ভূমিকা:
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু দিন থাকে, যা একটি গোটা জাতির ভাগ্যকে শতাব্দীর পর শতাব্দীর জন্য অন্ধকারে নিমজ্জিত করে দেয়। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন দিনটি ছিল বাংলার, তথা সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসে ঠিক তেমনই এক অভিশপ্ত দিন। ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সেদিন যা ঘটেছিল, তাকে কোনোভাবেই একটি গতানুগতিক 'যুদ্ধ' বলা যায় না, এটি ছিল মূলত একটি পূর্বপরিকল্পিত সামরিক ও রাজনৈতিক প্রহসন।
যে বাংলা ছিল সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে ধনী এবং সমৃদ্ধশালী প্রদেশ, সেই বাংলার ক্ষমতা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একদল বিদেশি বণিকের হাতে চলে যায়। আর এই পতনের পেছনে কোনো বিদেশি সেনার বীরত্ব ছিল না, ছিল আপনজনদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং ক্ষমতার নোংরা লালসা। নবাব সিরাজউদ্দৌলা—যাঁকে আমরা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব হিসেবে জানি—তিনি হয়তো বয়সে নবীন এবং রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে আজও কোনো ঐতিহাসিক প্রশ্ন তুলতে পারেননি।
কীভাবে একটি শক্তিশালী প্রদেশ মাত্র তিন হাজার ব্রিটিশ সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করল? কেন মীরজাফর, জগৎ শেঠ এবং ঘসেটি বেগমরা নিজেদের মাতৃভূমিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দিতে পিছপা হলেন না? এই সুদীর্ঘ এবং গবেষণামূলক মেগা আর্টিকেলে আমরা নবাব সিরাজউদ্দৌলার উত্থান, পলাশীর যুদ্ধের নেপথ্য কারণ, বিশ্বাসঘাতকতার সেই কালো অধ্যায় এবং বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার এক রোমাঞ্চকর অথচ হৃদয়বিদারক ইতিহাস অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করব।
১. আলীবর্দী খানের সুশাসন এবং ইউরোপীয়দের আগমন
পলাশীর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের কিছুটা পিছিয়ে নবাব আলীবর্দী খানের (Alivardi Khan) শাসনামলে ফিরে যেতে হবে। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে আলীবর্দী খান সরফরাজ খানকে পরাজিত করে বাংলার মসনদ দখল করেন। তাঁর ১৫ বছরের শাসনকাল ছিল মারাঠা বর্গিদের আক্রমণ প্রতিহত করা এবং বাংলাকে অর্থনৈতিকভাবে সুদৃঢ় করার এক নিরলস সংগ্রাম।
সেই সময় বাংলায় পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি এবং ব্রিটিশ—এই চার ইউরোপীয় শক্তির বণিকরা বাণিজ্য করত। আলীবর্দী খান ইউরোপীয় বণিকদের খুব ভালো করেই চিনতেন। তিনি তাদের একটি চমৎকার উপমা দিয়ে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলতেন, "ইউরোপীয় বণিকরা হলো মৌমাছির মতো। তুমি যদি তাদের শান্তভাবে মধু সংগ্রহ করতে দাও, তবে তারা তোমাকে লাভবান করবে। কিন্তু তুমি যদি তাদের চাকে ঢিল মারো, তবে তারা তোমাকে কামড়ে কামড়ে মেরে ফেলবে।"
এই প্রজ্ঞাবান নবাব জানতেন যে ইউরোপীয়দের কখনোই সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে দেওয়া যাবে না। তাই তিনি ফরাসিদের চন্দননগরে এবং ব্রিটিশদের কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর বাংলার মসনদে যখন তাঁর প্রিয় দৌহিত্র (নাতি) সিরাজউদ্দৌলা বসেন, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
২. তরুণ সিরাজের সিংহাসন আরোহণ: ঘরের ভেতরেই শত্রুর আস্ফালন
১৭৫৬ সালের ১০ই এপ্রিল, মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা যখন বাংলার নবাব হিসেবে সিংহাসনে বসেন, তখন তাঁর চারপাশে কেবল ষড়যন্ত্র আর শত্রুদের জাল বিছানো ছিল। তাঁর সিংহাসন আরোহণকে তাঁর নিজের পরিবারের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি।
সিরাজের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল তাঁর আপন বড় খালা (মাসি) ঘসেটি বেগম (Ghaseti Begum)। ঘসেটি বেগম ছিলেন বিপুল ধনসম্পত্তির মালিক এবং তিনি সিরাজের বদলে তাঁর পালিত পুত্র শওকত জংকে (পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা) সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিলেন। এছাড়া সিরাজের আরেক বড় মাথা ব্যথা ছিল তাঁর প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান (Mir Jafar), যিনি ছিলেন আলীবর্দী খানের ভগ্নিপতি। মীরজাফর অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন এবং দীর্ঘকাল ধরে তিনি নিজেই নবাব হওয়ার স্বপ্ন লালন করছিলেন।
সিংহাসনে বসেই সিরাজ বুঝতে পেরেছিলেন যে এই অভ্যন্তরীণ শত্রুরা যেকোনো সময় তাঁর পতন ডেকে আনতে পারে। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ঘসেটি বেগমকে নিজ প্রাসাদে নজরবন্দি করেন এবং তাঁর বিপুল ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। এরপর তিনি পূর্ণিয়ার শওকত জংয়ের বিদ্রোহ দমন করে তাঁকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন। কিন্তু এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিল এক তৃতীয় পক্ষ—ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
৩. ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্য ও সংঘাতের মূল কারণসমূহ
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশদের সংঘাত কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে বেশ কয়েকটি প্রত্যক্ষ এবং অত্যন্ত যৌক্তিক কারণ ছিল, যেখানে নবাবের দিক থেকে কোনো ভুল ছিল না, বরং ব্রিটিশদের চরম অবাধ্যতাই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
দস্তকের অপব্যবহার (Misuse of Dastak): ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ার ব্রিটিশ কোম্পানিকে বছরে মাত্র ৩০০০ টাকার বিনিময়ে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার জন্য একটি ছাড়পত্র বা 'দস্তক' দিয়েছিলেন। এই দস্তকটি কেবল কোম্পানির ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু কোম্পানির দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসাতেও এই দস্তক ব্যবহার শুরু করে এবং ভারতীয় বণিকদের কাছে তা চড়া দামে বিক্রি করতে থাকে। এর ফলে বাংলার রাজকোষ মারাত্মকভাবে রাজস্ব হারাতে থাকে। সিরাজ এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।
দুর্গ নির্মাণ (Fortification of Fort William): ইউরোপে তখন ব্রিটিশ এবং ফরাসিদের মধ্যে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (Seven Years' War) চলছিল। এর অজুহাত দিয়ে ব্রিটিশরা কলকাতায় এবং ফরাসিরা চন্দননগরে নবাবের বিনা অনুমতিতেই সামরিক দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। সিরাজউদ্দৌলা বাংলার সার্বভৌমত্বের স্বার্থে অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। ফরাসিরা নবাবের নির্দেশ মানলেও, রজার ড্রেকের নেতৃত্বে ব্রিটিশরা চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে দুর্গ নির্মাণ অব্যাহত রাখে।
কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় প্রদান: ঘসেটি বেগমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দেওয়ান রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস (বা কৃষ্ণবল্লভ) রাজকোষের প্রচুর অর্থ আত্মসাৎ করে পরিবারসহ কলকাতায় ব্রিটিশদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেন। সিরাজউদ্দৌলা যখন তাঁর গুপ্তচর নারায়ণ সিংকে পাঠিয়ে কৃষ্ণদাসকে ফেরত চান, তখন ব্রিটিশ গভর্নর রজার ড্রেক কেবল তা প্রত্যাখ্যানই করেননি, বরং নবাবের দূতকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন।
উপঢৌকন না পাঠানো: নবাব সিংহাসনে বসার পর রীতি অনুযায়ী অন্যান্য বণিকরা উপঢৌকন ও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠালেও ব্রিটিশরা তা করেনি, যা ছিল একজন সার্বভৌম শাসকের প্রতি চরম অবজ্ঞা।
৪. কলকাতা আক্রমণ এবং বিতর্কিত 'অন্ধকূপ হত্যা' (Black Hole Tragedy)
ব্রিটিশদের এই চরম ঔদ্ধত্য তরুণ নবাবের অহংকারে মারাত্মক আঘাত হানে। বাংলার মাটি থেকে এই অবাধ্য বণিকদের শায়েস্তা করার জন্য সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের মে মাসে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণ করেন এবং বিনা বাধায় তা দখল করেন।
এরপর তিনি সরাসরি কলকাতার দিকে অগ্রসর হন। নবাবের বিশাল বাহিনীর আগমন দেখে গভর্নর রজার ড্রেক, সেনাপতি মিনচিন এবং অন্যান্য ব্রিটিশ কর্মকর্তারা নারী ও শিশুদের জাহাজে চাপিয়ে কাপুরুষের মতো ফলতায় পালিয়ে যান। ১৬ই জুন সিরাজউদ্দৌলা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ অবরোধ করেন এবং মাত্র চারদিনের মধ্যে কলকাতা দখল করে নেন। তিনি তাঁর দাদামশাইয়ের নামানুসারে কলকাতার নতুন নাম রাখেন 'আলীনগর' (Alinagar)।
অন্ধকূপ হত্যা বা ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডি:
কলকাতা দখলের পর ২০শে জুন রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক হলওয়েল (J.Z. Holwell) এক ভয়ানক ঘটনার বর্ণনা দেন, যা ইতিহাসে 'ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডি' নামে পরিচিত। হলওয়েলের দাবি অনুযায়ী, নবাবের সৈন্যরা ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট চওড়া একটি দমবন্ধ করা ছোট অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ১৪৬ জন ব্রিটিশ বন্দিকে আটকে রাখে। জুনের তীব্র গরমে এবং শ্বাসকষ্টে পরের দিন সকালে নাকি ১২৩ জন বন্দি মারা যায়!
ঐতিহাসিক সত্যতা: আধুনিক ইতিহাসবিদরা (যেমন—যদুনাথ সরকার, সুশীল চৌধুরী) হলওয়েলের এই গল্পকে সম্পূর্ণ 'অতিরঞ্জিত' এবং 'মিথ্যে প্রোপাগান্ডা' বলে প্রমাণ করেছেন। প্রথমত, ওই ছোট একটি ঘরে গাণিতিকভাবে কোনোভাবেই ১৪৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ঢোকানো সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, সমসাময়িক কোনো মুঘল বা স্থানীয় নথিতে এমন ঘটনার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। এটি ছিল মূলত ইংল্যান্ডের মানুষের সহানুভূতি আদায় করার জন্য এবং নবাবকে একজন 'নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী' হিসেবে প্রমাণ করার জন্য হলওয়েলের সাজানো একটি নাটক।
৫. রবার্ট ক্লাইভের আগমন এবং আলীনগরের অপমানজনক সন্ধি
কলকাতার পতন এবং ব্রিটিশদের বিতাড়িত হওয়ার খবর যখন মাদ্রাজে পৌঁছায়, তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাদের সবচেয়ে ধুরন্ধর এবং সামরিক কূটনীতিতে পারদর্শী সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ (Robert Clive) এবং অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে বিশাল নৌবাহিনীসহ বাংলায় পাঠায়।
১৭৫৬ সালের ডিসেম্বরে ক্লাইভ বাংলায় পৌঁছান। তিনি বাংলার সেনাপতি মানিকচাঁদকে বিপুল অর্থের লোভ দেখিয়ে বিনা যুদ্ধেই ১৭৫৭ সালের ২রা জানুয়ারি কলকাতা পুনরায় দখল করে নেন। এরপর ক্লাইভ হুগলি শহর আক্রমণ করে সেখানে চরম লুটতরাজ চালান। সিরাজউদ্দৌলা এই খবর পেয়ে পুনরায় কলকাতা অভিমুখে রওনা হন।
কিন্তু ততদিনে নবাবের সেনাবাহিনীর ভেতরে মীরজাফর ও অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে। নবাবের বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা এবং আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালির বাংলা আক্রমণের একটা ভুয়া গুজবের কারণে সিরাজ কিছুটা পিছপা হন। বাধ্য হয়ে ১৭৫৭ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি নবাব ব্রিটিশদের সাথে এক অত্যন্ত অপমানজনক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যা ইতিহাসে 'আলীনগরের সন্ধি' নামে পরিচিত।
এই সন্ধির মাধ্যমে ব্রিটিশরা তাদের সমস্ত হারানো বাণিজ্যিক সুবিধা ফেরত পায়, নবাব দুর্গ নির্মাণের অধিকার মেনে নেন এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হন। ক্লাইভ এখানেই থেমে যাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সিরাজউদ্দৌলা যতদিন সিংহাসনে আছেন, ততদিন ব্রিটিশদের একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম হবে না। তাই ক্লাইভ বাংলার মসনদ থেকে সিরাজকে সরানোর এক গভীর ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করতে শুরু করেন।
৬. কর্পোরেট ও সামরিক চক্রান্ত: মীরজাফর ও জগৎ শেঠদের গোপন ব্লু-প্রিন্ট
পলাশীর যুদ্ধ মূলত কোনো সামরিক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি কর্পোরেট ও রাজনৈতিক চক্রান্তের চূড়ান্ত পরিণতি। ক্লাইভ খুব ভালো করেই জানতেন যে সরাসরি যুদ্ধে বাংলার বিশাল সেনবাহিনীর সাথে ব্রিটিশদের তিন হাজার সেনা এক ঘণ্টাও টিকতে পারবে না। তাই তিনি কূটনীতির আশ্রয় নিলেন।
বাংলার তৎকালীন অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন জগৎ শেঠ (Jagat Seth) নামের এক মারোয়াড়ি মহাজন পরিবার। তাঁরা ছিলেন সেকালের সবচেয়ে বড় ব্যাংকার। জগৎ শেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ এবং ইয়ার লতিফের মতো প্রভাবশালী অভিজাতরা সিরাজের শাসন নিয়ে চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। রবার্ট ক্লাইভ এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে তাদের সাথে গোপন বৈঠক শুরু করেন।
ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড ও চুক্তি:
ঠিক হয় যে সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে প্রধান সেনাপতি মীরজাফরকে বাংলার নতুন পুতুল নবাব করা হবে। এর বিনিময়ে মীরজাফর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কোটি কোটি টাকা এবং অবাধ বাণিজ্যের অধিকার দেবেন।
এই চুক্তির মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় শিখ ব্যবসায়ী উমিচাঁদ (Umichand)। সে ক্লাইভকে হুমকি দেয় যে, নবাবের কোষাগার থেকে তাকে ৩০ লক্ষ টাকা কমিশন না দিলে সে এই ষড়যন্ত্রের কথা সিরাজকে জানিয়ে দেবে। অত্যন্ত ধুরন্ধর ক্লাইভ তখন দুটি চুক্তিপত্র তৈরি করেন—একটি সাদা কাগজে আসল চুক্তি, আর একটি লাল কাগজে নকল চুক্তি (যেখানে উমিচাঁদকে টাকা দেওয়ার কথা লেখা ছিল)। এই লাল কাগজের চুক্তিতে ক্লাইভ অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের জাল সই পর্যন্ত করেছিলেন!
১৭৫৭ সালের ৫ই জুন ক্লাইভ এবং মীরজাফরের মধ্যে গোপন চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর ক্লাইভ আলীনগরের সন্ধি ভঙ্গের এক মিথ্যা অজুহাত খাড়া করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।
৭. পলাশীর প্রান্তর: ২৩শে জুন ১৭৫৭ - এক অসম যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রহসন
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন। স্থান: বর্তমান নদিয়া জেলার ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর এক বিশাল আমবাগান।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীতে ছিল প্রায় ৫০ হাজার সেনা (৩৫ হাজার পদাতিক, ১৫ হাজার অশ্বারোহী) এবং ৫৩টি ভারী কামান। অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীতে ছিল মাত্র ৩,০০০ সৈন্য (যার মধ্যে ব্রিটিশ সেনা ছিল মাত্র ৮০০ জন) এবং ৯টি ছোট কামান। সংখ্যার বিচারে এটি ছিল হাতি আর মশার লড়াই।
সকাল ৮টার দিকে নবাবের ফরাসি গোলন্দাজ সেনাপতি সিনফ্রে (Sinfray)-এর তোপ দাগার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। নবাবের পক্ষে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিলেন দুই বিশ্বস্ত ও দেশপ্রেমিক সেনাপতি—মীর মদন (Mir Madan) এবং মোহনলাল (Mohanlal)। তাদের তুমুল আক্রমণের মুখে রবার্ট ক্লাইভ এবং তাঁর বাহিনী আমবাগানের পেছনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ক্লাইভ প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং ভাবছিলেন রাতের আঁধারে কীভাবে জাহাজে করে পালানো যায়।
মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা:
ঠিক এমন সময় নবাব বাহিনীর বিশাল একটি অংশ—যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং মীরজাফর, রায়দুর্লভ এবং ইয়ার লতিফ—তারা মূর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নবাবের ৫০ হাজার সেনার মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার সেনাই যুদ্ধে অংশ নিল না। তারা কেবল নীরব দর্শকের মতো এই তামাশা দেখতে লাগল।
৮. প্রকৃতির পরিহাস এবং বৃষ্টির বিশ্বাসঘাতকতা
দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই পলাশীর প্রান্তরে এক মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। ব্রিটিশরা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সাথে করে ত্রিপল (Tarpaulin) এনেছিল, যা দিয়ে তারা তাদের বারুদ ও কামানগুলো ঢেকে ফেলে। কিন্তু নবাবের বাহিনীর কাছে এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বৃষ্টির জলে নবাবের সমস্ত বারুদ ভিজে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
বৃষ্টি থামার পর মীর মদন ভেবেছিলেন ব্রিটিশদের বারুদও হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে। এই ভেবে তিনি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ শিবিরের দিকে প্রবল বেগে আক্রমণ করেন। কিন্তু ব্রিটিশদের কামান তখন সম্পূর্ণ সচল ছিল। হঠাৎ করেই একটি কামানের গোলা এসে মীর মদনের উরুতে আঘাত করে এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। নবাবের তাঁবুতে নিয়ে যাওয়ার পথেই এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক বীরের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
মীর মদনের মৃত্যু ছিল সিরাজের জন্য এক বিরাট মানসিক ধাক্কা। তিনি দিশেহারা হয়ে মীরজাফরকে তাঁবুতে ডেকে পাঠান এবং নিজের পাগড়ি খুলে মীরজাফরের পায়ের কাছে রেখে অত্যন্ত করুণ স্বরে বলেন, "মীরজাফর, আজ আমার সম্মান তোমার হাতে। বাংলার ইজ্জত রক্ষা করো।" কোরআন ছুঁয়ে মীরজাফর মিথ্যা শপথ করেন, কিন্তু বাইরে গিয়ে তিনি মোহনলালকে যুদ্ধ থামিয়ে পিছু হটার নির্দেশ দেন এবং রবার্ট ক্লাইভকে গোপন মেসেজ পাঠান এখনই আক্রমণ করার জন্য।
মোহনলাল প্রথমে এই আত্মঘাতী নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলেও, নবাবের বারংবার আদেশে তিনি বাধ্য হয়ে সৈন্য প্রত্যাহার করতে শুরু করেন। পিছু হটার সময় নবাবের বাহিনীতে এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, আর ঠিক সেই সুযোগে রবার্ট ক্লাইভ তাঁর পুরো বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে একটি নিশ্চিত জেতা যুদ্ধ সিরাজউদ্দৌলা হেরে যান। বিকেল ৫টার মধ্যেই পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়ে যায়।
৯. সিরাজের পলায়ন এবং এক মর্মান্তিক পরিণতি
যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে সিরাজউদ্দৌলা তাঁর স্ত্রী লুৎফুন্নেসা এবং কন্যাকে নিয়ে একটি দ্রুতগামী উটে চড়ে রাজধানী মুর্শিদাবাদের দিকে পালিয়ে যান। কিন্তু মুর্শিদাবাদে পৌঁছে তিনি দেখেন যে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। সেনাপতি থেকে শুরু করে সাধারণ উজির—সবাই তাঁকে ছেড়ে পালিয়েছে।
বাধ্য হয়ে সিরাজ ছদ্মবেশ ধারণ করে ভগবানগোলা থেকে নৌকায় চড়ে পাটনার দিকে পালানোর চেষ্টা করেন। ফরাসি সেনাপতি ল' (Jean Law)-এর সাথে মিলিত হয়ে নতুন করে সৈন্য সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, রাজমহলের কাছে এক নদীর ঘাটে খাবার সংগ্রহের জন্য নৌকা থামালে দানা শাহ (মতান্তরে শরফউদ্দীন) নামের এক ফকির তাঁকে চিনে ফেলে। মজার ব্যাপার হলো, সিরাজ নবাব থাকা অবস্থায় একবার এই ফকিরকে কোনো এক অপরাধের কারণে শাস্তি দিয়েছিলেন। সেই ফকির টাকার লোভে নবাবকে মীরজাফরের সৈন্যদের হাতে ধরিয়ে দেয়।
বন্দি সিরাজউদ্দৌলাকে অত্যন্ত অপমানজনক অবস্থায় মুর্শিদাবাদে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৭৫৭ সালের ২রা জুলাই, মীরজাফরের নিষ্ঠুর পুত্র মীরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নামের এক ঘাতক সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। যে মোহাম্মদী বেগ সিরাজের পিতা ও মাতার দয়ায় লালিত-পালিত হয়েছিল, টাকার লোভে সে-ই সিরাজের বুকে ছুরি বসাতে দ্বিধা করেনি। সিরাজের রক্তাক্ত মৃতদেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে পুরো মুর্শিদাবাদ শহরে ঘোরানো হয়। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের জীবনের এক মর্মান্তিক অধ্যায়ের।
১০. পলাশীর যুদ্ধের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব
পলাশীর যুদ্ধ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বড় যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল কেবল কয়েক ঘণ্টার একটি ছোটখাটো খণ্ডযুদ্ধ। কিন্তু এর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল মারাত্মক এবং সুদূরপ্রসারী। আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনা মূলত এই পলাশীর প্রান্তর থেকেই শুরু হয়।
রাজনৈতিক দাসত্ব: পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফর বাংলার পুতুল নবাব হন ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। রবার্ট ক্লাইভ রাতারাতি বাংলার অঘোষিত সম্রাটে পরিণত হন। একটি নিছক বাণিজ্যিক কোম্পানি কীভাবে একটি দেশের শাসক হয়ে বসতে পারে, তার প্রথম উদাহরণ ছিল এই পলাশীর যুদ্ধ।
পলাশীর লুণ্ঠন (Plassey Plunder): নবাব হওয়ার উপহারস্বরূপ মীরজাফর কোম্পানিকে এবং এর কর্মকর্তাদের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করেন, তাকে ঐতিহাসিকরা 'পলাশীর লুণ্ঠন' বলে আখ্যায়িত করেছেন। ক্লাইভ ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ২ লক্ষ ৩৪ হাজার পাউন্ড (যা আজকের দিনে কোটি কোটি টাকার সমান) এবং কোম্পানি প্রায় ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করে। এই অর্থের ওপর ভিত্তি করেই ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের (Industrial Revolution) মূলধন তৈরি হয়েছিল।
অর্থনৈতিক ধ্বংসসাধন: বাংলার কৃষকদের ওপর শুরু হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার। মসলিন এবং তাঁতিদের আঙুল কেটে নেওয়ার মতো জঘন্য কাজ শুরু হয়। বাংলার কোষাগার সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়, যার ফলস্বরূপ মাত্র ১৩ বছর পর ১৭৭০ সালে (১১৭৬ বঙ্গাব্দে) বাংলায় দেখা দেয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর', যেখানে অনাহারে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ (প্রায় ১ কোটি লোক) মারা যায়।
সমগ্র ভারতের পতন: বাংলার বিপুল রাজস্ব এবং সম্পদ ব্যবহার করেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরবর্তীতে ফরাসিদের পরাস্ত করে, মহীশূরের টিপু সুলতানকে হারায় এবং মারাঠাদের পতন ঘটিয়ে ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতবর্ষকে নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করে।
উপসংহার:
ইতিহাস সবসময় বিজয়ীদের দ্বারা লেখা হয়। তাই ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে একজন লম্পট, অত্যাচারী এবং অযোগ্য শাসক হিসেবে চিত্রিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। একথা হয়তো সত্যি যে মাত্র ২৩ বছর বয়সী সিরাজ রাজনীতিতে কিছুটা অপরিপক্ব ছিলেন; তিনি তাঁর দাদামশাই আলীবর্দী খানের মতো ধূর্ত কূটনীতিবিদ ছিলেন না। কিন্তু দেশপ্রেমের জায়গায় তাঁর কোনো খাদ ছিল না। তিনি ব্রিটিশদের কাছে মাথানত করে পুতুল নবাব হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে রণাঙ্গনে লড়াই করে মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়াটাকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন।
অন্যদিকে, মীরজাফর, জগৎ শেঠ বা রায়দুর্লভরা যে বিশ্বাসঘাতকতার বীজ বপন করেছিলেন, ইতিহাস তাদের কাউকেই ক্ষমা করেনি। মীরজাফরকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কুষ্ঠরোগে ভুগে মরতে হয়েছিল, জগৎ শেঠকে পরবর্তী নবাব মীরকাশিম গঙ্গা নদীতে ডুবিয়ে মেরেছিলেন, আর উমিচাঁদ পাগল হয়ে মারা গিয়েছিল। 'মীরজাফর' নামটি আজ বাংলা ভাষায় চরম 'বিশ্বাসঘাতক'-এর সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, পলাশীর প্রান্তরে কেবল একজন নবাবের পতন হয়নি, সেখানে একটি জাতির নীতিবোধ ও ঐক্যের পতন হয়েছিল। সিরাজউদ্দৌলার এই করুণ পরিণতি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, যখন ঘরের মানুষেরাই দেশের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখে, তখন পৃথিবীর কোনো পরাশক্তিই সেই দেশের পরাধীনতাকে রুখতে পারে না।








0 মন্তব্যসমূহ