সম্রাট আলাউদ্দিন খলজী: বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতির নেপথ্য ইতিহাস এবং রানি পদ্মাবতীর বিতর্কিত আখ্যান

দিল্লির বাজারে শাহনা-ই-মান্ডি (বাজার পরিদর্শক) দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন মাপছে, বাটখারা চেক করছে। পেছনে দাঁড়িয়ে সোনার পোশাকে আলাউদ্দিন খলজি নিজে তদারকি করছে।

ভূমিকা:

দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন খুব কম শাসকই এসেছেন, যাঁদের নাম একই সাথে চরম আতঙ্ক এবং অসীম বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ঠিক এমনই এক বিতর্কিত, নির্মম অথচ অসামান্য প্রতিভাবান শাসক ছিলেন খলজী রাজবংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান—আলাউদ্দিন খলজী (Alauddin Khalji)। ১২৯৬ থেকে ১৩১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁর ২০ বছরের রাজত্বকাল ছিল রক্তপাত, দিগ্বিজয়, এবং যুগান্তকারী সব প্রশাসনিক সংস্কারের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।

একদিকে তিনি ছিলেন এক রক্তপিপাসু বিজেতা, যিনি নিজের জন্মদাতা পিতৃব্যকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছিলেন, অন্যদিকে তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী অর্থনীতিবিদ, যাঁর প্রবর্তিত 'বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি' (Market Control Policy) আজকের আধুনিক অর্থনীতিবিদদেরও ভাবিয়ে তোলে। এর পাশাপাশি তাঁর নামের সাথে জড়িয়ে আছে মেবারের রানি পদ্মাবতীর (Rani Padmavati) সেই অমর অথচ বিতর্কিত ইতিহাস, যা নিয়ে আজও পণ্ডিতদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই।

আসুন, অত্যন্ত তথ্যবহুল এবং গবেষণালব্ধ এই মেগা আর্টিকেলে আমরা আলাউদ্দিন খলজীর সিংহাসন আরোহণ, সাম্রাজ্য বিস্তার, রানি পদ্মাবতীর ঐতিহাসিক সত্যতা, তাঁর যুগান্তকারী বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি এবং কঠোর রাজস্ব সংস্কার সম্পর্কে অত্যন্ত বিশদভাবে জেনে নিই।


১. সিংহাসন দখল: রক্তের দাগে লেখা এক সূচনা (১২৯৬ খ্রিস্টাব্দ)

আলাউদ্দিন খলজীর আসল নাম ছিল আলি গুরশাস্প (Ali Gurshasp)। তিনি ছিলেন খলজী বংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং দিল্লির সুলতান জালালউদ্দিন খলজীর ভাইপো এবং জামাতা। জালালউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু এবং শান্তিকামী একজন বয়স্ক শাসক। কিন্তু আলাউদ্দিনের ধমনীতে বইত সাম্রাজ্য বিস্তারের তীব্র লালসা।

১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন সুলতানের বিনা অনুমতিতেই দাক্ষিণাত্যের দেবগিরি আক্রমণ করেন এবং সেখান থেকে অকল্পনীয় ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে আসেন। এই বিপুল সম্পদ আলাউদ্দিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কড়ায় (এলাহাবাদের কাছে) যখন সুলতান জালালউদ্দিন আনন্দে তাঁর ভাইপোকে আলিঙ্গন করতে আসেন, তখন আলাউদ্দিনের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর গুপ্তঘাতকরা বৃদ্ধ সুলতানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিজের চাচার ছিন্নমস্তক বর্শার ডগায় গেঁথে আলাউদ্দিন নিজেকে দিল্লির সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। সিংহাসনে বসার এই রক্তমাখা ইতিহাসই প্রমাণ করেছিল যে আলাউদ্দিনের শাসনকাল কতটা কঠোর এবং নির্মম হতে চলেছে।


২. মোঙ্গল আক্রমণ এবং সাম্রাজ্য রক্ষা

আলাউদ্দিন খলজী এমন এক সময় দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন, যখন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গলদের (Mongols) আক্রমণের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল। চেঙ্গিজ খানের বংশধররা বারবার ভারত আক্রমণের চেষ্টা করছিল। আলাউদ্দিনের রাজত্বকালে অন্তত ছ'বার মোঙ্গলরা এক বিশাল বাহিনী নিয়ে দিল্লি পর্যন্ত চলে এসেছিল।

কিন্তু আলাউদ্দিন খলজী তাঁর দুর্ধর্ষ সেনাপতিদের (যথা- জাফর খান, উলুঘ খান এবং নুসরাত খান) সাহায্যে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে মোঙ্গলদের পরাজিত করেন। জাফর খান মোঙ্গলদের মনে এতটাই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন যে, বলা হতো মোঙ্গলদের ঘোড়া জল না খেলে তারা ভাবত জাফর খান বুঝি ভয় দেখাচ্ছেন। মোঙ্গলদের হাত থেকে ভারতকে রক্ষা করা আলাউদ্দিন খলজীর সামরিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। এই মোঙ্গল আক্রমণ ঠেকানোর তাগিদেই তিনি এক বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা সরাসরি তাঁর বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতির জন্ম দিয়েছিল।


৩. রানি পদ্মাবতী এবং চিতোর আক্রমণ: ইতিহাস নাকি রোমান্টিক কল্পনা?

আলাউদ্দিন খলজীর সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত এবং বিতর্কিত অধ্যায়টি হলো ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের চিতোর (Chittor) আক্রমণ এবং মেবারের রানি পদ্মাবতী বা পদ্মিনীর উপাখ্যান।

পদ্মাবতীর কিংবদন্তি (The Legend of Padmavati): রাজপুত চারণকবিদের গাথা এবং লোকমুখে প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, চিতোরের রানা রতন সিংয়ের স্ত্রী রানি পদ্মিনী ছিলেন অপরূপ রূপবতী। তাঁর রূপের কথা শুনে আলাউদ্দিন খলজী পাগল হয়ে ওঠেন এবং কেবল রানিকে পাওয়ার লালসাতেই চিতোর আক্রমণ করেন। শর্ত দেওয়া হয় যে, রানিকে একবার আয়নার মাধ্যমে দেখতে পেলেই সুলতান ফিরে যাবেন। কিন্তু রতন সিংকে ছলনা করে বন্দি করা হয় এবং পরবর্তীতে রাজপুতদের সাথে আলাউদ্দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাঁধে। যুদ্ধে রানা রতন সিংয়ের পতন নিশ্চিত জেনে রানি পদ্মাবতী হাজার হাজার রাজপুত রমণীকে নিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে 'জওহর' (Jauhar) ব্রত পালন করেন এবং নিজেদের সম্মান রক্ষা করেন।

ঐতিহাসিক সত্যতা এবং 'পদ্মাবত' কাব্য: ইতিহাসবিদদের কাছে রানি পদ্মাবতীর অস্তিত্ব আজও একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। এর কারণ হলো:

সমসাময়িক রেকর্ডের অভাব: আলাউদ্দিন যখন চিতোর আক্রমণ করেন, তখন তাঁর সাথে ছিলেন প্রখ্যাত দরবারি কবি এবং ঐতিহাসিক আমির খসরু (Amir Khusrau)। আমির খসরু তাঁর 'খাজাইন-উল-ফুতুহ' (Khazain-ul-Futuh) গ্রন্থে চিতোর অভিযানের অত্যন্ত খুঁটিনাটি বর্ণনা দিয়েছেন এবং জওহরের কথাও লিখেছেন, কিন্তু সেখানে 'পদ্মাবতী' বা রানির রূপের কারণে যুদ্ধের কোনো উল্লেখই নেই। জিয়াউদ্দীন বারাণী (Ziauddin Barani)-এর মতো ঐতিহাসিকরাও এই বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব।

মালিক মুহম্মদ জায়সীর কাব্য: রানি পদ্মাবতীর এই আখ্যানটি সর্বপ্রথম লিখিত আকারে পাওয়া যায় আলাউদ্দিনের মৃত্যুর প্রায় ২৩৪ বছর পর! ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহ সুরির আমলে সুফি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সী (Malik Muhammad Jayasi) অবধী ভাষায় 'পদ্মাবত' নামক একটি মহাকাব্য রচনা করেন। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, 'পদ্মাবত' হলো মূলত একটি সুফি রূপক কাব্য (Allegorical poem), যেখানে রতন সিং হলেন আত্মার প্রতীক, পদ্মাবতী হলেন ঐশ্বরিক জ্ঞানের প্রতীক এবং আলাউদ্দিন খলজী হলেন শয়তান বা লালসার প্রতীক।

চিতোর আক্রমণের প্রকৃত ঐতিহাসিক কারণ: ইতিহাসবিদদের মতে, আলাউদ্দিন খলজীর মতো একজন ধুরন্ধর সাম্রাজ্যবাদী শাসকের কাছে কেবল একজন নারীর রূপের কারণে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে যুদ্ধে যাওয়াটা যৌক্তিক নয়। চিতোর আক্রমণের পেছনে ছিল নিখাদ রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক স্বার্থ। গুজরাট এবং মালব অঞ্চলে যাওয়ার প্রধান বাণিজ্যিক এবং সামরিক পথটি চিতোরের ওপর দিয়ে যেত। চিতোরের দুর্গ ছিল অত্যন্ত দুর্ভেদ্য এবং কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ভারত থেকে দাক্ষিণাত্যে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে হলে চিতোর দখল করা আলাউদ্দিনের জন্য অপরিহার্য ছিল।

তবে রানি পদ্মাবতীর গল্পটি ইতিহাস না রূপকথা—তা নিয়ে তর্ক থাকলেও, চিতোরের রাজপুত রমণীদের আত্মসম্মান রক্ষার্থে 'জওহর' ব্রত পালনের ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ সত্য এবং মর্মান্তিক।


৪. আলাউদ্দিন খলজীর যুগান্তকারী বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি (Market Control Policy)

আলাউদ্দিন খলজীর শাসনকালের সবচেয়ে আলোচিত, প্রশংসিত এবং বিস্ময়কর পদক্ষেপটি হলো তাঁর প্রবর্তিত 'বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি' বা Price Control System। মধ্যযুগের ইতিহাসে এমন সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক সংস্কার আর কোনো শাসক করে দেখাতে পারেননি।

এই নীতি প্রবর্তনের কারণ কী ছিল? ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারাণী তাঁর 'তারিখ-ই-ফিরোজশাহী' গ্রন্থে এর মূল কারণটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। মোঙ্গলদের ক্রমাগত আক্রমণ প্রতিহত করা এবং সমগ্র ভারত জয়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য আলাউদ্দিন খলজীর একটি বিশাল স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর (Standing Army) প্রয়োজন ছিল। তাঁর সেনাবাহিনীতে প্রায় ৪ লক্ষ ৭৫ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য ছিল।

এত বিশাল সৈন্যবাহিনীকে বেশি বেতন দিলে রাজকোষ খুব দ্রুত শূন্য হয়ে যেত। তাই আলাউদ্দিন সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি সৈন্যদের একটি নির্দিষ্ট ও অপেক্ষাকৃত কম বেতন দেবেন (একজন অশ্বারোহী সৈন্যের বার্ষিক বেতন ছিল ২৩৪ তঙ্কা)। কিন্তু এই অল্প বেতনে যাতে সৈন্যরা পরিবার নিয়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে, তার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সম্পূর্ণভাবে কমিয়ে দেওয়া এবং তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই সামরিক এবং অর্থনৈতিক তাগিদ থেকেই জন্ম নেয় ঐতিহাসিক বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি।


৫. বিভিন্ন ধরনের বাজার স্থাপন ও তাদের বিন্যাস

আলাউদ্দিন খলজী দিল্লির বাজার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজান। তিনি পুরো বাজারকে তিনটি বা চারটি নির্দিষ্ট ভাগে বিভক্ত করেছিলেন এবং প্রতিটি বাজারের জন্য আলাদা নিয়মকানুন ও স্থান নির্ধারণ করেছিলেন:

ক) গাল্লা-ই-মান্ডি (Galla-i-Mandi) বা শস্যের বাজার: এটি ছিল সমস্ত ধরনের খাদ্যশস্যের (গম, যব, চাল, ডাল) বাজার। দোয়াব অঞ্চল (গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী উর্বর এলাকা) থেকে কৃষকদের তাদের উদ্বৃত্ত শস্য সরাসরি এই মান্ডিতে বিক্রি করতে হতো। কেউ শস্য মজুত বা মজুতদারি (Hoarding) করতে পারত না।

খ) সরাই-ই-আদল (Serai-i-Adl) বা বস্ত্র ও মূল্যবান সামগ্রীর বাজার: বদায়ুন গেটের কাছে অবস্থিত এই বাজারটি ছিল মূলত কাপড়, ঘি, মাখন, চিনি, শুকনো ফল, পারস্য থেকে আমদানি করা মূল্যবান রেশম এবং সুগন্ধির জন্য। এখানে সরকার অনুমোদিত বণিক বা 'মুলতানি বণিক'রাই কেবল ব্যবসা করতে পারত।

গ) ঘোড়া, দাস-দাসী ও গবাদি পশুর বাজার: সেই যুগে সেনাবাহিনীর জন্য ঘোড়া এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য দাস-দাসীদের ব্যাপক চাহিদা ছিল। আলাউদ্দিন দালাল বা ফড়েদের (Middlemen) ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে চূর্ণ করে দেন, যারা আগে ঘোড়ার দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দিত।

ঘ) সাধারণ বাজার (General Market): মাছ, মাংস, শাকসবজি, রুটি থেকে শুরু করে সুই-সুতো বা মাটির পাত্রের মতো প্রাত্যহিক জিনিসপত্রের জন্য সাধারণ বাজার তৈরি করা হয়েছিল।


৬. জিনিসপত্রের দাম নির্ধারণ (Price Fixation)

আলাউদ্দিন খলজী প্রতিটি ছোট-বড় জিনিসপত্রের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (Maximum Retail Price) এমনভাবে বেঁধে দিয়েছিলেন যে, কোনো ব্যবসায়ীর সাধ্য ছিল না তার চেয়ে এক বেশি দামে জিনিস বিক্রি করে। সেকালের মুদ্রার একক ছিল 'তঙ্কা' (Tanka) এবং 'জিতল' (Jital)। (১ তঙ্কা = ৪৮ জিতল)।

ঐতিহাসিক বারাণীর বিবরণ থেকে জিনিসপত্রের যে দাম জানা যায়, তা আজকের দিনে অকল্পনীয়:

গম (প্রতি মণ): ৭.৫ জিতল

যব (প্রতি মণ): ৪ জিতল

চাল ও ডাল (প্রতি মণ): ৫ জিতল

ঘি (আড়াই সের): ১ জিতল

একটি ভালো জাতের ঘোড়া: ১০০ থেকে ১২০ তঙ্কা

একজন সাধারণ দাসী: ৫ থেকে ১২ তঙ্কা

আলাউদ্দিনের এই নীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, খরা বা দুর্ভিক্ষের সময়ও জিনিসপত্রের দাম এক পয়সাও বাড়ত না। রেশনিং ব্যবস্থা (Rationing System) চালু করে সাধারণ মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া হতো।


৭. কঠোর প্রশাসন এবং গুপ্তচর ব্যবস্থা (Administration & Espionage)

বাজারদর খাতায়-কলমে বেঁধে দেওয়াই শেষ কথা নয়, সেটিকে বাস্তবে প্রয়োগ করা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। আলাউদ্দিন এই বাজার ব্যবস্থা দেখাশোনার জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলেছিলেন:

দিওয়ান-ই-রিয়াসত (Diwan-i-Riyasat): এটি ছিল বাণিজ্য মন্ত্রক। এর প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও কঠোর কর্মকর্তা মালিক কবুল।

শাহানা-ই-মান্ডি (Shahna-i-Mandi): প্রতিটি বাজারের দেখাশোনার জন্য একজন সুপারিনটেনডেন্ট বা শাহানা নিযুক্ত থাকতেন। ব্যবসায়ীদের নাম এই দপ্তরে নথিভুক্ত করতে হতো।

মুহতাসিব (Muhtasib) এবং বারিদ (Barid): এরা ছিলেন বাজারের পরিদর্শক এবং গুপ্তচর। বাজারের প্রতিটি ছোট-বড় খবর এরা সরাসরি সুলতানের কানে পৌঁছে দিতেন।

মুনহিয়ান (Munhiyans): আলাউদ্দিনের নিজস্ব গোপন গুপ্তচর বাহিনী।

নির্মম শাস্তির বিধান: আলাউদ্দিনের বাজার ব্যবস্থা সফল হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তাঁর ড্রাকোনিয়ান বা অমানবিক শাস্তির ভয়। সুলতান মাঝে মাঝেই রাজপ্রাসাদ থেকে ছোট ছোট ছেলেদের কয়েকটা পয়সা দিয়ে বাজারে পাঠাতেন জিনিস কিনে আনার জন্য। জিনিস কিনে আনার পর রাজদরবারে তা ওজন করে দেখা হতো। যদি কোনো অসাধু দোকানদার ওজনে একটুও কম দিত, তবে আলাউদ্দিনের নির্দেশে ওই দোকানদারের শরীর থেকে ঠিক সমপরিমাণ মাংস কেটে নেওয়া হতো! এই ভয়ংকর শাস্তির ভয়ে ব্যবসায়ীদের রক্ত জল হয়ে যেত এবং কেউ ওজনে কম দেওয়া বা বেশি দাম নেওয়ার সাহস দেখাত না।


৮. রাজস্ব ও কৃষি সংস্কার (Agrarian Reforms)

বাজারদর ঠিক রাখার জন্য কৃষিব্যবস্থার সংস্কার ছিল অত্যন্ত জরুরি। আলাউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন যে মধ্যস্বত্বভোগী বা জমিদাররা কৃষকদের শোষণ করছে এবং সুলতানের প্রাপ্য কর ফাঁকি দিচ্ছে।

জমি জরিপ (Measurement of Land): আলাউদ্দিন ভারতের প্রথম মুসলিম শাসক, যিনি সমস্ত চাষযোগ্য জমি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাপজোখ (জরিপ) করার নির্দেশ দেন। জমির একক হিসেবে 'বিশ্বা' (Biswa) চালু করা হয়।

কর বৃদ্ধি: তিনি গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ৫০ শতাংশ বা অর্ধেক সরাসরি কর (খারাজ) হিসেবে ধার্য করেন।

মধ্যস্বত্বভোগীদের পতন: তিনি হিন্দু ও মুসলিম জমিদার, খুত, মুকাদ্দাম এবং চৌধুরীদের সমস্ত বিশেষ অধিকার (যেমন- করমুক্ত জমি) কেড়ে নেন। বারাণীর ভাষায়, "খুত এবং মুকাদ্দামদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে তাদের স্ত্রীদের অন্যের বাড়িতে গিয়ে কাজ করতে হতো।"


৯. স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক অবদান

কেবল রক্তপাত বা অর্থনীতি নয়, আলাউদ্দিন খলজী ছিলেন শিল্প ও স্থাপত্যের এক বড় পৃষ্ঠপোষক।

দিল্লির কুতুব মিনার চত্বরে অবস্থিত বিখ্যাত 'আলাই দরওয়াজা' (Alai Darwaza) তাঁরই অমর সৃষ্টি। এটি ইসলামি স্থাপত্যের এক নিখুঁত মাস্টারপিস, যেখানে প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গম্বুজ (Dome) তৈরি করা হয়েছিল।

তিনি মোঙ্গলদের হাত থেকে বাঁচার জন্য দিল্লিতে 'সিরি ফোর্ট' (Siri Fort) নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন শহর তৈরি করেন।

তাঁর দরবার আলোকিত করে রেখেছিলেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি এবং সুরকার, যাঁকে 'ভারতের তোতাপাখি' (Parrot of India) বলা হয়—আমির খসরু (Amir Khusrau)। আমির খসরু এবং হাসান সিজজির মতো প্রখ্যাত পণ্ডিতরা আলাউদ্দিনের রাজত্বকালেই তাঁদের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম রচনা করেছিলেন।


১০. ঐতিহাসিক মূল্যায়ন এবং পরিণতি

আলাউদ্দিন খলজীর বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি তাঁর জীবদ্দশায় ছিল এক ১০০% সফল প্রজেক্ট। এর ফলে তিনি একটি বিশাল সৈন্যবাহিনী গঠন করতে পেরেছিলেন, মোঙ্গলদের তাড়িয়েছিলেন এবং সমগ্র উত্তর ও দক্ষিণ ভারত (মালিক কাফুরের নেতৃত্বে) জয় করে এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েছিলেন। দিল্লির সাধারণ মানুষ সস্তায় খাবার পেয়ে অত্যন্ত সুখে ছিল।

কিন্তু এই নীতির নেতিবাচক দিক কী ছিল? আধুনিক অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আলাউদ্দিনের এই অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ কৃত্রিম এবং বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের দাম এত কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, কৃষকদের জীবনে চরম দারিদ্র্য নেমে এসেছিল। ব্যবসায়ীরা কোনো মুনাফা করতে পারত না। এটি ছিল মূলত সামরিক স্বার্থে তৈরি করা এক তরফা নীতি।

১৩১৬ খ্রিস্টাব্দে যখন আলাউদ্দিন খলজীর মৃত্যু হয়, তখন তাঁর চোখ রাঙানি এবং তরবারির ভয়ও শেষ হয়ে যায়। মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর এই সুপরিকল্পিত এবং কৃত্রিম বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে এবং জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, নৈতিকতার বিচারে আলাউদ্দিন খলজী ছিলেন এক চরম স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর এবং রক্তপিপাসু শাসক। কিন্তু একজন প্রশাসক এবং অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে শত শত বছর এগিয়ে। রানি পদ্মাবতীকে পাওয়ার লালসা কিংবা মোঙ্গলদের শিরশ্ছেদ করে মিনার বানানো—এসব গল্প বা সত্যের আড়ালে আলাউদ্দিন খলজী ভারতের ইতিহাসে এমন এক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে গিয়েছিলেন, যার ছায়া পরবর্তীকালে শেরশাহ সুরি এবং সম্রাট আকবরের শাসনব্যবস্থাতেও পরিলক্ষিত হয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় তিনি একাধারে যেমন 'খলনায়ক', ঠিক তেমনই এক 'প্রশাসনিক বিস্ময়' হিসেবে চিরকাল থেকে যাবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ