু করেন। এই মাওয়ালারা ছিল সহ্যাদ্রির পাহাড়ি এলাকার অত্যন্ত সাহসী, বিশ্বস্ত এবং কষ্টসহিষ্ণু এক সম্প্রদায়। এদের নিয়ে শিবাজী গঠন করেন তাঁর নিজস্ব এক অকুতোভয় সেনাদল। মাত্র ১৫-১৬ বছর বয়সেই তিনি তাঁর বন্ধুদের নিয়ে রোহিরেশ্বর মন্দিরে মহাদেবের সামনে রক্ত দিয়ে 'স্বরাজ্য' স্থাপনের শপথ গ্রহণ করেন।


২. তারুণ্যের প্রথম বিজয় এবং আদিলশাহীর বুকে কাঁপন:

১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দ। শিবাজীর বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর। এই বয়সেই তিনি তাঁর মাওয়ালা বাহিনীকে সাথে নিয়ে বিজাপুরের সুলতানের অধীনে থাকা 'তোরনা দুর্গ' (Torna Fort) আক্রমণ করে তা দখল করে নেন। এটিই ছিল স্বাধীন মারাঠা সাম্রাজ্য গড়ার প্রথম পদক্ষেপ। তোরনা দুর্গ দখলের পর সেখানে প্রাপ্ত বিপুল গুপ্তধন দিয়ে তিনি রাজগড় নামে একটি নতুন দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে তোরনা দুর্গ জয় (১৬৪৬)

এরপর একে একে চাকন, কোন্ডানা (পরবর্তীতে যার নাম হয় সিংগড়), এবং পুরন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুর্গগুলো শিবাজীর হস্তগত হয়। শিবাজীর এই অভাবনীয় উত্থান বিজাপুরের আদিলশাহী দরবারে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে। সুলতান মহম্মদ আদিল শাহ শিবাজীকে দমন করার জন্য তাঁর পিতা শাহাজী রাজেকে বন্দি করেন। কিন্তু তরুণ শিবাজী মোগলদের সাথে কূটনৈতিক চাল চেলে অত্যন্ত চতুরতার সাথে পিতাকে মুক্ত করেন। এরপর কিছুদিন শান্ত থাকলেও, পিতা মুক্ত হওয়ার পর শিবাজী দ্বিগুণ উৎসাহে আবার রাজ্য বিস্তার শুরু করেন এবং কোঙ্কণ উপকূল ও জাওলি অঞ্চল দখল করে নেন।


৩. আফজল খাঁর আস্ফালন ও বিজাপুরের চরম সিদ্ধান্ত:

১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দ। বিজাপুরের সুলতান মহম্মদ আদিল শাহের মৃত্যু হয়েছে এবং তাঁর নাবালক পুত্র দ্বিতীয় আলি আদিল শাহ সিংহাসনে বসেছেন। কিন্তু রাজ্যের প্রকৃত শাসনভার ছিল রাজমাতা বরি সাহেবার (Badi Begum) হাতে। শিবাজীর ক্রমবর্ধমান শক্তি বরি সাহেবার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তিনি দরবারে তাঁর সমস্ত সেনাপতিদের ডাকলেন এবং একটি পানভর্তি রুপোর থালা এগিয়ে দিয়ে বললেন, "তোমাদের মধ্যে এমন কে আছো, যে এই পাহাড়ি ইঁদুরটাকে (শিবাজীকে তারা এই নামেই ডাকত) বন্দি করে বা হত্যা করে আমার সামনে হাজির করতে পারবে?"

গোটা দরবার যখন নীরব, তখন এগিয়ে এলেন বিজাপুরের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ, নিষ্ঠুর এবং বিশালদেহী সেনাপতি আফজল খাঁ (Afzal Khan)। তিনি পানটি তুলে নিয়ে দম্ভভরে ঘোষণা করলেন, "আমি শিবাজীকে ঘোড়া থেকে না নেমেই শিকলে বেঁধে আপনার পায়ের কাছে এনে ফেলব!"

আফজল খাঁ ছিলেন প্রায় সাত ফুট লম্বা এক দৈত্যাকার মানুষ। তাঁর শারীরিক শক্তি ও নিষ্ঠুরতার কাহিনি চারদিকে প্রবাদবাক্যের মতো ছড়িয়ে ছিল। তিনি কেবল একজন দক্ষ যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং চরম কূটকৌশলী এবং বিশ্বাসঘাতক হিসেবেও তাঁর কুখ্যাতি ছিল। এর আগে তিনি শিবাজীর বড় ভাই শম্ভুজীকেও এক যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছিলেন। তাই শিবাজীর কাছে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ ছিল না, ছিল পারিবারিক প্রতিশোধেরও বিষয়।


৪. প্রতাপগড় দুর্গ (মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং শিবাজীর মাস্টারস্ট্রোক):

আফজল খাঁ প্রায় ১০,০০০ অশ্বারোহী, ২০,০০০ পদাতিক সৈন্য, বিপুল সংখ্যক কামান এবং হাতি নিয়ে পুনের দিকে অগ্রসর হন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল শিবাজীকে পাহাড়ি এলাকা থেকে সমতলে টেনে আনা। কারণ সমতলের যুদ্ধে আফজল খাঁর বিশাল বাহিনীর সামনে শিবাজীর ক্ষুদ্র মাওয়ালা বাহিনী টিকতে পারত না।

শিবাজীকে প্ররোচিত করার জন্য আফজল খাঁ এক নির্মম কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি মারাঠাদের সবচেয়ে পবিত্র দুটি তীর্থস্থান—তুলজাপুরের ভবানী মন্দির এবং পন্ধরপুরের বিঠোবা মন্দির ধ্বংস করেন এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যা করেন। আফজল খাঁ ভেবেছিলেন, এই খবর শুনে রাগে অন্ধ হয়ে শিবাজী সমতলে নেমে এসে যুদ্ধ করবেন।

কিন্তু ছত্রপতি শিবাজী ছিলেন জন্মগত ট্যাকটিশিয়ান (Tactician) বা রণকৌশলী। তিনি রাগের বশে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলেন না। বরং তিনি পুনে ছেড়ে চলে গেলেন অত্যন্ত দুর্গম ও ঘন জঙ্গলে ঘেরা প্রতাপগড় দুর্গে (Pratapgad Fort)। সহ্যাদ্রি পর্বতের চুড়ায় অবস্থিত এই দুর্গের চারপাশের জঙ্গল এতই ঘন ছিল যে, সেখানে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছাত না।

শিবাজীর এই চালটি ছিল এক ঐতিহাসিক মাস্টারস্ট্রোক। আফজল খাঁ বাধ্য হলেন তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ওই দুর্গম পাহাড়ি পথে প্রবেশ করতে। পাহাড়ি উপত্যকায় আফজল খাঁর কামান এবং হাতিগুলো সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ল। মারাঠারা ছিল এই পাহাড়ি জঙ্গলের সাথে পরিচিত। তারা গাছের আড়ালে লুকিয়ে থেকে বিজাপুরি সেনাদের ওপর নজর রাখতে লাগল। আফজল খাঁ বুঝতে পারলেন, প্রতাপগড় আক্রমণ করা আত্মহত্যার সামিল। শুরু হলো চিঠি ও দূতের মাধ্যমে কূটনৈতিক আলোচনা।


৫. ঐতিহাসিক সন্ধির প্রস্তাব এবং আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতকতা:

আফজল খাঁ তাঁর দূত কৃষ্ণাজী ভাস্করকে পাঠালেন শিবাজীর কাছে। প্রস্তাবে বলা হলো, শিবাজী যদি বশ্যতা স্বীকার করেন তবে তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে এবং বিজাপুরের দরবারে সম্মানজনক পদ দেওয়া হবে। শিবাজী অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এই প্রস্তাব গ্রহণ করার ভান করলেন। তিনি তাঁর নিজস্ব দূত পন্তাজী গোপীনাথকে পাঠালেন খাঁয়ের শিবিরে। পন্তাজী গোপীনাথ শিবাজীকে এসে জানালেন যে, সন্ধির আড়ালে আফজল খাঁর মূল উদ্দেশ্য হলো শিবাজীকে হত্যা করা।

প্রতাপগড় দুর্গের নিচে শামিয়ানায় বৈঠক। ডানদিকে বিজাপুরের সেনাপতি আফজল খাঁ সবুজ জামায় দাঁড়িয়ে, বাঁদিকে হলুদ পোশাকে বসে শিবাজী।

অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো, প্রতাপগড় দুর্গের পাদদেশে একটি সুসজ্জিত তাঁবুতে শিবাজী এবং আফজল খাঁ মিলিত হবেন। উভয়েই কেবল দুজন করে দেহরক্ষী সাথে রাখতে পারবেন এবং বাকি সৈন্য অনেক দূরে থাকবে। দিনটি স্থির হলো ১০ নভেম্বর, ১৬৫৯।


৬. মৃত্যুর মুখোমুখি ১০ নভেম্বর ১৬৫৯, প্রতাপগড়ের পাদদেশ:

ইতিহাসের সেই যুগান্তকারী দিনটি উপস্থিত হলো। শিবাজী জানতেন আফজল খাঁ কতটা ধুরন্ধর এবং শক্তিশালী। তাই তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রস্তুত হলেন।

পোশাকের নিচে তিনি পরলেন লোহার জালিকা বা চিলখত (Chainmail armor) এবং মাথায় পরলেন লোহার শিরস্ত্রাণ বা জিরেটোপ। বাঁ হাতের আঙুলগুলোতে তিনি লুকিয়ে রাখলেন এক ভয়ানক মারণাস্ত্র—'বাঘনখ' (Bagh Nakh বা Tiger Claws)। আর ডান হাতের আস্তিনে লুকিয়ে রাখলেন একটি বাঁকানো ছোরা, যার নাম 'বিছুয়া' (Bichhwa)। শিবাজীর সাথে দেহরক্ষী হিসেবে রইলেন তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত দুই বীর—জীবা মহলা এবং শম্ভুজী কাভজি।

লোহার আংটির মতো ২টো রিং আঙুলে গলিয়ে, তালুর নিচে লুকোনো ৪টে বাঁকানো বাঘের নখের মতো ইস্পাতের ফলা। মুঠো বন্ধ করলেই নখ বেরিয়ে আসে।

অন্যদিকে আফজল খাঁও তাঁর বিশাল দেহ নিয়ে তাঁবুতে উপস্থিত হলেন। তাঁর সাথে রইল বিখ্যাত তলোয়ারবাজ সৈয়দ বান্দা এবং আরেকজন দেহরক্ষী।

শিবাজী যখন তাঁবুতে প্রবেশ করলেন, তখন আফজল খাঁ তাঁকে আলিঙ্গন করার জন্য দু'হাত প্রসারিত করলেন। উচ্চতায় আফজল খাঁ ছিলেন শিবাজীর চেয়ে অনেক বড়। আলিঙ্গন করার মুহূর্তে খাঁ হঠাৎ তাঁর বিশাল বাঁ হাত দিয়ে শিবাজীর ঘাড় শক্ত করে চেপে ধরেন এবং ডান হাতে থাকা তীক্ষ্ণ ছোরা দিয়ে শিবাজীর পাঁজরে সজোরে আঘাত করেন।

কিন্তু পোশাকের নিচে লুকিয়ে রাখা লোহার বর্মের কারণে শিবাজীর শরীরে আঁচড়ও লাগল না। শিবাজী বুঝতে পারলেন এটাই চরম মুহূর্ত। তিনি তাঁর বাঁ হাতে লুকিয়ে রাখা 'বাঘনখ' দিয়ে আফজল খাঁর পেট ফালাফালা করে দেন এবং ডান হাতের 'বিছুয়া' দিয়ে তাঁকে আঘাত করেন। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ওঠেন আফজল খাঁ।

খাঁয়ের চিৎকার শুনে তাঁর দুর্ধর্ষ দেহরক্ষী সৈয়দ বান্দা ছুটে এসে শিবাজীর মাথায় তলোয়ার দিয়ে মারাত্মক কোপ বসায়, কিন্তু লোহার শিরস্ত্রাণের কারণে শিবাজী বেঁচে যান। সৈয়দ বান্দা যখন দ্বিতীয়বার আঘাত করতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে চোখের পলকে শিবাজীর দেহরক্ষী জীবা মহলা নিজের তলোয়ার দিয়ে সৈয়দ বান্দার ডান হাতটি কনুই থেকে কেটে মাটিতে ফেলে দেন। মারাঠি ভাষায় আজও একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে— "হোতা জীবা, মহনুন বাঁচলা শিবা" (অর্থাৎ, জীবা ছিল বলেই শিবাজী সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন)।


৭. প্রতাপগড়ের যুদ্ধ এবং গনিমি কাওয়া (Guerilla Warfare):

আফজল খাঁর মৃত্যু ছিল কেবল শুরু। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শিবাজী প্রতাপগড় দুর্গ থেকে তোপ দাগার নির্দেশ দিলেন। এটি ছিল জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা মারাঠা মাওয়ালা বাহিনীর জন্য আক্রমণের সংকেত।

চারপাশের জঙ্গল থেকে কানহোজী জেধে এবং নেতাজী পালকরের নেতৃত্বে মারাঠা সেনারা বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজাপুরি সেনাদের ওপর। আফজল খাঁর বিশাল সৈন্যবাহিনী, যারা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিচ্ছিল, তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। মারাঠাদের এই আচমকা আক্রমণ কৌশলকেই বলা হয় 'গনিমি কাওয়া' (Ganimi Kava) বা গেরিলা যুদ্ধ।

প্রতাপগড়ের যুদ্ধ ১০ নভেম্বর ১৬৫৯

প্রতাপগড়ের এই যুদ্ধে বিজাপুরের কয়েক হাজার সৈন্য মারা যায়, হাজার হাজার সৈন্য বন্দি হয় এবং শিবাজীর হাতে আসে অকল্পনীয় ধনসম্পদ, ঘোড়া, হাতি এবং অস্ত্রশস্ত্র। তবে শিবাজী নির্দেশ দিয়েছিলেন, যারা আত্মসমর্পণ করবে বা পালিয়ে যাবে, তাদের যেন হত্যা না করা হয়। বন্দি মহিলাদের অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাদের রাজ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এই নৈতিকতাই শিবাজীকে অন্যান্য রাজাদের থেকে আলাদা করেছিল।


৮. আফজল খাঁ বধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য:

আফজল খাঁ বধ এবং প্রতাপগড়ের যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।

  এই বিজয়ের ফলে শিবাজী আর কেবল একজন স্থানীয় বিদ্রোহী নেতা রইলেন না, তিনি রাতারাতি সারা ভারতের কাছে একজন অপ্রতিরোধ্য বীর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন।

  বিজাপুর সাম্রাজ্য এই ধাক্কা সামলে আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।

  দিল্লিতে বসে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব বুঝতে পারলেন যে দাক্ষিণাত্যে এক নতুন এবং ভয়ংকর শক্তির উত্থান হয়েছে, যা মোগল সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে।


৯. প্রশাসন, নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা এবং ছত্রপতি রূপে অভিষেক:

আফজল খাঁ বধের পর শিবাজী তাঁর সাম্রাজ্য দ্রুত প্রসারিত করতে থাকেন। ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন রায়গড় দুর্গে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর রাজ্যাভিষেক ঘটে এবং তিনি 'ছত্রপতি' (Chhatrapati) উপাধি গ্রহণ করেন। শাসক হিসেবে শিবাজী ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল।

১. নৌবাহিনীর জনক: তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের দীর্ঘ উপকূল রক্ষা করতে হলে শক্তিশালী নৌবাহিনী প্রয়োজন। তাই তিনি সিন্ধুদুর্গ ও বিজয়দুর্গের মতো সামুদ্রিক দুর্গ নির্মাণ করেন এবং ভারতের ইতিহাসে তাঁকে 'ভারতীয় নৌবাহিনীর জনক' (Father of Indian Navy) বলা হয়।

২. অষ্টপ্রধান মন্ডল: রাজ্য পরিচালনার জন্য তিনি আটজন মন্ত্রীর একটি পরিষদ গঠন করেন, যাকে বলা হতো 'অষ্টপ্রধান'। এখানে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মন্ত্রীদের নিয়োগ দেওয়া হতো।

৩. ধর্মনিরপেক্ষতা ও নারী সম্মান: শিবাজী ছিলেন একজন খাঁটি হিন্দু শাসক, কিন্তু তাঁর রাজ্যে ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্মের প্রতি বিন্দুমাত্র বৈষম্য ছিল না। তাঁর সেনাপতি ও নৌ-অ্যাডমিরালদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন মুসলিম (যেমন- সিদ্দি ইব্রাহিম, দৌলত খান)। যুদ্ধের সময় মসজিদ বা কোরআনের অবমাননা এবং নারীদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করলে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিয়েছিলেন।


উপসংহার:

১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ মাত্র ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি মহারাষ্ট্রের বুকে এমন এক জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে গিয়েছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পরও মারাঠাদের মোগলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৭ বছরের স্বাধীনতা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

আফজল খাঁ বধের ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক হত্যা বা যুদ্ধজয় ছিল না; এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ভারতীয়দের মনে আত্মবিশ্বাসের বিস্ফোরণ। শিবাজী প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুকেও মেধা, সাহস, রণকৌশল এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমে মাটিতে নামিয়ে আনা যায়। আজ শত শত বছর পরেও, সহ্যাদ্রির প্রতিটি হাওয়া যেন ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের সেই অমর বীরত্বগাথা ফিসফিস করে বলে যায়, যা আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাসকে এক গৌরবময় পরিচয় প্রদান করেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ