প্রেক্ষাপট:
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসে ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি (Lucknow Pact) একটি অবিস্মরণীয় এবং যুগান্তকারী অধ্যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যখন ভারতের দুটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল—'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' এবং 'সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ'—নিজেদের সমস্ত রাজনৈতিক ও আদর্শগত বিভেদ ভুলে এক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন সেই মিলনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল এই লখনৌ চুক্তি।
এই চুক্তি কেবল হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশদের 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule) নীতির গালে এক বিরাট চড়। আসুন, ইতিহাসের পাতা থেকে এই ঐতিহাসিক চুক্তির পটভূমি, এর প্রধান রূপকারদের ভূমিকা, চুক্তির শর্তাবলী এবং ভারতের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. লখনৌ চুক্তির ঐতিহাসিক পটভূমি (Historical Background)
১৯১৬ সালে হঠাৎ করেই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এক হয়ে যায়নি। এর পেছনে ছিল এক দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও মেরুকরণ। এই পটভূমিকে মূলত কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়:
বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) এবং মুসলিমদের মোহভঙ্গ: ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরাতে বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন, যা মুসলিমরা সমর্থন করেছিল। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। এতে মুসলিম লীগ এবং মুসলিম সম্প্রদায় গভীরভাবে হতাশ হয় এবং তারা বুঝতে পারে যে ব্রিটিশদের ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখা বোকামি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং খিলাফত ইস্যু (১৯১৪): প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশরা তুরস্কের খলিফার (যিনি ছিলেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় নেতা) বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে ভারতের মুসলিম সমাজের মনে ব্রিটিশ বিরোধী চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তরুণ মুসলিম নেতারা ব্রিটিশদের আনুগত্যের পথ ছেড়ে জাতীয়তাবাদী ধারায় যুক্ত হতে শুরু করেন।
মুসলিম লীগের আদর্শগত পরিবর্তন: ১৯১২-১৯১৩ সালের দিকে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। স্যার সৈয়দ আহমদ খানের 'ব্রিটিশ আনুগত্য'-এর নীতির বদলে মুসলিম লীগে মহম্মদ আলী জিন্নাহ, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, এবং আলি ভাইদের (শওকত আলি ও মহম্মদ আলি) মতো প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী নেতাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগ তাদের সংবিধানে পরিবর্তন এনে 'ভারতের জন্য স্বায়ত্তশাসন' (Self-government)-কে নিজেদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে, যা কংগ্রেসের লক্ষ্যের সাথে মিলে যায়।
২. কংগ্রেসের পুনর্মিলন: চরমপন্থী ও নরমপন্থীদের একতা
লখনৌ অধিবেশনের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক ছিল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ পুনর্মিলন। ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেস চরমপন্থী (বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, বিপিন চন্দ্র পাল) এবং নরমপন্থী বা মডারেট (গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, ফিরোজশাহ মেহতা) এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ ৯ বছর পর, অ্যানি বেসান্ত (Annie Besant) এবং বাল গঙ্গাধর তিলকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে লখনৌ অধিবেশনে চরমপন্থীরা পুনরায় কংগ্রেসে ফিরে আসেন। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন অম্বিকাচরণ মজুমদার। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন— "দীর্ঘ দশ বছরের বেদনাদায়ক বিচ্ছেদের পর ভাইয়েরা আবার ভাইদের কাছে ফিরে এসেছে।" কংগ্রেসের এই অভ্যন্তরীণ ঐক্য লখনৌ চুক্তি স্বাক্ষরের পথকে আরও সুগম করেছিল।
৩. চুক্তির রূপকার: তিলক ও জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভূমিকা
লখনৌ চুক্তির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল দুই মহান নেতার—বাল গঙ্গাধর তিলক এবং মহম্মদ আলী জিন্নাহ।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তিলক বুঝতে পেরেছিলেন যে মুসলিমদের সমর্থন ছাড়া ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসন আদায় করা অসম্ভব। অন্যদিকে মুসলিম লীগের নেতা জিন্নাহও উপলব্ধি করেছিলেন যে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা অধরাই থেকে যাবে। জিন্নাহর এই অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্য তৎকালীন বিখ্যাত নেত্রী সরোজিনী নাইডু তাঁকে "হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত" (Ambassador of Hindu-Muslim Unity) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
অবশেষে, ১৯১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে লখনৌ শহরে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশন একই সময়ে ও একই জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় এবং দুই দলের নেতাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর ঐতিহাসিক 'লখনৌ চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়।
৪. লখনৌ চুক্তির প্রধান শর্তাবলী (Provisions of the Lucknow Pact)
লখনৌ চুক্তির মাধ্যমে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ ব্রিটিশ সরকারের কাছে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য একটি যৌথ দাবিদাওয়া পেশ করে এবং নিজেদের মধ্যে কিছু রাজনৈতিক সমঝোতায় আসে। এর প্রধান শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ:
ক. পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার স্বীকৃতি (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত):
১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারে ব্রিটিশরা মুসলিমদের জন্য যে 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' (Separate Electorate) চালু করেছিল, কংগ্রেস এতদিন তার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। কিন্তু লখনৌ চুক্তিতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বার্থে কংগ্রেস মুসলিমদের এই পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নেয়।
খ. মুসলিমদের জন্য আসন সংরক্ষণ (Weightage System):
যেসব প্রদেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু (যেমন—মাদ্রাজ, যুক্তপ্রদেশ, বিহার), সেখানে তাদের জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়ে বেশি আসন (Weightage) দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অন্যদিকে, যেসব প্রদেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ (যেমন—বাংলা ও পাঞ্জাব), সেখানে তারা নিজেদের কিছু আসন হিন্দুদের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি হয়।
গ. কেন্দ্রীয় আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব:
চুক্তিতে স্থির হয় যে, কেন্দ্রীয় আইনসভায় (Central Legislative Council) ভারতীয়দের জন্য সংরক্ষিত আসনের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ বা ৩৩%) আসন মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
ঘ. স্বায়ত্তশাসনের দাবি (Demand for Self-Government):
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ যৌথভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি জানায় যে, ভারতকে অবিলম্বে 'ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস' (Dominion Status) বা ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।
ঙ. ভিটো ক্ষমতা (Veto Power in religious matters):
স্থির হয় যে, কোনো সম্প্রদায় (হিন্দু বা মুসলিম) সম্পর্কিত কোনো বিল বা আইন যদি সেই সম্প্রদায়ের তিন-চতুর্থাংশ (৩/৪) সদস্য আইনসভায় বিরোধিতা করেন, তবে সেই বিল পাস করা যাবে না।
চ. শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের পৃথকীকরণ:
বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে হবে এবং শাসন পরিষদের অর্ধেক সদস্য ভারতীয় হতে হবে বলে চুক্তিতে দাবি করা হয়।
৫. লখনৌ চুক্তির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও স্বল্পমেয়াদী সাফল্য
লখনৌ চুক্তির প্রভাব ভারতের রাজনীতিতে ছিল বিদ্যুতের মতো। এর তাৎপর্যগুলো হলো:
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি: হিন্দু ও মুসলিম এক হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ সরকারের ওপর এক প্রচণ্ড মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলেই তিলক ও অ্যানি বেসান্তের 'হোমরুল লিগ আন্দোলন' (Home Rule Movement) প্রবল আকার ধারণ করে।
অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের ভিত্তি: লখনৌ চুক্তির ফলে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে যে অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, তারই ওপর দাঁড়িয়ে ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী তাঁর বিখ্যাত 'অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন' (Non-Cooperation and Khilafat Movement) সফলভাবে পরিচালনা করতে পেরেছিলেন।
মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার: কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের এই যৌথ চাপের মুখেই ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে ১৯১৭ সালে 'মন্টেগু ঘোষণা' (August Declaration) পেশ করে এবং পরে ১৯১৯ সালে 'মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন' পাস করে ভারতীয়দের কিছু শাসনতান্ত্রিক সুবিধা দেয়।
৬. চুক্তির ত্রুটি এবং দীর্ঘমেয়াদী ভয়ংকর পরিণতি (সমালোচনা)
লখনৌ চুক্তি সাময়িকভাবে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা করলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি ভারতের জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। ঐতিহাসিকরা এই চুক্তির বেশ কিছু মারাত্মক ত্রুটি তুলে ধরেছেন:
'দ্বিজাতিতত্ত্ব'-এর পরোক্ষ স্বীকৃতি: হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বার্থে কংগ্রেস যখন মুসলিমদের 'পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা' মেনে নিল, তখন তারা কার্যত স্বীকার করে নিল যে হিন্দু ও মুসলিমদের রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা। কংগ্রেসের এই আপোষই পরবর্তীতে জিন্নাহর 'দ্বিজাতিতত্ত্ব' (Two-Nation Theory) বা ভারতভাগের প্রধান তাত্ত্বিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তোষণ নীতির সূচনা (Appeasement Politics): অনেক ঐতিহাসিকের মতে, মুসলিমদের কাছে টেনে আনার জন্য কংগ্রেস অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছিল, যা ভারতের রাজনীতিতে তোষণ নীতির জন্ম দেয়।
নেতৃত্বের স্তরে ঐক্য, সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়: এই চুক্তিটি ছিল মূলত উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত হিন্দু-মুসলিম নেতাদের মধ্যে একটি বোঝাপড়া। সাধারণ কৃষক বা খেটে খাওয়া হিন্দু-মুসলিম জনতার মধ্যে কোনো আদর্শগত একতা তৈরি হয়নি। তাই ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই এই ঐক্য ভেঙে পড়ে এবং ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি ছিল ভারতীয় রাজনীতির এক উজ্জ্বল অথচ প্রহেলিকাময় অধ্যায়। সাময়িক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একজোট হতে এই চুক্তির ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বাল গঙ্গাধর তিলক এবং জিন্নাহর মতো নেতারা সেদিন যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা প্রশংসনীয়। তবে, রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে কংগ্রেস সেদিন পৃথক নির্বাচনের মতো যে সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে মেনে নিয়েছিল, দুর্ভাগ্যবশত তিন দশক পর ১৯৪৭ সালে ভারতভাগের রূপ ধরে সেই বিষবৃক্ষই ভারতের বুকে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছিল।


0 মন্তব্যসমূহ