চুঁইয়ে পড়া নীতি বা ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি: ইতিহাস ও প্রভাব

ব্ল্যাকবোর্ডে একটা পিরামিড আঁকা। ক্লাসে দাঁড়িয়ে লর্ড মেকলে বোঝাচ্ছেন।

ভূমিকা:

পরাধীন ভারতের ইতিহাসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন এদেশের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন প্রথমদিকে ভারতীয়দের শিক্ষা বিস্তারের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহই ছিল না। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা ভারতে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তনে বাধ্য হয়। আর এই ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের নেওয়া সবচেয়ে বিতর্কিত, চতুর এবং সুদূরপ্রসারী শিক্ষানীতিটি হলো 'ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি' (Downward Filtration Theory) বা 'চুঁইয়ে পড়া নীতি'।

১৮৩৫ সালে লর্ড টমাস ব্যাবিংটন মেকলে (Lord Thomas Babington Macaulay) ভারতে এই নীতির প্রবর্তন করেন। এটি কেবল একটি শিক্ষানীতি ছিল না; এটি ছিল ভারতের সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি এবং মনস্তত্ত্বকে চিরতরে বদলে দেওয়ার এক সুগভীর সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র। আসুন, ইতিহাসের পাতা থেকে এই চুঁইয়ে পড়া নীতির পটভূমি, মেকলের চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রতিবেদন (Macaulay's Minute), ব্রিটিশদের আসল উদ্দেশ্য এবং ভারতের রাজনীতি ও সমাজে এর ভয়ংকর ও যুগান্তকারী প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। 


১. ঐতিহাসিক পটভূমি: শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব

চুঁইয়ে পড়া নীতির প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে আমাদের ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ব্রিটিশ শিক্ষানীতির দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানতে হবে।

ক) ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট (Charter Act of 1813)

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মূলত ছিল একটি বণিক সংস্থা। শিক্ষা বিস্তারে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু ইংল্যান্ডের কিছু মানবতাবাদী ও মিশনারিদের চাপে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট (সনদ আইন) পাস করে। এই আইনের ৪৩ নং ধারায় বলা হয় যে, কোম্পানি প্রতি বছর ভারতীয়দের শিক্ষা খাতের উন্নয়নের জন্য অন্তত ১ লক্ষ টাকা ব্যয় করবে। ভারতের ইতিহাসে এটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘোষণা, কারণ এর আগে কোনো রাষ্ট্রীয় শক্তি শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করেনি।

খ) জনশিক্ষা কমিটি এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব (Orientalist-Anglicist Controversy)

১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হলেও, এই টাকা কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় করা হবে—তা নিয়ে ব্রিটিশদের মধ্যেই চরম মতবিরোধ দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৮২৩ সালে 'জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন' (General Committee of Public Instruction) বা জনশিক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির ১০ জন সদস্য দুটি প্রধান দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন:

  প্রাচ্যবাদী (Orientalists): এইচ. টি. প্রিন্সেপ (H. T. Prinsep), কোলব্রুক প্রমুখ মনে করতেন যে, এই টাকা ভারতীয়দের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা অর্থাৎ সংস্কৃত, আরবি এবং ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।

  পাশ্চাত্যবাদী (Anglicists): চার্লস ট্রেভেলিয়ান (Charles Trevelyan), আলেকজান্ডার ডাফ প্রমুখ মনে করতেন যে, প্রাচ্য শিক্ষা হলো সেকেলে ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তাই এই অর্থ শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সাহিত্য বিস্তারে ব্যয় করা উচিত।

টানা এক দশক ধরে এই 'প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব' চলতে থাকে এবং শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা ১ লক্ষ টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।


২. লর্ড মেকলের আগমন এবং 'মেকলে মিনিট' (Macaulay's Minute, 1835)

এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে এবং একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (Lord William Bentinck) ১৮৩৪ সালে আইনসচিব (Law Member) হিসেবে লর্ড টমাস ব্যাবিংটন মেকলে-কে ভারতে নিয়ে আসেন। মেকলে-কে জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি নিযুক্ত করা হয়।

লর্ড মেকলে ছিলেন একজন চরম দাম্ভিক ইংরেজ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ সমর্থক। ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর চরম অবজ্ঞা ও ঘৃণা ছিল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যবাদীদের বক্তব্য শোনার পর ১৮৩৫ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি মেকলে বেন্টিঙ্কের কাছে একটি সুদীর্ঘ ও ঐতিহাসিক প্রতিবেদন পেশ করেন, যা ইতিহাসে 'মেকলে মিনিট' (Macaulay's Minute) বা মেকলের প্রস্তাবপত্র নামে পরিচিত।

মেকলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য:

তাঁর প্রতিবেদনে মেকলে প্রাচ্য শিক্ষাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে লেখেন—

"ইউরোপের কোনো একটি ভালো লাইব্রেরির মাত্র একটি তাকের বই, সমগ্র ভারত ও আরবের সম্মিলিত দেশীয় সাহিত্যের সমকক্ষ।" (A single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia.)


তিনি সংস্কৃত ও আরবি ভাষাকে "অবৈজ্ঞানিক", "কুসংস্কারে পূর্ণ" এবং "অপ্রয়োজনীয়" বলে বাতিল করে দেন এবং দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে, সরকারি অনুদান কেবল ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সাহিত্য প্রসারের জন্যই ব্যয় করতে হবে।


৩. চুঁইয়ে পড়া নীতি বা ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরির মূল কথা

মেকলের এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী দিকটি ছিল তাঁর প্রস্তাবিত শিক্ষাদান পদ্ধতি, যা 'ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি' বা 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' নামে পরিচিত।

ফিলট্রেশন বা চুঁইয়ে পড়া বলতে কী বোঝায়?

বিজ্ঞানের ভাষায় ফিলট্রেশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো তরল পদার্থ ওপর থেকে ধীরে ধীরে ফিল্টার বা পরিশ্রুত হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। ঠিক একইভাবে, মেকলে প্রস্তাব করেছিলেন যে, ব্রিটিশ সরকারকে ভারতের কোটি কোটি সাধারণ বা দরিদ্র মানুষকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব নিতে হবে না। কারণ ব্রিটিশ সরকারের কাছে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বা পরিকাঠামো নেই।

এর বদলে, ব্রিটিশ সরকারের উচিত কেবল ভারতের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের একটি ক্ষুদ্র অংশকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করা। এই শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় আলোকিত হবে, তখন তাদের সংস্পর্শে এসে সেই আধুনিক জ্ঞান, আচার-আচরণ এবং ধ্যানধারণা ধীরে ধীরে দেশীয় ভাষার মাধ্যমে সমাজের নিচুতলার সাধারণ মানুষের মধ্যে 'চুঁইয়ে পড়বে' বা পরিশ্রুত হয়ে নেমে আসবে।

মেকলে তাঁর এই তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর প্রতিবেদনে একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও চতুর লাইন লিখেছিলেন:

 "আমাদের বর্তমানে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করতে হবে, যারা আমাদের (ইংরেজদের) এবং আমাদের শাসিত কোটি কোটি ভারতীয়দের মধ্যে দোভাষীর বা মধ্যস্থতাকারীর কাজ করবে। এই শ্রেণিটি রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তায় হবে সম্পূর্ণ ইংরেজ।" (Indians in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect.)


৪. বেন্টিঙ্কের অনুমোদন এবং নীতির বাস্তবায়ন

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক মেকলের এই যুক্তিতে অত্যন্ত প্রভাবিত হন এবং সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করেন। ১৮৩৫ সালের ৭ই মার্চ বেন্টিঙ্ক একটি সরকারি প্রস্তাব (Resolution) জারি করে ঘোষণা করেন যে:

 ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হবে ভারতে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার ঘটানো।

 শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা সমস্ত সরকারি অর্থ এখন থেকে কেবলমাত্র ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও কলেজগুলোর জন্যই ব্যয় করা হবে।

 প্রাচ্য ভাষার (সংস্কৃত, আরবি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আর কোনো সরকারি অনুদান দেওয়া হবে না।

এর ফলে ভারতে সরকারিভাবে ইংরেজি শিক্ষার যুগ শুরু হয় এবং চুঁইয়ে পড়া নীতি ব্রিটিশ ভারতের সরকারি শিক্ষানীতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।


৫. চুঁইয়ে পড়া নীতির পেছনে ব্রিটিশদের আসল বা গোপন উদ্দেশ্য

লর্ড মেকলে বা ব্রিটিশ সরকার যে ভারতীয়দের প্রতি গভীর ভালোবাসায় আধুনিক শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, তা একেবারেই নয়। এই নীতির পেছনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বেশ কিছু গভীর ও চতুর স্বার্থ লুকিয়ে ছিল:

১. প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন (সস্তা কেরানি তৈরি):

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখন ভারতে দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল। এই বিশাল সাম্রাজ্যের প্রশাসন, আদালত এবং ব্যবসা চালানোর জন্য প্রচুর সংখ্যক অধস্তন কর্মী বা কেরানির প্রয়োজন ছিল। ইংল্যান্ড থেকে ইংরেজ কর্মীদের ভারতে এনে চাকরি দেওয়া ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই মেকলে চাইলেন এমন একদল শিক্ষিত ভারতীয় তৈরি করতে, যারা ইংরেজি জানবে এবং অত্যন্ত সস্তায় ব্রিটিশ প্রশাসনের কেরানি হিসেবে কাজ করবে।

২. সাম্রাজ্যের অনুগত শ্রেণি তৈরি:

ব্রিটিশরা চেয়েছিল ইংরেজি সাহিত্য, পাশ্চাত্য দর্শন এবং খ্রিস্টধর্মের প্রভাবে এমন একটি 'বাবু শ্রেণি' (Babu Class) তৈরি করতে, যারা নিজেদের ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হবে এবং মনেপ্রাণে ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের জন্য 'ঈশ্বরের আশীর্বাদ' বলে মনে করবে। এই শ্রেণিটি ব্রিটিশদের অন্ধ অনুগত হবে এবং কোনোদিন ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ করবে না।

৩. ব্রিটিশ পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ:

মেকলে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে হিসাব করেছিলেন যে, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়রা যখন রুচি ও অভ্যাসে 'ইংরেজ' হয়ে উঠবে, তখন তারা ধুতি-পাঞ্জাবির বদলে ব্রিটিশ পোশাক, ব্রিটিশ আসবাবপত্র এবং ইউরোপীয় বিলাসবহুল জিনিসপত্র ব্যবহার করতে শুরু করবে। এর ফলে ভারতে ব্রিটিশ শিল্প-কারখানায় তৈরি পণ্যের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে।

৪. সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ (Cultural Imperialism):

রাজনৈতিকভাবে ভারত দখলের পর ব্রিটিশরা চেয়েছিল ভারতের মন ও সংস্কৃতিকে দখল করতে। ভারতীয়দের মনে এই হীনম্মন্যতা তৈরি করা যে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি তুচ্ছ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতাই সর্বশ্রেষ্ঠ।


৬. চুঁইয়ে পড়া নীতির ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ও ব্যর্থতা

যদিও ব্রিটিশরা এই নীতিকে সফল বলে দাবি করেছিল, কিন্তু বৃহত্তর ভারতীয় সমাজের জন্য চুঁইয়ে পড়া নীতি ছিল এক চরম বিপর্যয়। এর নেতিবাচক দিকগুলো হলো:

  গণশিক্ষার চরম অবহেলা: এই নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, ওপর তলা থেকে শিক্ষা কখনোই সাধারণ মানুষের স্তরে চুঁইয়ে পড়েনি। উচ্চবিত্তরা ইংরেজি শিখে কেবল সরকারি চাকরি ও নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল। তারা সাধারণ কৃষক বা শ্রমিকদের শিক্ষিত করার কোনো দায় নেয়নি। ফলে ভারতের বিশাল জনসমাজ ঘোর অন্ধকারের মধ্যেই থেকে যায়।

  দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংসসাধন: সরকারি অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের হাজার হাজার প্রাচীন পাঠশালা, টোল এবং মাদ্রাসাগুলো অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের নিজস্ব গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

  মাতৃভাষার চরম অবহেলা: সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে ইংরেজি স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলা, হিন্দি বা অন্যান্য মাতৃভাষার চর্চা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইংরেজি না জানলে কোনো চাকরি জুটবে না—এই ভয়ে মাতৃভাষার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়।

  সমাজে ভয়ংকর শ্রেণি-বৈষম্য: এই নীতি ভারতীয় সমাজে এক ভয়ানক বিভেদের প্রাচীর তৈরি করে। সমাজ দুটো স্পষ্ট ভাগে ভাগ হয়ে যায়—একদিকে মুষ্টিমেয় ইংরেজি শিক্ষিত 'বাবু' বা উচ্চবিত্ত শ্রেণি, আর অন্যদিকে কোটি কোটি নিরক্ষর, দরিদ্র সাধারণ মানুষ। শিক্ষিত শ্রেণি সাধারণ মানুষকে অশিক্ষিত বলে অবজ্ঞা করতে শুরু করে।


৭. মুদ্রার উলটো পিঠ: নীতির পরোক্ষ ও ইতিবাচক প্রভাব

মজার ব্যাপার হলো, ব্রিটিশরা যে উদ্দেশ্যে এই নীতি চালু করেছিল, দীর্ঘমেয়াদে তা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। এই নীতির কিছু অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক ফলও দেখা গিয়েছিল:

  আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান: ইংরেজি শিক্ষার ফলে ভারতে এক নতুন বুদ্ধিদীপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ—এই শিক্ষিত শ্রেণিতেই আবির্ভূত হন, যাঁরা ভারতের 'নবজাগরণ' বা রেনেসাঁসের নেতৃত্ব দেন।

  জাতীয়তাবাদের জন্ম ও ব্রিটিশদের পতন: মেকলে ভেবেছিলেন ইংরেজি শিক্ষিতরা ব্রিটিশদের গোলাম হবে। কিন্তু রুশো, ভলতেয়ার, মিল কিংবা ম্যাজিনি-র মতো পাশ্চাত্য দার্শনিকদের স্বাধীনতা, সাম্য ও গণতন্ত্রের বাণী পড়ে ভারতীয় যুবকদের চোখ খুলে যায়। এই ইংরেজি শিক্ষিত নেতারাই (যেমন—সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, সুভাষচন্দ্র বসু) পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটান।

  সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ: সমগ্র ভারতের শিক্ষিত মানুষদের একটি সাধারণ ভাষা হয়ে ওঠে ইংরেজি। এর ফলে বাংলা, মাদ্রাজ বা পাঞ্জাবের নেতারা একে অপরের সাথে সহজেই যোগাযোগ করতে সক্ষম হন, যার চূড়ান্ত ফলশ্রুতি ছিল ১৮৮৫ সালে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' প্রতিষ্ঠা।


৮. নীতির অবসান: উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch, 1854)

প্রায় দুই দশক ধরে চলার পর, ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ তত্ত্ব। শিক্ষা কখনোই ওপর থেকে নিচে আপনাআপনি চুঁইয়ে পড়ে না। ভারতের কোটি কোটি মানুষকে নিরক্ষর রেখে কোনো সাম্রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

অবশেষে ১৮৫৪ সালে স্যার চার্লস উডের নির্দেশনামা বা 'উডের ডেসপ্যাচ' (Wood's Despatch) প্রকাশের মাধ্যমে সরকারিভাবে এই 'চুঁইয়ে পড়া নীতি' বা ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি বাতিল করা হয়। উডের ডেসপ্যাচে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় যে, গণশিক্ষা বা সাধারণ মানুষের শিক্ষার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে এবং প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা প্রদান করতে হবে।


উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, লর্ড মেকলের ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি বা চুঁইয়ে পড়া নীতি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এক অত্যন্ত সুচতুর, বর্ণবাদী এবং স্বার্থান্বেষী পদক্ষেপ। এই নীতি ভারতের প্রাচীন জ্ঞানভাণ্ডারকে অপমান করেছে এবং সমাজে এক গভীর বিভেদ তৈরি করেছে। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস এই যে, ব্রিটিশরা যে উদ্দেশ্যে ভারতীয়দের হাতে ইংরেজি ভাষার অস্ত্র তুলে দিয়েছিল, সেই অস্ত্র দিয়েই ভারতীয়রা নিজেদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই আধুনিক ভারতের সমাজ, রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদের বিকাশের ইতিহাসে এই নীতির গুরুত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ